কবি ও লেখক শাহিনা খাতুন এর জীবন থেকে নেয়া “একটি পাহাড়ি রাত”

লেখিকাঃ জনাব শাহিনা খাতুন, যুগ্ন সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধারে তিনি একজন লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পি। 

বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ  পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে রাতে থাকা হয়ে ওঠেনি কখনো। আমার ছোট মেয়েটার বয়স যখন দুই বছর তখন বান্দরবানের নীলগিরিতে একরাত থাকবো এবং তিনদিন সার্কিট হাউজে থাকবো মনস্থির করে বান্দরবানে পৌঁছলাম। সার্কিট হাউজে ছোটবাবুকে আর ওর কেয়ারটেকার শশুরবাড়ীর দিকের এক আত্মীয় মেয়েকে রেখে একটু বাইরে গিয়েছিলাম। কেয়ারটেকার মেয়েটির নাম রিজিয়া। ফিরে এসে দেখি ছোট মেয়েটার গায়ে জ্বর এসেছে আর রিজিয়া কোলে নিয়ে সার্কিট হাউজের বারান্দায় বসে আছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সার্কিট হাউজের পুরানো ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করিয়ে পরিস্কার করেছে। দেখতে দেখতে জ্বর বেড়ে গেল। গায়ের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি হয়ে গেল। ভয় পেয়ে গেলাম। ঢাকার উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম। যাহোক সেদিনের ঘটনা বলা উদ্দ্যেশ্য নয়। এরপর মুশৌরী দেরাদুন এ গিয়ে কিছুদিন ট্রেনিং এর জন্য থেকেছিলাম। রাতে ক্লাস শেষ করে বন্ধু সহকর্মীদের নিয়ে গল্প আড্ডা দিয়েছি,গান গেয়েছি কিন্তু পাহাড়ে বেড়ানোর আনন্দ বা অনুভূতি ঠিক মনের মত করে পাইনি। পাহাড়ে কোন এক জায়গায় চুপ করে বসে থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা, চুপ করে পাহাড়ী পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ শোনা, গাছগুলোকে নিবিষ্টমনে দেখা, কিছু লিখতে মন চাইলে লেখা বা পুরানো কোন দুঃখ খুঁচিয়ে খানিক কাঁদা এসব হয়ে ওঠেনি।

আজ বহুকাল পর সেই শুভক্ষণ এসেছে। আর সাথে আছে দুই মেয়ে।ইন্দোনেশিয়ার নুসা পেনিদা দ্বীপের সেলুমবুং হোটেলে উঠেছি। আজ মনে হচ্ছে সেই কাঙ্খিত পাহাড়ী রাত এসে গেছে। আমরা তিনজন। দুটি রুম দিয়েছে। একরুমে দুই মেয়েকে থাকতে দিয়েছি আর আর এক রুমে আমি। এটিকে ঠিক হোটেল বলা ঠিক হবেনা। তবে এখানকার জন্য এটাই মানানসই। রুম সার্ভিস অথবা অন্য কোন নাগরিক সুবিধা এখানে নেই।তিনজন একসাথে দাড়িয়ে থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখলাম। আমাদের হোটেল থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরের একটা চ্যানেল পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঠিক কিছুটা ঢুকে গেছে। সন্ধ্যা নামার সাথে নীল পানি কাল দেখা যাচ্ছিল। পাখিদের শব্দ শুনছিলাম। দুরে কোথাও সুর করে কেউ একজন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করছিল। কোরান শরিফ না গীতা না অন্যকিছু বুঝতে পারলাম না। তবে ভাল লাগছিল। মনে হচ্ছিল এখানে থেকে যাই। মুনি ঋষিদের মত ধ্যান করি। প্রকৃতির সাথে থাকলে প্রকৃতি হয়তো তার সত্য জ্ঞানের কিছু আমায় দান করবে। কত যে নাম না জানা গাছ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। সুনিপুণ হাতে সাজানো বাগান একরকম সুন্দর আর সাধারণভাবে বেড়ে ওঠা গাছপালা ঝোপঝাড় আর একরকম সুন্দর। বড় বড় গাছের গায়ে বেড়ে ওঠা পরগাছা গুলোও রুপসী অনেক। আর পাহাড়ী আগাছায় নাম না জানা ফুলের সৌন্দর্য যদি কেউ কাছ থেকে না দেখে জানতেই পারবেনা কী অনিন্দ্য সুন্দর করে আল্লাহপাক পাহাড় বানিয়েছেন। মনে মনে স্রষ্টার দরবারে কৃতজ্ঞতা জানালাম। পাহাড়ী মেঠো পথ দিয়ে হেটে যে কুঁড়েঘরে যাওয়া যায় সে ঘর আমার কাছে স্বর্গের মত সুন্দর মনে হয়। মনে হয় ঐ গৃহবাসী একদিন ঠিক জিবরাইল (আ) এর দেখা পেয়ে যাবে আর আমি অফিসের ফাইল ডিসপোজাল করবো।

ঝিঝি পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি। এককাপ কফি খাব ভেবেছিলাম। বাংলাদেশ থেকে কফি নিয়েও এসেছি কিন্ত গরম পানির ব্যবস্থা নেই বলে কফি খাওয়া গেলোনা। তবে একটুও মন খারাপ হয়নি। ভেবেছি ওদের বানানো ফলের জুস খাব। একমাস একটানা থাকতে পারলে একটা উপন্যাস লিখে ফেলতাম আর সাথে কিছু কবিতাও। আমার বড় মেয়েটা আমাকে প্রতিদিন বলে আমার নিজের জীবনের কথা লিখতে। সময় অভাবে পেরে উঠছিনা। ও বলে মা তোমার গল্প যারা পড়বে তারা হেরে যাবেনা কখনো। হারতে হারতে জিতে যাবে। তাই ভাবছি লিখবো। কিন্ত এরকম কিছু পাহাড়ী রাত দরকার।

তারিখঃ ২০/০৬/২০১৯