গরিবের বঙ্গবন্ধু: অধ্যাপক আ ব ম ফারুক।

গরিবের বঙ্গবন্ধুঃ অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। 

লেখকঃ আ ব ম ফারুক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক ডীন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এবং আহ্বায়ক, জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬ প্রণয়ন উপ-কমিটি।

১৫ আগস্টের এই শোকাবহ আবহে প্রথমেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর ৪৪তম শাহাদত বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সেই সাথে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে তাঁর পরিবারবর্গসহ বর্বর হত্যাকা-ের শিকার সব শহীদদের প্রতিও জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা। একই সাথে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংস হত্যার শিকার বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহযোগী জাতীয় চার নেতার প্রতিও রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা। এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করি মুক্তিযুদ্ধের কমপক্ষে ৩০ লাখ শহীদ ও ৫ লাখ বা তারও বেশি মা-বোনদের প্রতি যাঁরা সেই সময় পাকিস্তানিদের দ্বারা চরম অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন, ১৯৫২ সালে তা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরিণত হয়ে ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পায়। পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, ষাটের দশকের ৬-দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাঙালির একটি পৃথক জাতিসত্ত্বা বিনির্মাণ করে যা স্বাধিকার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। নির্বাচনে বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অস্বীকৃতি ও পূর্ব বাংলায় ব্যাপক গণহত্যা শুরুর প্রেক্ষিতে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছিল। ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমিক এই সংগ্রামের প্রতিটি স্তরে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছেন, আমাদেরকে আত্মপরিচয়সমৃদ্ধ একটি জাতিরাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন, শোষণ-বঞ্চনা-দারিদ্র-অশিক্ষা-কুসংষ্কার-সাম্প্রদায়িকতা-দুর্নীতিমুক্ত একটি উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।

উন্নত রাষ্ট্র গঠনের দিকে আমাদের এই পথযাত্রায় স্বাধীনতাবিরোধীদের সকল বাধা সত্ত্বেও আমরা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-নারী অধিকার-সন্ত্রাস ও ধর্মীয় জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছি। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বলা যেতে পারে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এখন আর অলীক কল্পনা নয়। আমরা এখন সত্যিসত্যিই সোনার বাংলার দিকে যাত্রা শুরু করেছি। যে সোনার বাংলা ধনী-গরিব সকলের।

তবে ‘ধনী-গরিব’ বললেও আমার মতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষপাতিত্ব ছিল গরিবের দিকেই। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় নেতৃবৃন্দের সামনে বঙ্গবন্ধুর সাড়া জাগানো ঘোষণা ছিল, “পৃথিবী দুইভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” এটা শুধু যে একটি ঘোষণা ছিল তা নয়। এটি ছিল তাঁর বিশ্বাসের অংশ, তাই তাঁর রাজনীতিও আবর্তিত ছিল এই বিশ্বাসকে ঘিরেই। তাঁর সারা জীবনকাল পর্যালোচনা করলে আমরা সেটাই দেখতে পাই। বাল্যকালে প্রায়ই গরিব মানুষদেরকে তিনি জানিয়ে এবং না জানিয়ে ঘর থেকে ধান-চাল বিলিয়ে দিতেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে গরিব কোন ছেলেকে নিজের শার্ট খুলে দিয়ে দিতেন। কিংবা শীতের দিনে গায়ের চাদর। আকালের সময় পাড়ার ছেলেদের নিয়ে গরিবদেরকে দেওয়ার জন্য ত্রাণ তুলতেন। তাঁর শৈশবের বন্ধুরাও ছিল গরিব পরিবারের। বড় হয়ে এই গরিবদের জন্য কিছু করতে হবে এই ছিল তাঁর শৈশব কালের প্রতিজ্ঞা। এই প্রতিজ্ঞা তিনি রেখেছিলেন সারা জীবনভর। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’র ছত্রে ছত্রে এই প্রতিজ্ঞা আর ‘গরিব দুখী’ মানুষের জন্য তাঁর হাহাকারের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। তাঁর ছয় দফার মূল বিষয়টিই ছিল শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে গরিব মানুষের মুক্তির দাবি। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি দেশের জন্য যে সংবিধানটি রচনা করেছিলেন তার চারটি স্তম্ভ ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর যার যার ধর্ম পালনের অধিকার। ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি তিনি রেখেছিলেন সচেতনভাবে এবং গরিবের স্বার্থের কথা ভেবেই। তাঁর সারা জীবনের রাজনীতির মধ্যে গরিবের ‘ভাতের অধিকার’ প্রসঙ্গটি ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট।

গরিবের এই শোষণ-বঞ্চনার অবসান আর ভাতের অধিকার অর্জনের জন্য যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরুর দিকেই রাজনৈতিক দলটি তিনি গঠন করলেন তার নাম রাখলেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। অর্থাৎ তৎকালীন মুসলিম লীগের বড়লোক অংশ নয়, বরং গরিব মানুষদের অধিকার নিয়ে তিনি সংগ্রাম করতে চান। তাই মুসলিম লীগের নামের আগে তিনি ইচ্ছে করেই ‘আওয়ামী’ অর্থাৎ ‘গরিব সাধারণ জনগণ’ নামটি যুক্ত করলেন। পরবর্তীতে তিনি শুধু মুসলমান নয়, বরং সব ধর্মের গরিবদের সংগঠিত করার জন্য দলের নামের মধ্যে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নতুন নামকরণ করলেন ‘আওয়ামী লীগ’। এমনকি তাঁর দলের নির্বাচনী মার্কাটিও করলেন দেশের সাধারণ মানুষের বাহন নৌকাকে। এবং লক্ষণীয় যে এই নৌকাটি বড় লোকের কোন পান্সি বা বজরা বা ময়ুরপঙ্খী নৌকা নয়, বরং গরিব মানুষের ব্যবহৃত অতি সাধারণ নৌকা।

গরিব মানুষদের জন্য এবং গরিব মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করতেন বলেই তিনি জীবনযাপনেও ছিলেন অতি সাধারণ। তার প্রমাণ তাঁর লেখা ডায়েরি দু’টির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। তিনি সমসাময়িক নেতাদের মতো মোটরগাড়িতে চড়ে সাংগঠনিক কাজগুলো করতেন না। এ জন্য তাঁর বাহন ছিল সাধারণ একটি সাইকেল। রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন এই সাইকেলে চড়েই। সাইকেলটি এখন যাদুঘরের সম্পত্তি। কোর্মা-পোলাও তাঁর প্রিয় খাবার ছিল না। তিনি মজা করে খেতেন ছোট মাছের তরকারি। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমার ছাত্রজীবনের শেষদিকে আমাদের ফার্মাসিস্টদের জন্য ডাক্তারদের মেডিক্যাল কাউন্সিলের মত একটি ফার্মেসি কাউন্সিল গঠনের আবেদনমূলক দাবি নিয়ে একবার তাঁর ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম কুলিয়ার চর থেকে এক ভদ্রলোক মুড়ির টিনে করে বড় কই মাছ নিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর জন্য। তা দেখে তিনি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনক, সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বিশাল মহীরুহসম এক ব্যক্তিত্ব, আর সাধারণ মানুষের ‘মজিবর’, এত খুশি হয়েছিলেন যে আমরাও ভাবছিলাম এত বড় হয়েও তিনি বদলাননি, তিনি এখনো আমাদেরই লোক। আমার সাথে ছিল আমার সহপাঠী ফার্মাসিস্ট ভৈরবের আবদুল্লাহ-আল-সাদী। সে বলছিল, আমাদের ভৈরব এলাকা বড় লালচে কইয়ের জন্য বিখ্যাত। আমিও একদিন বঙ্গবন্ধুর জন্য আনবো।

জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় তিনি পাকিস্তানের জেলে জেলেই কাটিয়েছেন। তাঁর উদ্বিগ্ন স্ত্রী ভালো রান্না পছন্দ করা স্বামীটির জন্য যখনি জেলে কোন খাবার পাঠিয়েছেন, তিনি সবাইকে নিয়ে তা খেতেন। নিজে জমিয়ে রেখে খেতেন না। যাদের সাথে নিয়ে খেতেন তাদের মধ্যে চোর-গুন্ডা-বাটপার কেউ আছে কিনা তা দেখতেন না। পুলিশকেও ডাকতেন। পাশের ওয়ার্ডের পাগল, যার চিৎকারে তিনি সারা রাত ঘুমুতে পারতেন না, তার জন্যও পাঠাতেন। ভাবা যায়? স্ত্রী বড় টিফিন ক্যারিয়ারে করে বেশি খাবার পাঠাচ্ছেন, যাতে তিনি অন্তত কয়েকবার খেতে পারেন। কিন্তু তিনি সবাইকে নিয়ে ও দিয়ে তা খাচ্ছেন। এটা কি শুধুই আনন্দ আর হল্লার জন্য? এর নিভৃতে এই গরিব মানুষগুলোর জন্য স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা আর ‘এদের জন্য কিছু করতে পারছি না’ বোধটুকুই কি প্রধান নয়?

পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতার একটি ঠাট্টা-গান আছে মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা বিষয়ে। বাংলাদেশেও মন্ত্রী হওয়া একটা খুব বড় বিষয়। দীর্ঘদিন রাজনীতির পোড় খাওয়া মানুষগুলো একসময় মন্ত্রী হবেন তা নেতারা চাইতেই পারেন। সবার কাছেই এটি অত্যন্ত লোভনীয় একটি সরকারি ক্ষমতাবান পদ। অনেককেই দেখেছি মন্ত্রীত্ব শেষ হলে বা হারালে খুব মন খারাপ করতে। কিন্তু তিনি গরিবের দলটাকে সংগঠিত করতে হবে বলে সেই পাকিস্তান আমলে মন্ত্রী হয়েও স্বেচ্ছায় মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিলেন। আমাদের দেশে দূরে থাক, অন্য দেশেও এরকম আত্মত্যাগের উদাহরণ আছে বলে আমার মনে পড়ছে না। পদত্যাগপত্র জমা দিতে গিয়েও আরেক বিড়ম্বনা। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান (১৯৫৬-৫৮) দল সংগঠিত করতে হবে বলে মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না। এমনকি তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে দল সংগঠিত করার চাইতে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)-এর জন্য সময় দেওয়াই বরং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দুয়েকবার বাদে কখনো তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথার অবাধ্য হননি। সেই দুয়েকবারের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। তিনি মন্ত্রীত্ব ছেড়ে সাইকেল নিয়ে হাটে-বাটে মানুষের কাতারে নেমে গিয়েছিলেন।

তখন এখানকার ধনিক শ্রেণী ও বড় ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই বাংলায় কথা বলতেন না। তাদের ভাষা ছিল উর্দু, কারো কারো ইংরেজি। তারা মুষ্টিমেয় হলেও বাংলা ছিল তাদের কাছে দেহাতী গরিবদের ভাষা। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চাইলেন তখন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদকারীদের অন্যতম ছিলেন আমাদের এই ‘মজিবর’। গরিব বাঙ্গালির এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের একেবারে শুরুতে (১১ মার্চ ১৯৪৮) যারা গ্রেফতার হলেন তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। জেলে থেকেও তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ তারিখে পাকিস্তানের কনস্টিট্যুয়েন্ট এসেম্বলিতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল, “আমরা এখানে বাংলায় কথা বলতে চাই। আমরা অন্য কোন ভাষা জানি কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। আমরা ইংরেজি জানলেও যদি আমরা ভাবি যে বাংলায় মনের ভাব বেশি প্রকাশ করতে পারবো তাহলে আমরা সবসময় বাংলাতেই কথা বলবো, ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেও। যদি তার অনুমতি দেওয়া না হয় তাহলে আমরা এই অধিবেশন থেকে চলে যাবো। কিন্তু বাংলাকে এখানে অনুমতি দিতেই হবে, এটাই আমাদের স্ট্যান্ড।”

পাকিস্তানীরা চাইছিল এ প্রদেশটির নাম পূর্ব বাংলার বদলে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হোক। পূর্বোক্ত ধনীদেরও তাতে সায় ছিল। কিন্তু ‘মজিবর’ চেয়েছিলেন গরিবের পছন্দের এই বাংলা নামটিই থাকুক। ২৫ আগস্ট ১৯৫৫ তারিখে পূর্বোক্ত এসেম্বলিতে তিনি বলেছিলেন, “স্যার, আপনি দেখছেন যে তারা ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি বদলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখতে চায়। আমরা আগেও অনেকবার বলেছি যে, আপনাদেরকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে পূর্ব বাংলা নামটিই ব্যবহার করতে হবে। কারণ ‘বাংলা’ নামটির একটি ইতিহাস আছে, নিজস্ব ঐতিহ্য আছে ….।” তিনি তখন সফল হননি। কিন্তু তিনি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ এখানেও ঘটিয়েছেন।

১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় নির্দেশ দিয়েছেন, আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে ’গরিবের যাতে কষ্ট না হয়’। আন্দোলনকালে চাকুরিজীবীদের সংসার চালাতে যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য বলেছেন ‘২৮ তারিখে বেতন নিয়ে আসবেন’। আন্দোলনে যারা আহত-নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের কথা চিন্তা করে শুভানুধ্যায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন তাদের জন্য দলীয় তহবিলে ‘সামান্য কিছু টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন’।

স্বাধীন দেশেও দুর্নীতির বিস্তার দেখে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। বিভিন্ন জনসভার বক্তৃতায় দুঃখ করে বলেছেন দুর্নীতি করে একশ্রেণীর শিক্ষিত মানুষ। গরিব চাষা আর কলকারখানার শ্রমিক দুর্নীতি করে না। এদের মেহনতের টাকায় শিক্ষিত ভদ্রলোকদের বেতন হয় একথা জানিয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন এদেরকে সম্মান করে কথা বলতে।

গরিব আর মধ্যবিত্তের কথা চিন্তা করে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে দিয়েছেন। এ নিয়ম আজো চলছে। দেশের জমিগুলো যাতে মুষ্টিমেয় ভূস্বামীদের হাতে চলে না যায় সে জন্য আইন করেছেন কেউ ১০০ বিঘার বেশি জমি রাখতে পারবে না। গরিব কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে তিনি ছোট ছোট জমির আইল তুলে দিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে একসাথে বড় জমি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ এবং ফসল আনুপাতিক হরে বন্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন। গরিবের ছেলেমেয়েরা সবাই যাতে বিনামূল্যে পড়তে পারে সে জন্য দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারী করেছেন। সদ্য স্বাধীন একটি দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা যখন অত্যন্ত নাজুক, সে সময় তিনি সাহসের সাথে এসব বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। দুর্নীতি রোধ আর অবৈধ অস্ত্রের সাহায্যে লুটপাট বন্ধ করার লক্ষ্যে আধা-সামরিক রক্ষী বাহিনী গঠন করেছেন। দেশের সব মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় আনতে এবং গ্রামের গরিব মানুষদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকে নিশ্চিত করতে তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে ঢেলে সাজিয়ে প্রতি থানায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে প্রচুর সংখ্যক সরকারী বড় হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। তাঁর এসব কাজের লক্ষ্য ছিল বড়লোকদের গণতন্ত্রের পরিবর্তে দেশে ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা। তাঁর সবগুলো গরিব-বান্ধব কাজের সুফল বাংলাদেশ এখনো ভোগ করছে এবং তাঁর কন্যা এখন এসব সুবিধা আরো বহুগুণে বর্ধিত করেছেন।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রে তিনি যদি নিহত না হতেন তাহলে আমাদের দেশের গরিব মানুষেরা আরো অনেক উপকৃত হতেন তা বলাই বাহুল্য।

তারিখঃ ১৮/০৯/১৯