বাঙালির বাংলাদেশের হাতছানিঃ প্রফেসর মামুন আল মাহতাব সপ্নীল।

লেখকঃ প্রফেসর মামুন আল মাহতাব সপ্নীল।
-চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ  গত নির্বাচনের আগে আগে উৎকণ্ঠা আর শঙ্কায় যখন চারদিকে, কী হবে, কী হবে না, আবারও কী জ্বলবে আগুন, পুড়বে স্বদেশ, আদৌ হবেতো নির্বাচন- এমনি সব সন্দেহের দোলাচালে যখন দুলছিল বাংলাদেশ, ঠিক তখনি দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ছুটে বেড়িয়েছিলাম একটা অসম্প্রদায়িক আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বাংলাদেশের খোঁজে। কখনও শাহরিয়ার কবির চাচার সাথে নির্মূল কমিটির ব্যানারে ছুটেছি চট্টগ্রামে, তো কখনও পীযুস দা’র সাথে সম্প্রীতি বাংলাদেশের হয়ে গিয়েছি রাজশাহীতে। নির্মূল কমিটির কাজী মুকুল ভাই আর এ্যারোমা দি’কে সঙ্গ দিয়েছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্টের হয়ে বাদ যায়নি ড. মোমেন চাচার সাথে সিলেটের পথে-পথে ছুটে বেড়ানোও।

নানা প্রেক্ষাপটে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে এমন একটা সময়ে বাংলাদেশকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে যখন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা থাকে সবচাইতে বেশি শঙ্কায়। নির্বাচনে কে জিতলো, কে জিতলো না তা বড় নয় – নির্বাচনে ভোট দিলে সংখ্যালঘুর দোষ, দোষ না দিলেও। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে এমন একটি জাতীয় নির্বাচনের কথা আমরা মনে করতে পারবো না যেখানে নির্বাচনে বিজয়ের আনন্দে কালিমা লেপে দেয়নি কোন না কোন সংখ্যালঘুর কান্না। একেকটি সফল নির্বাচনের পর আমরা গণতন্ত্রের আরও একধাপ এগিয়ে যাওযা কোথায় উদযাপন করবো, উৎকণ্ঠায় ভুগতে হয়েছে এরপর জানি আবার কোন সংখ্যালঘুর ঘরে জ্বলবে আগুন।

এই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনের আগে আগে নির্মূল কমিটির উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল একটি চিকিৎসা সহায়তা কমিটি। এই কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল ঢাকায় জাতীয় যাদুঘরে সারা দেশ থেকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ চিকিৎসকদের আমন্ত্রণ জানানোর। আমরা দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য আলাদা আলাদা চিকিৎসা সহায়তা দল গঠন করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটাই – নির্বাচনের পরপর যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হবে তখন এই কমিটিগুলো তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করবে আর এর পাশাপাশি মেডিকো-লিগ্যাল বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখবে। এতটাই নিশ্চিত ছিলাম আমরা আবারও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বাচনত্তোর সহিংসতার ব্যাপারে! কিন্তু কার্যতঃ হতে দেখিছি তেমনটা যা প্রত্যাশিত ছিল না মোটেও। বিশেষ করে সংখ্যালঘুপ্রধান নির্বাচনী এলাকাগুলো নিয়ে উৎকণ্ঠায় নির্বাচনের রাতে আমাদের ঘুম ছিল হারাম। ভোলার লালমোহনে জোট সরকারের নির্বাচিত সাংসদের উপস্থিতিতে সংখ্যালঘু নারীদের ওপর ২০০০ সালে নির্বাচনের পরপর যে নির্যাতন করা হয়েছিল তার বয়ান শুনেছি জাগো বাংলা ফাউন্ডেশন আয়োজিত নির্বাচনপূর্ব এক সেমিনারে, জাতীয় প্রেসক্লাবে নির্যাতিতদের মুখে। শিউড়ে উঠেছি যখন সিরাজগঞ্জের পূর্নিমা ঠান্ডা গলায় বলে যাচ্ছিল তার ওপর জোট সরকারের ক্যাডারদের নির্বাচন পরবর্তী বর্বরতার কথা, বিএমএ অডিটোরিয়ামে নির্মূল কমিটির বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনের দিন রাতে তাই দুরু-দুরু বুকে শঙ্কায় ছিলাম এবার কোন লালমোহন, আবার কোন পূর্নিমা? নাকি এবার সাতক্ষীরার সরকার বাড়ি যেখানে ২০০০ সালের নির্বাচনের পর জোট সরকারের লোকজন সম্ভ্রান্ত সরকার পরিবারের বসতভিটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে খেলার মাঠ বানিয়ে ছিল? কিন্তু কার্যত ঘটেনি সেরকম কিছুই। ’৭৩-এর পর সম্ভবত এই প্রথম বাংলাদেশে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো যেখানে নির্বাচনেরর পর ঘটেনি কোন সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা। একটু যদি বইয়ের পাতা উল্টান, ঘাটাঘাটি করেন তথ্য-উপাত্ত, দেখবেন এই প্রথম বহুদিন পর বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিন্যাসে একটি উল্টো ধারা বইছে। ’৪৭-এর দেশ বিভাগের সময় আজকের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা ছিলেন মোট জনসংখ্যা ৩৭ শতাংশের মতো। সংখ্যালঘুরা এরপর থেকে সংখ্যায় শুধু কমেছেনই। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়টায় এদেশের সংখ্যালঘুদের সংখ্যা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। নেমে এসেছিল ৮ শতাংশের ঘরে। কিন্তু এরপরের গল্পটা সংখ্যাতত্ত্বের উল্টো যাত্রার। পরিসংখ্যান বলছে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময়টাতে এদেশে সংখ্যালঘুর সংখ্যা এই প্রথমবারের মতো বাড়তে শুরু করেছে আর তা দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশের আশপাশে।

তাই বলে কিন্তু এই নয় যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি যে কোনো অন্যায়ের চির অবসান ঘটেছে। তেমনটি কেউ দাবিও করেন না, যেমনটি সম্ভবত দাবি করতে পারেন না পৃথিবীর কোন দেশেরই কেউই। তবে এসব বিষয়ে যারা খবরাখবর রাখেন তারা ঠিকই জানেন যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে লক্ষনীয় রকমের। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সত্যিকারের একটি অসম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আর স্বপ্ন নাও থাকতে পারে।

সমস্যা হচ্ছে যখনই আমরা স্বপ্নগুলো দেখতে থাকি, স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ, তখনই তা কেন যেন কারো-কারো জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাড়ায়। এরাই সচেষ্ট হয় নানাভাবে বাংলাদেশকে অপ্রস্তুত আর অসম্মানিত করায়। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের বার-বার হয়েছে। এমন ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি বার-বারই। সর্বশেষ এইতো সেদিন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে। তবে ওদরে জন্য ইদানীং যা সমস্যার তা হলো ‘হুজুগে বাঙালি হুজুগে যতই নাচুক না কেন’ এই ভাওতাবাজিগুলো তারা এখন ভালোই বুঝতে শিখেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন আর ঘটেনা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, আগুনেও পুড়ে না আর কোন সংখ্যালঘু বসতভিটা।

এই বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে আগামীর, স্বপ্ন দেখে ২০৪১-এর। এই বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখান এমন একজন মহিয়সী নারী যিনি শুধু স্বপ্ন দেখানইনা, নিজেও স্বপ্ন দেখেন আর সবচেয়ে বড় কথা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপও দেন। এই বাংলাদেশে তাই নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়তা কমিটির সদস্য সচিবের অলস সময় কাটে নির্বাচনের অব্যবহিত পরে। এই বাংলাদেশে হয়ত সামনে আর থাকবে না কোন সংখ্যালঘু, থাকবে না কোন সংখ্যাগুরুও – এখানে থাকবে শুধুই বাঙালি। আমি সেই ‘বাঙালির বাংলাদেশের’ হাতছানি দেখতে পাই!

আর আমাদের সেই স্বপ্ন দেখার সাহস দেখান যে মহিয়সী নারী আজ তার ৭৩তম জন্মদিন। এমন একটি দিনে প্রত্যাশা আর প্রার্থনা একটাই – এই লেখার লেখক আর পাঠকেরা সেদিন থাকুক চাই নাই থাকুক তিনি থাকুন তার শতবর্ষে বাংলাদেশকে নিয়ে ‘বাঙালির বাংলাদেশকে’ উদযাপনের জন্য।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

তারিখঃ ০২/১০/১৯