তামাকজাত সিগারেট নাকি ই-সিগারেট; কোনটি নিরাপদ?: মোহাম্মদ আরিফ খান

তামাকজাত সিগারেট নাকি ই-সিগারেট; কোনটি নিরাপদ?
লিখেছেন মোহাম্মদ আরিফ খান

বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ বছরের পর বছর আমরা এটাই জেনেছি যে, সিগারেট অনেক রোগের এবং মৃত্যুর প্রধান কারন। হৃদরোগ, কান্সার, ফুস্ফুসের রোগের প্রধান কারন এটি । একটি সিগারেট এ কমপক্ষে ৭০০০ টি রাসায়নিক উপাদান থাকে, যার মধ্যে ৭০ টি সরাসরি ক্যান্সার এর সাথে জড়িত।

মুলত একটি সিগারেট দারা বিদ্যমান ক্ষতির ঝুঁকি শুধু এর কেমিক্যাল এর উপর নির্ভরশীল নয়। বরং কিভাবে কোনপথে এই বিষাক্ত কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশ করছে সেটাই গুরুত্তপূর্ণ । কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ফুস্ফুসের ক্ষত, ইনফেকশন, রক্তনালিতে চর্বি জমা এবং রক্ত চলাচলে বাধা পাওয়া (যার ফলে স্ট্রোকের এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়ে মৃত্যু হতে পারে)।

উপরোক্ত রোগগুলো শুধুই নিকোটিনের দ্বারা হয়ে থাকে এমনটি নয়। বিশেষত নিকোটিন বাচ্চাদের ক্ষতির জন্য দায়ি করা হয়। এই কারনে FDA অতধিক গুরুত্ব সহকারে যুবক এবং অল্প বয়স্ক দের নিকোটিন এবং তামাকজাত দ্রব্য থেকে প্রতিরক্ষার জন্য নতুনভাবে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

নিকোটিনের প্রতি আশক্তি এবং নিস্বাসের মাধ্যমে ধোঁয়া টানা এই দুই এর পার্থক্য করাটা এখন খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ। কেননা বাজারে প্রচলিত ই-সিগারেট এবং এর স্বতন্ত্র ধোঁওয়া চালনা পদ্ধতি স্বাস্থ্যর জন্য একটি নতুন বিপদ। ই-সিগারেট এর জনপ্রিয়তা এখন আকাশ ছোয়া, কারন তারা এই ই- সিগারেট কে পুরনো তামাকজাত সিগারেট এর চেয়ে বেশী নিরাপদ মনে করে। তারা এই যুক্তি দিচ্ছে যে, এর মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের পরিবর্তে শুধুই সুগন্ধময় বাষ্প রয়েছে। আপাত দৃষ্টে বলা জেতে পারে, তামাকজাত সিগারেট এর আসক্তির চেয়ে ই- সিগারেট ব্যাবহার নিরাপদ; কিন্তু তা নয়। এই ই-সিগারেট এর ব্যাবহারেও ক্ষতি রয়েছে, যা এখন গবেষণা নতুন মাত্রা যোগ করসে।
ই-সিগারেট এর বিদ্যমান এরোসল ক্ষতিকর দিকঃ
বিশ্ব যখন ই-সিগারেট এর প্রশংসা পঞ্চমুখ ঠিক একই সময় বিজ্ঞান গবেষণা বেরিয়ে এসেছে একটি তামাকজাত সিগারেট বিদ্যমান কিছু উপাদান ই-সিগারেট এ উপস্থিত। সবচেয়ে উদ্দেগজনক ব্যাপার হচ্ছে ই-সিগারেট এর আধুনিক স্বতন্ত্র ধোঁওয়া চালনা পদ্ধতি। আমরা জানি এরোসল জাতিয় পণ্য এমনিতেই কিছুটা বিপজ্জনক কারন এরোসল মাধ্যমে নির্গত ধোওয়ার কণাগুলো সরাসরি ফুসুফের অভ্যন্তরে পৌঁছে দিতে পারে। একইভাবে ই-সিগারেট এর এরোসল টিও এর মধ্যে উপস্থিত উপকরন গুলকে ফুসুফসের অভ্যন্তরে পৌঁছে দিতে পারে। সুতরাং এ কথা বলা যেতে পারে যে, ই-সিগারেট এর মধ্যে বিদ্যমান ক্ষতিকর উপাদান সমূহ একইভাবে ধোঁওয়া টানার ফলে ফুসফুসের অভ্যন্তরে গভীরতম কোষে পৌঁছে যায় এবং এতটাই ক্ষতি করে যা সচরাচর ধূমপায়দের হয়না। যার ফলে আমাদের যুবকদের স্বার্থে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সময় এসেছে। আমরা শুধুই নিকোটিনের আশক্তির কথা বলছি তা নয়, যে সকল এখন ই-সিগারেট এ ঝুঁকছে তারাই পরবর্তীতে তামাকজাত সিগারেট এর নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যাবে।
এটি শুধুই কথার কথা না। ‘ই-সিগারেটে’ ব্যবহৃত এরোসলে উচ্চ মাত্রায় বিষাক্ত উপকরণ থাকে। বিভিন্ন গবেষণালব্ধ পরিক্ষা থেকে দেখা গেছে যে, ‘ই-সিগারেটে’ সধারনত প্রপাইলিন গ্লিসারল, গ্লিসারিন এবং স্বাদরোচকই থাকে না বরং ফর্মালডিহাইড এবং কিছু মুক্ত আয়ন যা কিনা শরীরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কোষসমূহ ধ্বংস করতে পারে, যার ফলে অসুস্থতা এবং দ্রুত বার্ধক্য চলে আসে। এছাড়াও আরেকটি গবেষণা দেখা গেছে যে, ‘ই-সিগারেট’-এর এরোসল নিম্নোক্ত ক্ষতিতে সরাসরি জড়িত- ফুসফুসের ক্রিয়া হ্রাস পাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস দ্বারা আক্রমণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। পরিশেষে, ‘ই-সিগারেটে’-এর বাষ্প টানার ফলে এক ধরনের ক্ষত তৈরির ক্রিয়া শুরু হয় যা কিনা ক্যান্সার তৈরির পদ্ধতিকে তরান্বিত করে।

ই-সিগারেট সম্বন্ধে অজানা তথ্য
এখন রয়েছে অনেক অজানা অধ্যায়
ই-সিগারেটে এরোসলের খতির সাথে এর মধ্যে বিদ্যমান উপাদানগুলোর একটি সু-সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরন স্বরূপ ই-সিগারেটের উপাদান এবং স্বাদরোচক ব্যাপারটি এখানে অগ্রাধিকার পাবে। স্বাদরোচক উপাদানগুলি যদিও সাধারণ খাবারের সাথে নিরাপদ কিন্তু যখনই তাপ দিয়ে নিশ্বাসের সাথে টানা হবে তখন সেটি বিষাক্তও। তদুপরি এটি ফুসফুসের ক্ষতি করে।
ই-সিগারেট ডিভাইসটি যে উপাদান দ্বারা তৈরি সেটিও স্বাস্থ্য হানিকর, যেমনঃ ডিভাইস ভোল্টেজ, ব্যাটারি আউটপুট, উইকিং ম্যাটেরিয়াল, নিকোটিন পরিমাণ।
ই-সিগারেট এর গঠনের একটি উপাদান হচ্ছে ধাতব কয়েল, যা তাপ এবং হিমায়ক হিসাবে কাজ করে। এই কয়েলের মধ্যে কিছু ক্ষতিকর উপাদান থাকে যা ধীরে ধীরে ই-সিগারেটের তরলের সাথে মিশে যায়। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, যা FDA থেকেও পূর্বে জানানো হয়েছিল যে, ই-সিগারেটের স্বতন্ত্র ধোঁয়া চালনা পদ্ধতি দ্বারা শরীরে ক্ষতিকর নিকেল এবং ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। এই ২টি রাসায়নিক উপাদান অত্যন্ত ক্ষতিকর, যা ক্যান্সার তৈরি করে।
বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফলঃ
বিভিন্ন গবেষনা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলই আজকে ই-সিগারেটের প্রতি দুশ্চিন্তা বড়িয়ে দিয়েছে। এটি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ এইজন্য যে, ই-সিগারেট এর ব্যবহার এ শিশুরা অনেক এগিয়ে। কিন্তু আমাদের সচেতন হবার কিংবা সচেতনতা বৃদ্ধিরও সময় ফুরিয়ে যায়নি। এই ব্যাপারে আমাদের ধারণা এবং প্রয়োজনীয় উপাত্ত অমিল থাকায় যেমনঃ স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকার পরেও এর ভোক্তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায়, FDA খুবই সতর্কতার সাথে ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS) কে বিষাক্ত পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এর গবেষনা বৃদ্ধির ঘোষনা দিয়েছে।

প্রাণীদের উপর গবেষনায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট হতে প্রাপ্ত সুগন্ধময় বাষ্প ফুস্ফুসের শ্বাসনালীর ক্ষত তৈরি করে ক্যান্সার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে কিংবা ক্যান্সার ঘটায়। FDA এই ব্যাপারে আরও সুপরিসরে গবেষণার কাজ হাতে নিয়েছে যাতে এই ঝুঁকিটি পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। The FDA’s Center for Tobacco Products and Center for Drug Evaluation and Research ইতোমধ্যে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছে। এই গবেষণায় ৪ ধরণের পণ্যের উপর কাজ করা হচ্ছেঃ ১) Pen style device ( কলম সদৃশ ডিভাইস) , ২) Tank style device ( ট্যাংক সদৃশ ডিভাইস , ৩) A pod style device ( পড সদৃশ ডিভাইস) এবং 4) Cigaloke (হুবুহু সিগারেট সদৃশ)।উপোরক্ত এজেন্সি এই ৪ ধরণের অথবা প্রয়োজন সাপেক্ষে যে কোনটির উপর গবেষণে করবেন, যাতে করে এদের বিষাক্ততা সম্পর্কে তথ্য উন্মুক্ত করা যায়।
FDA কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সমুহঃ
FDA দীর্ঘদিন ধরেই সিগারেটে বিদ্যমান নিকোটিন এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে বিভিন্ন জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে। এখন নতুন হুমকি হচ্ছে ই-সিগারেটের সুগন্ধময় বাষ্প। এ ক্ষেত্রে একটি ব্যপার পরিলক্ষিত যে, ই-সিগারেটের বিপরীতে অনেক তামাকজাত ধুমপায়ীদের সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তার জায়গাটি হলো, ই-সিগারেটে যুবকদের আসক্তি বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফলের অভাবে আমাদের প্রায়শই বিভিন্ন প্রান্ত হতে আগত কঠিন কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গবেষনা পরবর্তী ফলাফল আমাদের এই ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে সহায়তা করবে।

তথ্যসূত্রঃ
http:// www.fda.gov/NewsEvents/Newsroom/FDAVoices/ucm635162.htm

সংগ্রহ ও অনুবাদঃ
মোহাম্মদ আরিফ খান
বি.ফার্ম এবং এম.ফার্ম (ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়) সিবিএসআই (আইবিএ, ঢাবি)
ই-মেইলঃ arifkhan.ewu@gmail.com