বাঙালির অহংকার বঙ্গবন্ধু ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)।

বাঙালির অহংকার বঙ্গবন্ধু ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

লেখকঃ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
-চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

ডিসেম্বর বাঙালির দিনপঞ্জির সবচেয়ে গর্বের মাস। এটি বাঙালির বিজয়ের মাস। এ জাতির যে হাজার বছরের ইতিহাস তা শুধুই শোষণের আর পরাধীনতার। গত কয়েক হাজার বছরে আমাদের শাসন আর শোষণ করেনি কে? লম্বা এ তালিকায় আছে পারস্য, আরব, ইংরেজ আর এমনকি আফ্রিকার হাবশি শাসকও। নেই শুধু কোন বাঙালির নাম। যে সিরাজউদ্দৌলাকে আমরা পাঠ্যপুস্তকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বলে চিনতে শিখেছি, সেই সিরাজ না কথা বলতেন বাংলায় না পড়তে পারতেন বাংলা বর্ণমালা। আর জমানায় যে ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজিকে বিএনপি-জামায়াতের আমাদের জাতির পিতা বানানোর অপচেষ্টা দেখেছি তিনিও ছিলেন আরবি শাসক।

হাজার বছরের মধ্যে বাঙালি অধ্যুষিত প্রথম কোন স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ আর তার প্রথম স্বাধীন বাঙালি শাসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ডিসেম্বর ক্যালেন্ডারের পাতার আরেকটি মাস নয়, এটি বাঙালির মহত্তম অর্জন ও অহংকার। ডিসেম্বর মানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয়, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে রঞ্জিত লাল-সবুজ পতাকা আর কয়েক কোটি মানুষের অকল্পনীয় ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত প্রাণের বাংলাদেশ! ডিসেম্বর মানেই বাংলাদেশ!

এবারের ডিসেম্বরের গুরুত্ব অন্য রকম। এবারের ডিসেম্বর শেষে যে নতুন বছরের হাতছানি তা শুধুই বঙ্গবন্ধুময়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বছর সেটি। আর তার পরের বছরটিতে প্রিয় বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হবে। এই ডিসেম্বরে তাই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদযাপনের। পাশাপাশি হিসেব কষতে হবে কি করিনি, কি করা উচিৎ ছিল আর কি করতে হবে।

কিছুদিন আগে বঙ্গভবনে যাওয়া একেবারেই অন্য একটি কাজে। যাওয়ার পথে ভাবছিলাম এই কথাগুলোই। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সচিবের দপ্তরে বসে হঠাৎ চোখে পড়লো সচিব মহোদয়ের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের বাম পাশের দেয়ালে ঝোলানো দু’টো অনার বোর্ড। আর দশটি সরকারী অফিসে যেমন থাকে সেরকমই বোর্ড দু’টো। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে ক’জন সরকারী কর্মকর্তা বঙ্গভবনে মুখ্য সচিব বা সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নাম আর কর্মকাল ধারাবাহিকভাবে তালিকাবদ্ধ করা আছে বোর্ড দু’টোতে। কৌতূহলবশতঃই আগস্ট ’৭৫ খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকে গেল একটা নামে। বঙ্গভবনে এই পদটি সেসময়ে বাগিয়ে নিয়েছিল মাহবুব আলম চাষী। নামটা দেখতেই গা’টা কেমন যেন গুলিয়ে আসছিল। তবে চাষীর নাম দেখে আমার শরীর যতই ঘিনঘিন করে উঠুক না কেন আমি বাজি ধরে বলতে পারি এখানে উপস্থিত আপনারা যারা আজকের প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের বেশিরভাগের কাছেই এই নামটি অচেনা।

’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কিছুদিনের জন্য বঙ্গভবনে গেঁড়ে বসেছিল খন্দকার মুশতাক আহমেদ আর মাহবুব আলম চাষীরা। সাথে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি সেনা কর্মকর্তারা। বঙ্গভবনকে পানশালা বানিয়ে নিত্য তারা জলসা বসাতো সেখানে। বঙ্গভবন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই ভবনটির ইতিহাসে এমনি কালো অধ্যায় আর এসেছে কিনা সন্দেহ। এমনকি ’৭১-এর ন’টি মাসেও না, যখন এখানে ছিল পাকিস্তানের দালাল গভর্নর ডা. মালেকের আখড়া। এই বঙ্গভবনে বসেই খুনিরা জেল হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা করেছিল যার পরিণতিতে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে নিহত হন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চার মহানায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। জিয়াউর রহমানের সময় বন্দুকের নল দিয়ে যে সংশোধিত সংবিধানটি রচনা করা হয়েছিল সেখানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংযোজনের মাধ্যমে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি বাতিল হয়। তার পরের ইতিহাসটা খুব বেশী পুরাতন নয় বলে সবারই জানা। প্রচলিত আইনে বিচার হয়েছে আত্মস্বীকৃত খুনিদের। কার্যকরও হয়েছে অনেকের দণ্ড, আবার অনেকে এখনও পলাতক। এই খুনিদের যে নামগুলো এখন মানুষের মুখে-মুখে, সেখানে কিন্তু নেই জিয়া-মুশতাক-চাষীদের নাম। কারণটাও আমরা জানি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিলম্বিত এই বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছিল ’৭৫-এর নেপথ্যের অনেক কুশীলবের। কিন্তু শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার পূর্ণতা পেতে পারে না। এতে যেমন অসম্মান দেখানো হয় ’৭৫-এর শহীদদের প্রতি তেমনি জাতির প্রতিও করা হয় বড় ধরনের অন্যায়।

যে কোন হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয় আর একটি হত্যাকাণ্ড কখনোই আরেকটির সাপেক্ষে বিচার্য হতে পারে না- এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও একথা মানতেই হবে যে, ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের অ্যাডভেঞ্চারের ফসল ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফল। পাশাপাশি ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডগুলোর রয়েছে বহুমাত্রিকতা। ১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বর শুধুমাত্র কোন ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করা হয়নি। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ একে অপরের সমার্থক।

আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ছিলেন হাজার বছরের মধ্যে বাঙালি অধ্যুষিত কোন ভূ-খণ্ডের প্রথম স্বাধীন শাসক। পাশাপাশি বাংলাদেশ নামক অনন্য জাতি রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টাও তিনি। তাই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। আর বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে জাতীয় চার নেতাই ছিলেন সমষ্টিগতভাবে বাঙালি স্বাধীনতার ভ্যানগার্ড। ’৭১-এর ন’টি মাসে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ, তখনই এই বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ’৭৫-এ কোন সেনা অভ্যুত্থান ঘটেনি, হত্যা করা হয়নি জাতীয় নেতৃত্বকে, ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি আওয়ামী লীগকেও। সেদিন হত্যা করা হয়েছিল ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মূল্যে অর্জিত বাংলাদেশকে আর ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল বাঙালিকে।

পাশাপাশি ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডগুলোর বহুমাত্রিকতাও বিবেচনায় আনতে হবে। মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধই সংঘটিত হয়েছিল সেই সময়টায়। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন শেখ রাসেলের মত নাবালক শিশু যার রাজনীতির সঙ্গে কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এমনকি হত্যা করা হয়েছিল গর্ভবতী মাকেও। পৃথিবীর সবচাইতে নিরাপদ বলে বিবেচিত যেই স্থান, সেই কারাগারে গুলি করার পর খানিক বিরতিতে বেয়োনেট চার্জ করে নিশ্চিত করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতার মৃত্যু। আর তাই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার করেই ‘জাস্টিস হ্যাজ বিন ডেলিভারড’ এই আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন কারণই থাকতে পারে না। এটা কখনোই মেনে নেয়া যায় না যে বঙ্গভবনের দরবার হলে বঙ্গবন্ধু আর সৈয়দ নজরুল ইসলামের পোট্রেটের পাশে ঝুলবে মোশতাক আর জিয়ার পোট্রেটও কিংবা বঙ্গভবনে অনার বোর্ডে শোভা পাবে চাষীর নামও। আমাদের নির্লিপ্ততায় যাতে এসব নেপথ্যের নায়করা ‘দুধ খেয়ে গোঁফ মুছে ফেলতে না পারে’ এটা অনাগত বাঙালির কাছে আজকের আমাদের দায়বদ্ধতা।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনকালে খুবই প্রয়োজন তাই একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠনের মাধ্যমে ’৭৫-এর নেপথ্যের দেশী-বিদেশী কুশীলবদের চিহ্নিত করা আর আইন সংশোধন করে তাদের প্রয়োজনে মরণোত্তর বিচারের মুখোমুখি করা। ইটালির মত পৃথিবীর উন্নততম একটি রাষ্ট্রে যদি মরণোত্তর বিচারের বিধান থাকে তাহলে কেন বাংলাদেশে নয়? আর আমাদের বিচার বিভাগতো প্রমাণও রেখেছে নিরপেক্ষ এবং যে কোন মাপকাঠিতে প্রসংসনীয় ও শুদ্ধ বিচারে তাদের দক্ষতা এবং যোগ্যতার। অতি সম্প্রতি হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গিদের দেয়া আমাদের বিচার দেয়া বিচার বিভাগের ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের’ রায় প্রশংসিত হয়েছে বিবিসিসহ পাশ্চাত্যের মিডিয়াতেও।

মৃত্যু কখনো অন্যায় থেকে দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। এই বিষয়টি যে কোন বিবেচনায় আজকের প্রেক্ষাপটে আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রোরেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের চেয়ে শতগুণ বেশি জরুরি। একদিন হয়ত বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ছুটবে মেট্রোরেল আর আকাশ দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের ডজন-ডজন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। কিন্তু ইতিহাসকে ইতিহাসের সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আমরা যদি আজকে ব্যর্থ হই তাহলে একটি বিভ্রান্ত প্রজন্ম তৈরির দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের মুক্তি কখনোই হবে না। আর বাঙালির অহংকার থেকে যাবে অধরা!

তারিখঃ ০৫/১২/১৯