আত্মহত্যা করেছিলেন চিত্রনায়ক সালমান শাহ : প্রাথমিক তদন্ত শেষে পিবিআই

চিত্রনায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমান মিলেছে।
পুলিশের তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্ত শেষে আজ সোমবার এ কথা জানিয়েছে।
তদন্তে, সুরতহাল রিপোর্ট, ভিসারা রিপোর্ট, কেমিক্যাল রিপোর্ট, ময়না তদন্ত রিপোর্ট, বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের মতামত, হস্তলিপি বিশারদের মতামত, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিল্ডিংয়ে প্রবেশ এবং বাহির সংক্রান্তে বিশেষজ্ঞের মতামত, অডিও রেকর্ড, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত পর্যালোচনা, পূর্ববর্তী সকল তদন্ত প্রতিবেদন পুঙ্খানুপূঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা, বিভিন্ন দালিলিক সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, কাগজপত্র ও অন্যান্য সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে তার ‘মৃত্যু ফাঁসের দরুণ ঝুলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সম্পন্ন হয়েছে, যা মৃত্যুপূর্ব ও আত্মহত্যা জনিত বলে প্রতিয়মান হয়েছে।
পিবিআই’র তদন্তে ‘সালমান শাহ খুন হননি, তার মৃত্যু আত্মহত্যা জনিত’ বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।
তদন্তে সালমান শাহ এবং চিত্র নায়িকা শাবনুরের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সাথে দাম্পত্য কলহ, মাত্রাধিক আবেগ প্রবনতার কারণে একাধিকবার আত্মঘাতি হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা, জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে পড়ে পুঞ্জিভূত অভিমানে রুপ নেওয়া এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতার কারণে আত্মহত্যা করতে পারে বলেও পিবিআই’র তদন্তে উঠে এসেছে।
১৯৯৬ সালের ৯ জুন সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে সালমান শাহ’র পিতা মোঃ কমর উদ্দিন আহ্মদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, রাজধানীর ১১/বি ইস্কাটন প্লাজা, নিউ ইস্কাটন রোডস্থ বাসায় তার ছেলে সালমান শাহ’র সাথে দেখা করতে যান। সালমান শাহর বাসায় যাওয়ার পর সে ঘুমাচ্ছে শুনে তিনি সেখান থেকে ফিরে যান। একইদিন আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে চলচ্চিত্র প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম তাকে ফোন করে জানান সালমান শাহ’র যেন কি হয়েছে এবং তাকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন।
এ কথা শুনে তিনি তার স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে দ্রুত সালমান শাহ’র বাসায় গিয়ে দেখেন তার ছেলে সালমান শাহ শয়ন কক্ষে মরার মতো পড়ে রয়েছে। তখন তিনি উপস্থিত লোকজনদের সহায়তায় সালমান শাহকে বাসা থেকে বের করে দ্রুত নিকটস্থ ‘হলি ফ্যামিলি’ হাসপাতালে নিয়ে যান। যাওয়ার পথে তারা সালমান শাহ’র গলায় দড়ির দাগ দেথতে পান এবং সেসময় তার মুখমন্ডল ও হাত-পা নীলাভ ছিল।।
হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। তারা সেখানে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
সালমান শাহ’র পিতার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে রমনা মডেল থানায় অত্র অপমৃত্যু মামলাটি রুজু হয়। এসআই মোঃ মাহবুবুর রহমান মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন। তিনি মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে লাশ ময়না তদন্তের জন্য প্রেরণ করেন। সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করেন। ডাঃ তেজেন্দ্র চন্দ্র দাস মৃতদেহের ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। তিনি মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে মতামত প্রদান করেন যে, ‘মৃত্যু ফাঁসের দরুণ ঝুলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সম্পন্ন হয়েছে, যা মৃত্যুপূর্ব ও আত্মহত্যা জনিত। পরে বাদিরর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার ডিবি-তে হস্তান্তর করা হয়।
ডিবি’র সহকারী পুলিশ কমিশনার মোঃ হুমায়ুন কবীর মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। তার তদন্তকালে ১৯৯৬ ১৫ নেপ্টেম্বর সালমান শাহ এর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় সুরতহাল ও ময়না তদন্ত করা হয়। তিনি আলামত জব্দ করেন। ডাঃ নার্গিস আরা চৌধুরী মৃতদেহের ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। মামলার তদন্ত সমাপ্ত করে সালমান শাহ এর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আত্মহত্যা ব্যতিত কোন সন্দেহ না থাকায় অর্থাৎ সালমান শাহ এর মৃত্যুটি “আত্মহত্যা জনিত মৃত্যু” মর্মে প্রমাণিত হওয়ায় “চূড়ান্ত রিপোর্ট” দাখিল করেন।
তারপরও বাদিরর নারাজী আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত অপমৃত্যু মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ প্রদান করেন। ডিবি’র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মজিবুর রহমান মামলাটির পুনঃতদন্তভার গ্রহণ করেন। তার তদন্তকালে মো. রেজভী আহমদ ওরফে ফরহাদ (২০) সালমান শাহ এর পিতার বাসায় গিয়ে লেলিন পরিচয় দিলে তার বিরুদ্ধে ক্যান্টনমেন্ট থানার মামলা রুজু হয়। ঐ মামলায় তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সে আদালতে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে বলে জবানবন্দি প্রদান করে। এমতাবস্থায় বাদি আদালতে অপমৃত্যু মামলাটি পেনাল কোড ৩০২/৩৪ ধারা মতে হত্যা মামলায় পরিগণিত করে তদন্তভার সিআইডিকে অর্পণের আবেদন করেন। অপমৃত্যু মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় আবেদনটিসহ রেজভী আহমদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালত আইজিপিকে নির্দেশ প্রদান করেন।
সিআইডি সিটি জোন ঢাকার সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ খালেক উজ-জামান অপমৃত্যু মামলাটিসহ হত্যা মামলার আবেদন ও ফরহাদের জবানবন্দির বিষয়ে তদন্তভার গ্রহণ করেন। তার তদন্তকালে ফরহাদকে একজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট এর তত্ত্বাবধানে জিজ্ঞাসাবাদে সালমানের মৃত্যুর বিষয়ে সে কিছুই জানেন না এবং সে সালমানের একজন ভক্ত হিসাবে তার ব্যবহৃত কাপড়-চোপর ও ছবি সংগ্রহের জন্য বাসায় গিয়েছিল জানায়। ক্যান্টনমেন্ট থানায় ও পরবর্তীতে আদালতে যে জবানবন্দি লেখা হয়েছে এটা তার নিজের কোন বক্তব্য নয়। তাকে ক্যন্টনমেন্ট থানায় মারপিট করা হয়। সালমানের মা-বাবা, ওসি ও ২জন এসআই তাকে সালমানের হত্যার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিতে উদ্ভুদ্ধ করে। তার তদন্তকালে অপমৃত্যু মামলার পুনঃতদন্ত সমাপ্ত করে সালমান শাহ এর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আত্মহত্যা ব্যতিত অন্য কোন সন্দেহ বা অন্য কোন কারণ পাওয়া যায়নি।
পরে আবারও বাদি নারাজী আবেদন করেন এবং আদালত নারাজী আবেদন না-মঞ্জুর করেন। পরে বাদি না-মঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মেট্রো ক্রিমিনাল রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই অপমৃত্যু মামলাটির বিচার বিভাগীয় তদন্তের আদেশ হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদি ও সামগ্রিক বিষয়াদী পর্যালোচনায় অভিযোগকারীর আনিত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিয়মান হওয়ায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
পরে সালমান শাহ’র মা নিলুফার চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীর বিচার বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে না-রাজী আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি র‌্যাবকে তদন্তের নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে ফৌজদারী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানী শেষে আদালত র‌্যাব’র তদন্তের আদেশ রহিত করে, নি¤œ আদালতকে বাদীর নারাজীর দরখাস্ত আইনানুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রদান করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।
২০১৮ সালে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) ঢাকার পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সিরাজুল ইসলাম (বাবুল) মামলাটির তদন্তভার গ্রহন করেন। পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নির্দেশে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্তে সহায়তা করার জন্য পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ জুয়েল মিঞা ও মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার সমন্বয়ে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয় এবং তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও সার্বিক দিক-নির্দেশনায় মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
পিবিআই’র তদন্তকালে ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট চুয়াল্লিশ জনের জবানবন্দি ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়াও ১০ (দশ) জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং ঘটনা সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়।