জাতিগত খাদ্যাভ্যাসে বিশ্ববাসী সর্বনাশে

বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, নিপাহ, সার্সসহ বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন নামে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছে ভাইরাস। নামে ভিন্নতা থাকলেও রোগের লক্ষণ প্রায় অভিন্ন। শুরুটা সর্দি-জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট তবে দুর্ভাগ্য সঙ্গী হলে শেষটা হয় ভয়াবহ। এমন ভয়াবহতায় ভাগ্যবিড়ম্বনায় এ বছর এখন পর্যন্ত মৃত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১১ হাজার।

এবার দায়ী নতুন করে আলোচনায় আসা কোভিড ১৯, এককথায় সমীহ জাগানো করোনাভাইরাস। যদিও এ ভাইরাস সাধারণের কাছে নতুন তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে বলা হয়, এটি নতুন কোনো ভাইরাস নয়। ২০০২–এর যে সার্স, সেটিও একধরনের করোনাভাইরাস। তবে বর্তমানে করোনাভাইরাসের যে রূপ প্রকাশিত হয়েছে, তা আগের চেয়ে শক্তিশালী। এটাও একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ভাইরাসের বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন অণুজীব শক্তিশালী রূপ ধারণ করতেই পারে। পুরো ব্যাপারটাই স্বাভাবিক। অন্তত বিজ্ঞান তা–ই বলে।

তবে অস্বাভাবিক ব্যাপারটি হলো, বিষয়টি নিয়ে মানুষের মাঝে ভাবনার উদ্রেক না হওয়া। বর্তমানে মানুষ ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা আদৌ ভাবনায় আনতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়, যখন অদ্ভুত চিন্তাধারা, রুচিবোধ, খাদ্যাভ্যাস এসব বিষয়গুলো জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সুস্থতার সঙ্গে জীবনধারা, বিশেষত খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্কটা খালি চোখেই যেখানে অনুমেয়, সেখানেই দেখা যায় বিষাক্ত, অপরিচ্ছন্ন, অখাদ্যকে খাবার তালিকায় যুক্ত করার ‘ট্রেন্ড’।

চীনে ২০০২ সালে যে সার্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তা বাদুড় থেকেই ছড়িয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে মহামারি কোভিড ১৯ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ধারণা করা হচ্ছে অনিরাপদ কিছু প্রাণী দায়ী। সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, মার্বার্গ, হেন্দ্রাহ, নিপাহসহ বিভিন্ন ভাইয়াস কোনো না কোনোভাবে ছড়াচ্ছে বিপজ্জনক অনিরাপদ প্রাণীদের মাধ্যমেই।

বিভিন্ন প্রাণঘাতী ভাইরাসের সূচনা অনেক সময় সেসব দেশ থেকেই হচ্ছে, যেখানে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় ‘নড়াচড়া করে, এমন যে কোনো কিছু’কেই। নিতান্ত দুর্ভিক্ষ ছাড়াও যে কিছু বিষাক্ত প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন উপায়ে প্রস্তুত করে গ্রহণ করা যায়, তা দেখিয়েছে উন্নত বিশ্বের লেবেল আঁটা কিছু দেশ। সে ক্ষেত্রে চীনের নামটা ওপরের দিকে থাকলেও পার্শ্ববর্তী হংকংও আছে উদ্ভট ভোজনরসিক দেশের তালিকায়। এ ছাড়া কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ মাংস খাওয়ার প্রবণতা বিভিন্ন উন্নত দেশের খাদ্যাভ্যাসেই লক্ষ্য করা যায়। তবে সবটাই নিজ নিজ সংস্কৃতির অংশ। এ নিয়ে নাক উঁচু করে আঙুল তোলার কোনো অবকাশ একেবারেই নেই। তবে শঙ্কার জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটাও যে থাকছে না।

বিশ্বায়নের ফলে যে অবাধ দাপিয়ে বেড়ানো সারা বিশ্বজুড়ে, সেখানে বৈচিত্র্যময় কিছু সংস্কৃতি যদি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তবে তা ভাবনার ব্যাপার বৈকি। নিজ নিজ সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে যদি অপরাপর দেশ বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত না হতো, তবে এ নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগটা দুশ্চিন্তার সুযোগটাও বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন আর মানুষ একটি জায়গায় আবদ্ধ নয়। ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসারে নিজের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। স্পষ্টতই লক্ষণীয়, এই ছড়িয়ে থাকার সুযোগেই যেকোনো কিছু ‘ছড়িয়ে পড়া’ অন্য সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেকটাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের উল্টো পিঠে, ‘অদ্ভুত সংস্কৃতির’ দুশ্চিন্তাই বেশি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলো যখন তাদের উৎপাদন খাতে জ্বালানির অধিক ব্যবহারে বিশ্ব আবহাওয়াকে জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে যাচ্ছে, সেই সময়ে আজ দেখা যাচ্ছে, অদ্ভুত সংস্কৃতির অধীনে বিদঘুটে খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবে বিশ্বের পূর্ব থেকে পশ্চিমে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেসব জাতি এত সভ্য হিসেবে বিবেচিত তাদের বাহ্যিক আচরণে, তারাই যে ভেতরে-ভেতরে কিটের ঘর আর বিষের থলি বানিয়ে রেখেছে তা বিভিন্ন সময় কমবেশি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে খাদ্যশৃঙ্খলকে মেনে চলাও জরুরি। কেননা, পৃথিবীতে একটি জীব অপর একটি জীবের ওপর জীবনধারণের জন্য নির্ভরশীল। সর্বভুক স্বভাবের দরুন যেকোনো কিছু পেটে পুরে নেওয়াটাও যে প্রকৃতিবিরুদ্ধ। কিন্তু কিছু জাতি তা মানতে নারাজ। যার ফলাফলটাও হয় ভয়াবহ।

অবশ্য শুধু বিষাক্ত বা বন্য প্রাণীই নয়, অনেক সময় গৃহপালিত জীবজন্তুর মধ্যেও ভাইরাসের বিস্তার ঘটে। সে ক্ষেত্রে এতটুকু ধারণা তো স্পষ্ট, গৃহপালিত পশুর মধ্যেই যদি ভাইরাসের আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে বিষাক্ত বন্য প্রাণী ও কিট পতঙ্গ কতটা বিপত্তির কারণ হতে পারে। তবে এটাও ঠিক, বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমেই উন্নত দেশগুলো খতিয়ে দেখে, কোনো খাদ্যের খাদ্যোপযোগিতা কতখানি। এসব বিবেচনা করেই তারা কাঁচা, অর্ধসেদ্ধ বা বিষাক্ত প্রাণীকেও খাদ্যতালিকায় নিয়ে আসে। তবে এখন যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে চীনসহ বিশ্বের প্রায় দেড় শতাধিক দেশ, তা তাদের বৈজ্ঞানিক ফর্মুলার অবৈজ্ঞানিক ফলাফল নয় কি? অবশ্য আক্রান্ত অন্য দেশগুলোয় এই ভাইরাসের বিস্তার মূলত চীনে যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তারই সম্প্রসারণ মাত্র। মোবিলিটি বা যাতায়াতের মাধ্যমেই বিশ্বময় ঘুরে বেড়াচ্ছে কোভিড ১৯। এর দায় এড়ানো চীনের ক্ষেত্রে আপাতত অসম্ভব। তবু হয়তো তাদের খাদ্যাভ্যাসে ভুতুড়ে মেন্যুগুলোর পরিবর্তন আসবে না। এ যে তাদের সংস্কৃতির অংশ, যে সংস্কৃতির সঙ্গে সভ্যতার চেয়ে বর্বরতার ছোঁয়াই বেশি স্পষ্ট। যে সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে হুমকিতে পড়ে পুরো বিশ্ব, সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান নিতে পারে কি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা? বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির যদি কিছু করার থাকে, তবে ভবিষ্যতের জন্য এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, তা না হলে ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন মহামারির বিরুদ্ধে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠাসংবলিত বিবৃতি প্রদানে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হবে।

*শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।