কোভিড-১৯ ও সাইবার সচেতনতাঃ ব্যারিস্টার মোঃহারুন অর রশিদ,বিপিএম, ডিআইজি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ।

কোভিড-১৯ ও সাইবারসচেতনতা

লিখেছেনঃ ব্যারিস্টার মোঃহারুন অর রশিদ,বিপিএম, ডিআইজি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ। 

করোনা ভাইরাস ডিজিস (কোভিড-১৯) একটি বৈশ্বিক মহামারী-২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে এর প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে। পরবর্তীতে পৃথিবী ব্যাপী মহামারীরূপ নেয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২১৫ দেশে প্রায় ৪০,২৭,১১০ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২,৭৬,৩৮৬ জন মৃত্যু বরণ করেছে। বাংলাদেশে ৮ মার্চ ২০২০ কোভিড-১৯ সনাক্ত হয় এবং সর্বশেষ তথ্য মতে ১৩,৭৭০ জন আক্রান্ত এবং ২১৪ জন মৃত্যু বরণ করেছে। বিশ্ব করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভাল। এটি সম্ভব হয়েছে প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে এ দেশে কোভিড-১৯ মহামারী রূপ নিতে পারেনি। জানুয়ারি থেকেই এভাইরাসের সংক্রমন প্রতিরোধ কল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। বিমানবন্দর, স্থল বন্দর এবং সমুদ্রবন্দরে আসা যাত্রীদেরকে থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যমে স্ক্যানিং করা হয়েছে এবং ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দিগ্ধদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের কাজের মাত্রা এবং পরিধি দুই বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, খাদ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করন, লক ডাউন, ইতোমধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সনাক্ত করা (Contact tracing) এবং তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করণ ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করছে। অধিকন্তু পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা এবং অপরাধ দমন ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে।

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) যাতে সংক্রমিত না হয় সে লক্ষ্যে গণ সচেতনা মূলক বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এবং মিডিয়ায় সারাক্ষণ সম্প্রচার করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য বিধির সাথে সমন্বয় রেখে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন নির্দেশনা জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলছে। তবে একটি বিষয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে সাইবার অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (FBI) এর Internet Crime Complaint Center (IC3) এর মতে, করোনা মহামারীতে ইন্টারনেট ক্রাইম চারগুন বেড়ে গেছে। যেখানে দৈনিক ইন্টারনেট ক্রাইম সংক্রান্তে অভিযোগের সংখ্যাছিল কম বেশি ১০০০; সেটা বেড়ে গত কয়েক মাসে দৈনিক সংখ্যা প্রায় ৩০০০-৪০০০। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দীর্ঘ সময় মানুষকে বাসায় থাকতে হচ্ছে। অনেকে বাসায় বসে Online-এ অফিসের কাজ করছেন। অনেকে Online শপিং করছেন। অনেকে আবার Online বিভিন্ন সেবা নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সর্তকতা অবলম্বন করাটা অত্যন্ত জরুরী।

উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার প্রায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে মর্মে এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়। ইন্টারনেট ব্যবহার করে যারা অফিসের কাজ করছেন বা অন্যকোন জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে যেন আপনার অফিস যন্ত্র (কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন) কোন ভাবেই কম্পিউটার ভাইরাস বা malware আক্রান্তনা হয়। এটা হতে পারে কয়েক ভাবে। যেমনঃ আপনি যখন কোন ই-মেইলে কোন attach করছেন, ইন্টানেট থেকে কোন ফাইল বা ডকুমেন্ট download করছেন অথবা ইতো মধ্যেই ভাইরাস দূষিত কোন websitevisit করছেন।

ডিভাইসটি ভাইরাসে সংক্রমিত হলে Internet slow হিতে পারে, এর মাধ্যমে হ্যাকার আপনার ডিভাইসটিতে প্রবেশ করতে পারে, spammail পাঠিয়ে পাসওয়ার্ড চুরি করতে পারে। স্পাই ওয়্যার আরেকটি ম্যালওয়্যারযাডি ভাইস ব্যবহার কারীর অজ্ঞাত সারে তার কার্যক্রম মনিটর করে এবং ব্যবহারকারীর অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর তথ্যাদি যেমন-ক্রেডিট কার্ড নম্বর ইত্যাদি চুরিকরতে পারে। কাজেই suspicious কোন ই-মেইল বা ওয়েব সাইট খোলা অথবা ভিজিটকরা থেকে বিরত থাকা উচিত।তাতে আপনার ই-মেইল আইডি বা পাসওয়ার্ড বেহাত হওয়ার সম্ভবনা থাকে এবং এতে করে অফিসের অনেক গোপন ও স্পর্শকাতর তথ্য চুরি হতে পারে।

বর্তমানে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাজারে সুরক্ষা সামগ্রী যেমন-মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, স্যানিটাইজার ইত্যাদির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান Online এ এসব সুরক্ষা সামগ্রী বিক্রয় করছে। এ পরিস্থিতিতে স্বনামধন্য কোন অনলাইন বাজার প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ওয়েব সাইট বা অন্যকোনই-কমার্স প্লাটফর্মের নামে অথবা ভুয়া সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট খুলে সুরক্ষা সামগ্রী, মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই ইত্যাদি  বিক্রয়ের নামে অর্থ প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে।কাজেই authenticate অথবা verify নাকরে Online কোন transaction থেকে বিরত থাকা বাঞ্চনীয়।

টেলিফোনে ও প্রতারণার চেষ্টা হতে পারে। আপনার মোবাইল নম্বরটি ক্লোনিং করার মাধ্যমে আপনার নিকট আত্মীয় স্বজনদের কাছে আপনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে কোন বিকাশ একাউন্টে জরুরী টাকা পাঠাতে বলতে পারে বা আপনার বিকাশ একাউন্ট নম্বর অথবা পাসওয়ার্ডটি confirm করতে বলতে পারে। এভাবে আপনার একাউন্টের টাকা চুরির চেষ্টা করতে পারে। করোনা টেস্টের জন্য স্বাস্থ্য সেবার নামে কোন ই-মেইল ভুয়া ওয়েবসাইটে লগইন এর মাধ্যমে আপনার ই-মেইল address এবং password চুরিকরে অর্থ চুরির চেষ্টা ও করতে পারে।

উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ কোন অবকাঠামো (Critical infrastructure) বাস্বাস্থ্য সেবা অথবা হাসপাতালের ওয়েবসাইট হ্যাকিং (Hacking) করার চেষ্টা হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কোন অবকাঠামোর বা জরুরী সেবার কোন কম্পিউটার সিস্টেমকে লক্ষ্য করে ransomware পুশ করার চেষ্টা করতে পারে। এতে সিস্টেমটি লক হয়ে যেতে পারে এবং জরুরী সেবার ব্যাঘাত ঘটাতে পারে; এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে।

যারা Internet browse করে অলস সময় কাটাচ্ছেন তাদেরকে বলি,আপনারা সাবধানতা অবলম্বন করুন। যেকোনএ কটি সাইট বা একটি ই-মেইল আপনার কৌতূহলের কারণ হতে পারে অথবা আপনাকে প্রলুদ্ধ করতে পারে। ভুলেও এসব ওয়েবসাইটে spammail বা suspicious mail খুলে নিজের ডিভাইসকে (কম্পিউটার/ল্যাপটপ/মোবাইল) ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেননা। এধরনের সন্দেহ জনক সাইট বা ই-মেইলে প্রেরণের মাধ্যমে আপনার ডিভাইসটিতে ম্যালওয়্যার ইনজেক্ট করার চেষ্টা হতে পারে।ম্যালওয়্যার (malware) ঢুকে গেলে একই ডিভাইসে আপনি যখন আপনার মেইল আইডি এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আপনার ই-মেইলে ঢুকবেন তখন আপনার মেইল আইডি এবং পাসওয়ার্ড অপর প্রান্তে malware ইনজেক্টকারী/প্রেরণকারীর কাছে চলে যাবে। credential চুরির মাধ্যমে আপনার কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাব্যাংক একাউন্ট থেকে অর্থ চুরিহতে পারে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে,মিথ্যা বা গুজব (Rumour) ছড়ানো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social media) (ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব)ইত্যাদিতে যারা সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করেন তাদেরকে গুজবের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে উদ্দেশ্য মূলক ভাবে নানা রকম গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে সমাজে ভীতির সঞ্চার করা বা যে কোন ধরনের অস্থিরতা তৈরী করার দূরভিসন্ধি মূলক অপচেষ্টা হতে পারে। এ ধরণের যে কোন post শেয়ার করা বা লাইক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ ইহা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এহেন পরিস্থিতিতে, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতিপয় সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরী। যেমন-অনাকাঙ্খিত, সন্দেহজনক কোন ই-মেইল খোলা থেকে বিরত থাকা, বহু বৈশিষ্ট (multi-character) বিশিষ্ট শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। এতদ্ব্যতীত আপনার ডিভাইস (কম্পিউটার/ল্যাপটপ/মোবাইল) আপনার অনুপস্থিতিতে খোলানা রাখা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সচেতন করা প্রয়োজন।ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপনার অসতর্কতা বা অসাবধানতা আপনাকে সাইবার অপরাধের শিকারে পরিণত করতে পারে। কাজেই নিজে সচেতন হোন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে সচেতন করুন। আপনার সচেতনতাই পারে সাইবার স্পেসের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ।

তারিখঃ ০৯/০৫/২০