বিশ্বময় টিকা গবেষণার বর্তমান অবস্থান: অধ্যাপক আ ব ম ফারুক

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কভিডের টিকা বিষয়ে বিশ্বময় যে গবেষণা হচ্ছে তার এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যাদি অনুযায়ী জার্মান বায়োটেকনোলজি কম্পানি কিউরভেক, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না থেরাপিউটিকস এবং যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও জার্মানির বায়োএনটেক করোনার টিকা তৈরি করছে ম্যাসেঞ্জোর আরএনএ তত্ত্ব অনুযায়ী। তারা আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তাদের টিকা পরীক্ষামূলকভাবে মানব শরীরে প্রয়োগ করবে এবং এই অক্টোবর মাসেই ২০ মিলিয়ন ডোজ টিকা বাজারে নিয়ে আসতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি কম্পানি ইনোভিও টিকা তৈরি করছে ডিএনএ-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল স্কুল বলছে, তারাও এই ডিএনএ এবং আরএনএ-ভিত্তিক প্রযুক্তি পছন্দ করছে।

বিশ্ববিখ্যাত পাস্তুর ইনস্টিটিউটের ফরাসি বিজ্ঞানীরা হামের টিকার কিছুটা পরিবর্তন করে নতুন টিকা বানাতে গবেষণা করছেন। তবে এতে নাকি কম করে হলেও প্রায় ২০ মাস সময় লাগবে। এঁরা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নোভাভ্যাক্স এবং কাইসার পার্মানেন্ট ওয়াশিংটন হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাদের যার যার টিকা গবেষণার কথা জানিয়েছে যে তারাও জোরেশোরে টিকার গবেষণা চালাচ্ছে। তবে বাজারে আসতে তাদের আরো ১৮ মাস লাগবে। চীনের সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের বিজ্ঞানীরাও জানিয়েছেন যে চীনের একাডেমি অব মিলিটারি মেডিক্যাল সায়েন্সের গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর জন্য অনুমোদন পেয়েছেন। তাঁরা এরই মধ্যে বছরে ১০ কোটি ডোজ উৎপাদনে সক্ষম বিশাল একটি কারখানা বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁরাও দ্রুত বাজারে আসার চেষ্টা করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা টিকা আবিষ্কারের জন্য নতুন যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, জানা গেছে সেটি হলো করোনাভাইরাসের আবরণের স্পাইকগুলো যাতে মানুষের শরীরের হোস্ট সেলের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধা পায়। তাহলে শরীরে আর করোনা মাল্টিপ্লাই করতে পারবে না। কালক্রমে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল মেলবোর্ন হাসপাতালের ডোহার্টি ইনস্টিটিউট ও কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় উভয়েরই আশা, ডোহার্টি ইনস্টিটিউট কর্তৃক করোনাভাইরাসের জিনম সিকোয়েন্সকে ভিত্তি করে তৈরি করা তাদের আবিষ্কৃত এই টিকা অত্যন্ত কার্যকর হবে।

এদিকে জনসন অ্যান্ড জনসন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে তাদের টিকা গবেষণা বিষয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে যাতে কম্পানিটি তার আবিষ্কৃত টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বড় আকারে ও দ্রুত করতে পারে এবং এ বছরের শেষে ১০০ কোটি ডোজ উৎপাদন করতে পারে। জনসন অ্যান্ড জনসন নাকি এ লক্ষ্যে এ বছর এক বিলিয়ন ডলার খরচ করবে যার মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার দেবে মার্কিন সরকার। কম্পানিটির নেদারল্যান্ডসে একটি কারখানা আছে যেখানে টিকার ৩০০ মিলিয়ন ডোজ উৎপাদন করা যাবে। কিন্তু সারা পৃথিবীর চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম বলে কম্পানিটি মনে করছে। তাই সে তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে চাচ্ছে। টিকাটি কোন কৌশলে তৈরি হবে সে বিষয়ে তারা শুধু এতটুকুই বলেছে যে তাদের বিশ্বময় বিপুলভাবে জনপ্রিয় ইবোলার টিকাটি যে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজের মডার্না থেরাপিউটিকস যে টিকাটি তৈরি করছে, জানা গেছে সেটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস তাদের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করছে। সম্প্রতি এফডিএ তাদের এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর অনুমতি দিয়েছে। তবে এরা কেউই তাদের কারিগরি রহস্য এখনো খোলাসা করেনি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওষুধ কম্পানিগুলোর মধ্যে দুটি কম্পানি যৌথভাবে সানোফি এবং গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন (জিএসকে) আগামী বছর ৬০০ মিলিয়ন ডোজ করোনা টিকা তৈরি করবে। এ বছর তারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যন্ত যেতে পারবে। তারা কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে যেখানে সানোফি করোনা এন্টিজেন তৈরি করবে আর ভ্যাকসিন তৈরির অনুষঙ্গী উপাদানগুলো (এডজুভেন্ট) দেবে জিএসকে। জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ কম্পানি এনজেস যৌথভাবে একটি টিকা তৈরি করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে যা এখন প্রাণীদেহে এবং এর পর মানব শরীরে পরীক্ষা করা হবে। তারা এর বেশি কিছু এখনো জানায়নি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম তত্ত্ব ও কৌশলে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর টিকা আবিষ্কারের পথে হাঁটছে অনেকেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এ রকম ১২০টি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে পরীক্ষা চলছে। তবে আমাদের মতে এর মধ্যে প্রধান হলো বিভিন্ন দেশের ৩৫টি ওষুধ কম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বিশ্বময় ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। (বাংলাদেশের শিল্পপতিরা আজ পর্যন্ত কোনো সেক্টরেই যা দেখাতে পারলেন না!) এর মধ্যে চারটি টিকা গবেষণার প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আশাবাদী হতে চাই যে সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী জুন মাসের মধ্যে অক্সফোর্ডের একটি, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ও চীনের একটি করে এবং অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের আরো একটি টিকা বাজারে চলে আসবে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের আরো কমপক্ষে তিনটি টিকা আসবে তার পরের বছর। এই সময়ের মধ্যে পুরো কার্যকর না হলেও মোটামুটি কার্যকর কয়েকটি ওষুধও আমরা পেয়ে যাব। আমরা তখন করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারব। কারণ তখন হাতে অস্ত্র থাকবে তিনটি—১. বিজ্ঞানের এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক নিয়মকানুন, ২. টিকা, আর ৩. মোটামুটিভাবে কার্যকর কয়েকটি ওষুধ।

বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে মনেপ্রাণে চাই যে অক্সফোর্ডের টিকাটি এই জুনে যেন সত্যিসত্যিই বাজারে আসতে পারে। কারণ এই গবেষক দলটি আশাবাদী যে প্রাথমিক ইতিবাচক ফলাফলের কারণে তারা আগামী মাসের মধ্যেই এই টিকা বাজারে ছাড়তে পারবে। ব্রিটেন, ইউরোপ, ভারত ও চীন—এই চার জায়গায় আপাতত এর উৎপাদন শুরু হবে। বিপুল পরিমাণে উৎপাদনের জন্য তারা যুক্তরাজ্যের এসট্রা জেনেকা এবং ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। সিরাম ইন্ডিয়াও জানিয়েছে তারা আগামী জুনে এই টিকা বাজারে আনার চেষ্টা করবে, আর সেপ্টেম্বরে পুরো মাত্রায় বাজারে ছাড়বে। তারা জানিয়েছে এ চলতি বছরে টিকাটি তারা ৬০ মিলিয়ন অর্থাৎ ছয় কোটি ডোজ উৎপাদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির যত দ্রুত অবসান হবে ততই সবদিকে মঙ্গল। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট যখন পৃথিবীতে সবার আগে বিপুল পরিমাণ টিকা উৎপাদন শুরু করবে তখন সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের কারণে আমরাও নিশ্চয়ই এর কিছুটা অংশ পাওয়ার আশা করতে পারি। বাংলাদেশ ও ভারতের দুজন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিরাজমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখবে।

যত দিন করোনার ভ্যাকসিন না বেরোবে তত দিন এই মহামারি ঠেকানো কঠিন হবে। তত দিন আমাদের আত্মরক্ষা করতে কষ্ট করে ঘরে থাকতে হবে, কোয়ারেনটিন ও সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মানতে হবে এবং এগুলো করতে হবে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই সব নিয়মকানুনের খুঁটিনাটি মেনেই। অতি জরুরি না হলে ঘর থেকে বের হওয়া যাবেই না। আসুন সচেতন হই। বাঁচার জন্যই পাড়ার চায়ের দোকান আর বাজারে যখন-তখন না যাই। ভিড় করে কোথাও জমায়েত না হই। আর কিছু দিন লকডাউনে থাকলে এ কয় দিনে অর্থনীতির যতটুকু ক্ষতি হবে তা নিশ্চয়ই পরে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষতি তো পোষানো যাবে না।

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়