করোনাকালের কথা-পর্ব-১ থেকে পর্ব-৪ লিখেছেন ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল

করোনাকালের কথা-পর্ব-১ থেকে পর্ব-৪

লেখকঃ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
-চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

করোনাকালের কথা পর্ব-১

সকালে ভিসি স্যার ডেকেছিলেন আমার ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের নিয়ে একটা মতবিনিময় সভায়। তারপর ডিপার্টমেন্টে অনেকটা সময় কাটালাম। ডাক্তার-নার্স-স্টাফদের জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদির ব্যবস্থা করা, ওয়ার্ডে হাত ধোয়ার বেসিন বসানো আর আউটডোরে গ্লাস ব্যারিয়ারের জোগাড় করা- এসব করতে করতে দুপুর পার।

আজ দুটি ট্রেস হওয়ার কথা ছিল ল্যাবএইডে। রোগীদের কভিড রিপোর্ট না আসায় আপাতত স্থগিত করতে হলো। আমার একসময়ের ছাত্র আর এখন সহকর্মী ডা. ফয়েজ আর ডা. ডিউকে নিজের চেম্বার দেখাতে নিয়ে গেলাম। কভিড ঠেকানোর জন্য বিস্তারিত আয়োজন করেছি চেম্বারে। গ্লাস কেটে বসানো হয়েছে দুটি জানালা। সেন্ট্রাল এসি বন্ধ। চালু হয়েছে প্যাডেস্টাল ফ্যান। চেম্বারে ঢোকার মুখে রোগী এবং রোগীর একমাত্র অ্যাটেনডেন্টকে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ফ্রি সার্জিক্যাল মাস্ক। সঙ্গে আছে জুতা, ডিজইনফেকশনের ট্রে আর হ্যান্ড স্যানিটাইজ করার ব্যবস্থাও। রুমে কয়েকবার ছিটানো হয় ব্লিচিং পাউডারের সলিউশন, জ্বালানো হয় ইউভি ল্যাম্প। আমার প্রায় ১০০ স্কয়ার ফুটের চেম্বারে এখন একজন অ্যাটেনডেন্টসহ সর্বোচ্চ দুজন রোগী ঢোকার অনুমতি পায়। চেম্বার কমিয়ে করেছি সপ্তাহে তিন দিন আর এক দিন শুধু প্রসিডিউরের জন্য বরাদ্দ। তা-ও প্রপার পিপিই, ফেসশিল্ড, গগলস, গ্লাভস আরএন-৯৫ মাস্ক পরে। একই ব্যবস্থা আমার অ্যানেসথেসিস্ট আর এন্ডোস্কোপি অ্যাসিসট্যান্টদের জন্যও। রুটিন এন্ডোস্কোপি আপাতত বন্ধ। শুধু থেরাপিউটিক কাজগুলোই করছি। ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট ডা. ডিউ আর ডা. ফয়েজ। টুকটাক দু-একটা সাজেশন দিলেন। মনে মনে বেশ পুলকিত আমিও। আমাকে আর কভিডে পায় কিভাবে?
বাসায় ফিরে আবার বিস্তারিত প্রটোকল। জুতা-মোবাইল ডিসইনফেক্ট করে, কাপড়চোপড় ছেড়ে, গোসল করে কম্পিউটারে বসলাম। রাতে আবার বঙ্গবন্ধু থেকে কানেকটেড হতে হবে আরটিভিতে। তারপর আছে বাংলা ভিশন। হঠাৎই সন্ধ্যা ৭টার দিকে ল্যাবএইডের ফোন। এত কিছু করেও পারলাম না। রিপোর্ট আমার পজিটিভই এসেছে।
গতকাল দুপুরেই ল্যাবএইডে পরীক্ষা করিয়েছিলাম। বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমেই গিয়েছিলাম মোহাম্মদপুরে আল-মারকাজুল ইসলামের অফিসে। জানি শেষ দেখার সুযোগ নেই। কভিড সেই সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছে আমাদের কাছ থেকে। তার পরও গিয়েছিলাম। মোহাম্মদ নাসিম কেন যেন আমাকে আর দশজনের চেয়ে একটু বেশিই আদর করতেন। জয় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো, কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। এটাসেটা বলে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। সেখান থেকে সোজা চেম্বার আর তারপর পরীক্ষা। আগে থেকেই বলা ছিল, কাজেই পরীক্ষা করাতে কোনো ঝামেলা হয়নি।
ল্যাবএইড থেকে ফোনটা পেয়ে ধাক্কা খেয়েছিলাম, তবে অবাক হইনি। জানা ছিল, এ রকম একটা ফোন কোনো একদিন আসবেই। ডাক্তারি করব আর কভিডকে বারবার ফাঁকি দেব—এতটা ভালো কপাল সম্ভবত হবে না। বিশেষ করে স্বাস্থ্যের কর্মকর্তাদের কর্মগুণে দেশের হাসপালগুলোয় যে হযবরল অবস্থা!
বাসার একতলায় খাবারের ঘরটাকে শুরু থেকেই আইসোলেশনের জন্য তৈরি করে রাখা হয়েছিল। ডাইনিং টেবিলের জায়গায় পাতা হয়েছে খাট। ঘরটাকে বাসার সবাই বলে ‘করোনারুম’। তবে ঘরের ভেতরে যে অপ্রয়োজনীয় জিনিস একেবারেই নেই তা-ও নয়। নুজহাতের নেতৃত্বে সেসব সরানো-গোছানো শেষ হতে সময় বেশি লাগল না। ঘরের ভেতরে চা, বই, ল্যাপটপ, গরম পানির ফ্লাস্ক, মেনথল আর প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। এখন আমি ফিট ফর আইসোলেশন!
মাঝেমধ্যেই অবশ্য প্রচণ্ড অস্থিরতা হচ্ছে, মাঝেমধ্যে আবার সব স্বাভাবিক। হঠাৎ করেই খুব অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা অস্থিরতায় বুকটা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। খুব ভালোই বুঝতে পারছি এই পৃথিবী আর চারপাশের সুন্দর সব কিছু ছেড়ে ভেন্টিলেটরে চড়ার মানসিক প্রস্তুতি আমার একেবারেই নেই। ‘করোনারুম’ রেডি, ‘করোনা মন’ নয়। আমার নিজের এবং নুজহাতের, দুই পরিবারের গুরুজনের দায়িত্ব এখন আমাদের কাঁধে। আর আমরা যাঁকে গুরুজন মানি তাঁকে এসব মামুলি বিষয়ে বিরক্ত করি না একেবারেই। হঠাৎ কী মনে করে টেক্সট পাঠিয়েছিলাম, উত্তরও এসেছে। শক্তি হারাতে মানা করেছেন, বলেছেন শক্ত হতে, বলেছেন দোয়া করছেন। হঠাৎ অনেক শক্তি পাচ্ছি। এখন ঘুমাব।
১৫-৬-২০২০ সোমবার
সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট
মাত্র ঘুমটা ভাঙল। করোনাপূর্ব দিনগুলোতে ভোর ৪টায় ঘুমিয়ে অবলীলায় সকাল ৭টায় উঠে হাসপাতালে ছুটেছি। এখন দিন-রাতের হিসাব বদলে গেছে।  প্রায় দশক ধরে যে অত্যাচার শরীরের ওপর করেছি, তা পুষিয়ে নেওয়ার যে অপ্রত্যাশিত সুযোগটা কভিডের কারণে হঠাৎ পাওয়া, তা কড়ায়গণ্ডায় উসুল করে চলেছি বেশ কিছুদিন ধরেই। সকাল সকাল ঘুম ভাঙার আশা ইদানীং তা-ই দুরাশা। তার ওপর গত রাতে যে ইমোশনাল রোলার-কোস্টার রাইডটা গেল! ঘুম ভাঙল হৈচৈয়ে। জানালার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ল ল্যাবএইডের অ্যাম্বুল্যান্সটা। এ বাসায় সর্বশেষ এ রকমই একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসেছিল ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের সিসিইউ থেকে নিস্তব্ধ আব্বাকে নিয়ে। এবারের প্রেক্ষাপটটা অবশ্য ভিন্ন। এবার অ্যাম্বুল্যান্সে চড়ে এসেছেন আলমগীর ও সুজিত চাকমা। দুজনই ল্যাবএইডের টেকনিশিয়ান। অত্যন্ত করিৎকর্মা এই আলমগীর। উচিত ছিল আরো বড় কিছু হওয়া, অন্তত ম্যানেজার বা আরো ভালো কিছু। বিধাতার বিমুখতায় আপাতত টেকনিশিয়ান। বিচিত্র রঙের পিপিই পরে প্রস্তুত দুজনই। যমদূতসদৃশ বেশে তাঁদের আজকের আগমনের কারণ অবশ্য বেশ মহৎ। আমার পরিবারের সদস্যসহ বাসার অন্য বাসিন্দাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা কভিড আর কারো ঘাড়ে সওয়ার হলো কি না।
নুজহাত দৌড়ঝাঁপ করে সব আয়োজন করছে। উপস্থিত হেলালও। সেই কবে থেকেই আমার সব ভালোমন্দের ছায়াসঙ্গী। ১৯৯০-এর আগে-পরের সময়টায় মফস্বলের একটি অশান্ত ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির যত সিদ্ধনিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে আমার এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ সহচর। ডাক্তারি পড়েনি ঠিকই; কিন্তু আমাদের জামানায় আমাদের টানে অনেকটা সময়ই কাটিয়েছে ময়মনসিংহে। এতটাই যে এখনো অনেকের ধারণা ও হেলাল ডাক্তার। সেই থেকে চলার শুরু। তারপর পোস্টগ্র্যাজুয়েশন-ন্যাসভ্যাক-নির্মূল কমিটি-সম্প্রীতি বাংলাদেশে কোথায় নেই? আয়োজনও ব্যাপক। একে একে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে পোর্চের নিচে টুলে এসে বসছে একেকজন। পরিবারের সদস্য, হোম-এইড, ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড—একে একে সবাই। কভিড সাম্যে বিশ্বাসী, ধনী-গরিবে ভেদাভেদ রাখেনি। সবারই দুরুদুরু বক্ষ। যদিও মুখ দেখে বোঝার খুব একটা উপায় নেই বুকের ভেতর কী ঘটছে।
সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সম্ভবত কেউ দরজায় নক করেছিল। হয়তো বা নুজহাত কিংবা সুকন্যা-সূর্য। চোখ খুলতেই আমার করোনারুমের জানালা দিয়ে গেটের আলোটা চোখে পড়ল। আলো জ্বলছে, চলছে হূত্স্পন্দন। আসরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ভাঙল মাগরিবে। কদিন আগে কিট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় কিভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিলাম। নিজে যতটুকু বুঝি আর আমার চেয়ে যাঁরা আরো ভালো বোঝেন তাঁদের কাছ থেকে আরেকটু বুঝে নিয়ে এবং পাশাপাশি এদিক-সেদিক থেকে আরো কিছু ধারণা জোগাড় করে কেন যেন বাঙালির কল্যাণে খানিকটা ‘জ্ঞান বিতরণে’র চেষ্টা করেছিলাম। মনে বোধ হয় একটা সুপ্ত আশা ছিল লোকে লুফে নেবে, খানিকটা তালিটালিও পাওয়া যাবে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহটা ঠিক সে রকমের ছিল না। গালাগাল দিয়েছেন অনেকেই। জনৈক ভদ্রলোক ফেসবুকে কমেন্ট করে প্রার্থনা করেছেন আমি যেন সপরিবারে কভিডে মৃত্যুবরণ করি। একেবারে যাকে বলে কলিজায় গিয়ে খোঁচা দিয়েছিল ভদ্রলোকের প্রার্থনাটা। এটাসেটা, এই প্রাণীর শাবক আর সেই পশুর নাতি, শুনতে শুনতে এসব মেনে নেওয়াটা এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই বলে এতটা! গত রাতে কভিড পজিটিভ রিপোর্টটা হাতে পাওয়ার পর থেকে ভদ্রলোকের কথা মনে পড়েছে মাঝেমধ্যেই। আর এখন ঘুম থেকে উঠে খুব বেশি। কভিডের কাছে হেরে যাওয়া চলবে না। আমার মৃত্যু তা সে যখনই আসুক, কারো কারো কাছে যে তা উল্লাসের বিষয় হবে, সেটা আমি অনেক আগেই মেনে নিয়েছি। কিন্তু তাই বলে আমার মৃত্যুতে কেউ খুঁজে পাবেন তাঁর খোঁড়া যুক্তি খাড়া করার অজুহাত, সে সুযোগ দেওয়া যাবে না। এমন মৃত্যুকে আমি পরাজিত করবই।
রাত ৮টা ৩০ মিনিট
মাত্রই মামুনের ফোনটা রাখলাম। কাল থেকে বেচারা হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমার বাসার একতলায় গ্রামীণের সিগন্যাল জটিলতাটা আমি করোনাকালে বাসায় স্বেচ্ছাবন্দিত্বের সময়টাতে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মাঝেমধ্যে যে কাজের ঝামেলা হয়নি তা নয়, কিন্তু এখন এই আইসোলেশন কক্ষটিতে অত্যাচারের মাত্রাটা যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে যাচ্ছে সেটা ভালোই বুঝতে পারছি।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সদ্য নিযুক্ত ডেপুটি ডাইরেক্টর ডা. মামুন। দীর্ঘদিন একই হাসপাতালে সহকারী পরিচালক ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর চেয়ারটা আরেকটু উঁচু হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীতে ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে বাংলাদেশে এই প্রথম। দেশের প্রতিটি হাসপাতালে কভিড, নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসার কাজ চলছে ডাক্তারদের নেতৃত্বেই। অথচ নিজেদের চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁদেরই ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা। বঙ্গবন্ধুর অধ্যাপককে কখনো ঢাকা সিএমএইচ তো, কখনো ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভিসি মহোদয়ের যে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে, তার বর্ণনা শুনে এলাম খোদ তাঁর মুখ থেকেই গতকাল দুপুরের প্রশাসনিক বৈঠকে। সেদিক থেকে ব্যতিক্রম শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া।
তাঁর সঙ্গে আমার সখ্য সেই ১৯৮৮ সাল থেকে, যখন এই মফস্বলটিতে এমবিবিএস ডিগ্রির আশায় পা রেখেছিলাম, তার পরপরই। তখন তিনি ছিলেন উত্তম দা, অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া নন। কালের বিবর্তনে বিবর্তিত হয়েছে অনেক কিছুই। দাদা অধ্যাপক হয়েছেন, হয়েছি আমিও। ক্রমসম্প্রসারণশীল দৈহিক অবকাঠামো নিয়ে চাপা একটা প্রতিযোগিতাও আছে আমাদের মধ্যে। বিবর্তিত হয়নি শুধু মুজিবভক্তি, আওয়ামী আসক্তি আর আপার প্রতি একাগ্রতা। ফুসফুসের সিটি স্ক্যান বলছে, দাদার ২০ শতাংশ উধাও। মানুষ এখনো জানে না তেমনভাবে। আমিও জানাইনি। দাদা নিজে হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন আর ফাইল সই করছেন, ফেসবুকের কল্যাণে সেসব ছবিতে অনেকেরই স্বস্তি। দাদার ফুসফুসের গোমর তাই ফাঁস না হলেই ভালো।
এসব ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বড় কর্তা সেনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে তা কিন্তু খবর হয় না। সংবাদমাধ্যমের কোনো বন্ধু জানতেও চান না, যিনি হাজারো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাঁর চিকিৎসকদের চিকিৎসার জন্য দূরে থাক, নিজের চিকিৎসায় বিছানা কেন জোটে না তাঁর নিজের কোনো হাসপাতালে? স্বাস্থ্যব্যবস্থার ত্রুটিতে মৃত্যু হলে খবর হওয়া সহজ, কিন্তু যাঁরা স্বাস্থ্যসেবা দেন তাঁরা মারা গেলে খবর হন না। চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুবরণ অপরাধ। কিন্তু যাঁর অবিমৃশ্যকারিতায় দেশের হাজারো চিকিৎসকের মাথার ওপর সম্ভাব্য হুলিয়া তাঁর মুখ ঢাকা থাকে এন-৯৫-এ।
আমি বড় কর্তা না হলেও আমার কপাল আরো অনেক সহকর্মীর চেয়ে ভালো বলেই মনে হচ্ছে। মামুন জানিয়েছে, প্রয়োজনে দাদার পাশেই একটি কেবিনে জায়গা হবে আমারও।
রাত ৯টা ৩০ মিনিট
মাত্রই ল্যাবএইডের ফোন। করিৎকর্মা আলমগীর জানাচ্ছে, আমি একা নই। আপাতত নুজহাত আর সূর্য যোগ দিচ্ছে আমার খাঁচায়। আর আছে আমার সেক্রেটারি লেমন। সুকন্যা ফাঁকি দিয়ে দিয়েছে কভিডকে। বাকিদের রিপোর্ট আসতে আরো ঘণ্টাখানেক।

করোনাকালের কথা পর্ব-২

রাত ০১:৩০
মাত্রই ডিনার শেষ করলাম। গত কয়েক ঘণ্টায় ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে গেছে। পজিটিভ এসেছে রিমার, বাসায় থাকে, টুকটাক কাজ করে। সঙ্গে পজিটিভ হেলালও। এত দিনের ছায়াসঙ্গী কভিডেও সঙ্গ ছাড়েনি। বাসার ড্রাইভারসহ অন্যরা নেগেটিভ। তবে আমার ড্রাইভার সাবেরের রিপোর্টটা কেন যেন আসেনি।
রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক ফোন, ওষুধের জন্য যোগাযোগ। মানুষের অদ্ভুত ভালোবাসায় মাঝেমধ্যে কাঁদিনি বললে মিথ্যা বলা হবে। ফোন করেছিলাম পল­বকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একসময়কার নেতা পল­ব পেশায় ফার্মাসিস্ট। এখন বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ফেভিপিরাভিরের জন্য বললাম। বলল, পাঠিয়ে দেবে সকাল-সকাল। বললামÑএকজনের জন্য না, ওষুধ চাই সবার জন্য। কভিডের মতো আমিও পরিবারের সদস্য ও গৃহকর্মীর মধ্যে ভেদাভেদ করব না। অবাক করা উত্তর পেলাম। সকালবেলা ওষুধ আসবে, আসবে সবার জন্যই এবং বিনা মূল্যে। শুধু ছোট্ট একটাই অনুরোধ, আজ রাতের মতো যেন চালিয়ে নিই আমার নিজের ফেভিপিরাভিরের বরাদ্দটা থেকে।
ল্যাব সায়েন্সের স্বত্বাধিকারী ফারুক সাহেব। চোখের সামনে তড়তড়িয়ে বড় হতে দেখলাম ভদ্রলোকের ডায়াগনস্টিক সেন্টারটা আর সেই সঙ্গে তাঁকেও। শুধু বড় হননি দৈর্ঘ্যে আর ভাবভঙ্গিতে। বাসায় অনেকগুলো লেবু আর ডিম পাঠিয়ে দিয়েছেন। কী হিসাব জানি না, তবে বুঝতে পারছি, হিসাব করে এই ডিম-লেবুর হিসাব মেলানো যাবে না।
কিংবা এসকেএফের ডিরেক্টর ডা. মুজাহিদ। কদিনেরই বা পরিচয়। স্টেম সেল নিয়ে দু-তিন দফা বসা হয়েছে। বলা মাত্র রাজি হয়ে গেলেন রেমডেসিভির পাঠিয়ে দিতে। রাজি রেডিয়্যান্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের রেজাও। টসেলিজুমাভের কথা বলতেই এককথায় আস্বস্ত করল।
ডা. সুনান ইদানীং আমার নানা কাজের সহযোগী। চেম্বারে আনাগোনাও প্রায়শই। সম্ভাবনা ছিল ধরা খাবে, খায়নি। রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে। হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট পাঠাচ্ছে, বললেই চলে আসবে।
বন্ধু ইমন, বন্ধুর চেয়ে আরো বেশি। একসঙ্গে এক ছাদের নিচে ময়মনসিংহে কাটিয়েছি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬। তারপর দুজন দুই দিকে। ও সশস্ত্র আর আমি নিরস্ত্র চিকিৎসক। যোগাযোগটা অবশ্য প্রগাঢ়তরই হয়েছে। কদিন আগেই কভিড নিয়ে তিন-তিনটি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা করেছি। প্রতিটিতেই আমরা দুজন কো-অথর। এর মধ্যে একটা তো ওর কাজের ডাটা নিয়েই করা। ঢাকা সিএমএইচের কভিড চিকিৎসায় যে সাফল্য, সেটাই বৈজ্ঞানিক জার্নালে ডকুমেন্টেশন করা। ইমনের এখনকার রাশভারি নাম লে. ক. ডা. ফায়জুল হক। আর আছে ডা. মুবিন। আমার একসময়ের ছাত্র আর এখন কলিগ। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে লিভারের সহকারী অধ্যাপক।
ইমন আর মুবিনের অদ্ভুত মিল একটা জায়গায়। দুজনই ঠাণ্ডা, নির্ঝঞ্ঝাট, ছিমছাম। কিন্তু কভিড সামলানোয় দুজনেরই একেবারে ১৮০ ডিগ্রি অ্যাবাউট টার্ন। একজন ঢাকা সিএমএইচে কভিড ম্যানেজমেন্টের টপ পারফরমার আর অন্যজন কুর্মিটোলায়। আমার কপাল ভালো, ঘরে বসে আমি এদের দুজনেরই চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগটা পাচ্ছি। যখন খুশি ফোন দিচ্ছি, পরামর্শ নিচ্ছি আর বাসাটাকে হাসপাতাল বানিয়ে দিব্যি আছি।
একটু নিশ্চিন্ত লাগছে। হেলালের কাছে ওষুধ চলে গেছে। প্রথম চালান। আমার ভাগের ফেভিপিরাভির আপাতত ভাগাভাগি করছি সবাই। ফারুক সাহেব লেমনের/// খেয়াল রাখছেন দূর থেকে, কাছে থেকে।

রাত ০২:৩০
মাত্রই ফোন রাখলেন আকবর ভাই। করোনার এই সময়টায় তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বরাবরই আর্লি রাইজার। আমি ইদানীং উল্টো। তিনি ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরেন আর আমি ফোন রেখে ঘুমাতে যাই। ফোনে আড্ডা চলে নানা বিষয়ে, ভ‚ত-ভবিষ্যৎ, বিজ্ঞান-অবিজ্ঞান-দর্শন কী না! ইদানীং অবশ্য এই ফোনালাপগুলোও মোটামুটি করোনাময়ই। তিন-তিনটি পাবমেড পাবলিকেশন করেছি আমরা সদ্যই। এক্সেপটেড হয়েছে পাবমেড ইনডেক্সড জার্নালে আরো দুটি। পাইপলাইনে অপেক্ষমাণ কমপক্ষে আরো পাঁচটি। তবে মূল লক্ষ্য ন্যাসভ্যাক (সিআইজিবি ২০২০)-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। ওষুধটি অনুমোদিত হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের চিকিৎসায়। এটির উদ্ভাবনে আকবর ভাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলাম আমিও। সম্প্রতি কভিডের চিকিৎসায় ন্যাসভ্যাককে পেটেন্ট করেছি আকবর ভাই আর আমি, সঙ্গে কিউবা আর জার্মানির কয়েকজন সহগবেষক। ভারতের যেমন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, জাপানের ফেভিপিরাভির আর মার্কিনদের রেমডেসিভির, আমাদের গর্বের জায়গাটা হতে পারে এই ন্যাসভ্যাক। তবে কাজ করবে আশা করি ওগুলোর চেয়ে ঢের ভালো। এসব নিয়েই অসম বয়সী দুই বন্ধুর চলে নিত্যই ফোনালাপ।
দুদিন ধরে অবশ্য চাপা টেনশনে আছেন আকবর ভাই। গলার স্বরে বুঝি। দুজন দুজনকে বুঝতে দিই না শুধু। কিছু লাগলে ফোন করতে বললেন, ফোন খোলা রাখছেন। সাত সাগর আর তেরো নদীর ওপারে জাপানে বসে কী করতে পারবেন জানি না, তবে জানি পারলে করতেন। করতেন যা পারতেন না তা-ও।

ভোর ০৪:৩০
লেখালেখি আর পড়াপড়িতে সময় কোন দিক দিয়ে চলে গেল, ফজরের আজানের শব্দ আসছে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আÍজীবনী’ নিয়ে আবার বসেছি।
সকাল ১০:০০
জানালার বাইরে পরিচিত হৈচৈ। আবারও অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে হাজির আলমগীরের নেতৃত্বে ল্যাবএইডের ব্যাটালিয়ন। আম্মা, মুনমুন, মুনমুনের স্বামী জুয়েলসহ বাসার বাদবাকিদের স্যাম্পল কালেকশনে। আজকের আনুষ্ঠানিকতা গতকালের মতোই, তবে গতকাল এক দিনেই সাতজন পজিটিভ চলে আসায় আজ সবার ভেতর উত্তেজনাটা অনেক বেশি। আজ তদারকিতে মুনমুন, কারণ নুজহাতও আজ আমার মতোই ঘরবন্দি। আম্মা খুব একটা বুঝতে পারছেন বলে মনে হলো না। নাকি বুঝেছেন?

বিকেল ০৪:৩০
আলমগীরের ফোন। এখন আলমগীরের ফোন আমার কাছে অনেকের ফোনের চেয়েই অনেক বেশি দামি। এর মধ্যে টুকটাক চাউর হয়েছে আমার কভিড পজিটিভ। নুজহাতেরটা এখনো তেমন একটা মার্কেটে আসেনি। ফোন আসতে শুরু করেছে দু-চারটা করে। তালিকায় মাননীয় মন্ত্রীরাও আছেন। যেমন আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন চাচা। চাচি অবশ্য গত রাতেই ফোন দিয়েছিলেন। খবর নিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানও।
ফোন করেছিলেন রহিম ভাই, বিএসএমএমইউ হেপাটোলজি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনে আমার টুআইসি। জানতে চাইলেন ফোন ধরছি কি না। কেন, না? বললাম উত্তরে। বললেন, হেপাটোলজিস্টদের অনেকেরই মন খারাপ। তাঁকে ফোন দিচ্ছেন, জানতে চাইছেন আমি ফোন ধরছি কি না। শুনে বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। আহা! বড্ড সুন্দর পৃথিবীটা। মনে পড়ছে, আব্বাকে শেষবার ল্যাবএইডে নিয়ে যাওয়ার সময় আধো অচেতনে কী যেন বলতে চাইছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, যেতে চাইছিলেন না।
কেমন কাঁদিয়ে-ভাসিয়ে ভোররাতে চলে গেলেন বদরউদ্দিন কামরান চাচা। সিলেটে আব্বার চলি­শাটা হয়েছিল কামরান চাচার আয়োজনে, তাঁর বাসায়। আমি ঢাকা থেকে অতিথির মতো গিয়ে খেয়ে, মিলাদ পড়ে চলে এসেছিলাম। চাচার কুলখানিতে আমার যাওয়া হবে না।
দুদিন আগে চলে গেছেন মোহাম্মদ নাসিমও। আর কখনো দেখবেন না, কিংবা দরাজ গলায় বলবেনও না, ‘কি স্বপ্নীল, খবর কী?’
আলমগীরের ফোন করার কারণটা আরেকটা দুঃসংবাদ দেওয়া। আরেকজন পজিটিভ। আমার ড্রাইভার সাবের। ওর রিপোর্টটা এক দিন পরে এলো। আমি এখন আরো ১৬ জনের রিপোর্টের অপেক্ষায়।

সন্ধ্যা ০৬:০০
মুনমুন ফোন করেছিল। আমার বোন। উত্তেজিত, বিষণœ, হতাশ। কাছেই একটা অ্যাপার্টমেন্টে জুয়েলকে নিয়ে দুজনের সংসার। ওর বাড়িওয়ালা টের পেয়ে গেছেন। টেরটা পাইয়েছেন আমাদেরই পরিচিত আরেকজন, একই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা। বাড়িওয়ালার ভারি গোসসা হয়েছে। এ কেমন কথা? ভাই-ভাবি-ভাতিজা সবাই পজিটিভ! এ কেমন ভাড়াটিয়া? জানিয়ে গেছেন আমার সদ্য চুয়াত্তর পূর্ণ করা মাকে, যেন মুনমুন ভুলেও তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে আবার নিয়ে না তোলে। কভিড নেগেটিভ হলেও না।
সাধে কি আলেকজান্ডার সিন্ধু থেকেই পাততাড়ি গুটিয়েছিলেন? হাড়ে হাড়ে টের পেলাম আরেকবার। আর ওই যে আমাদের পরিচিতজন, ব্রেকিং নিউজ ব্রেকার, তাঁর বেয়াইন, চারদলীয় জোট সরকারের এক প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী আর এখনো জোটের বড় নেতার স্ত্রী, ওয়ান-ইলেভেনের পর যখন বঙ্গবন্ধুর প্রিজন সেলে আমার অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন, আদর্শের জায়গাটায় যোজন যোজনের ফারাক থাকা সত্তে¡ও বুঝতে দিইনি কখনোই। বয়সে তখন তরুণ ছিলাম। অধ্যাপকের আগে ছিল সহকারী। তার পরও চিকিৎসায় কোনো ত্র“টি রাখিনি। জোটের ওই বড় নেতার স্ত্রী আশা করি আজও সেটা স্বীকার করবেন। আর আমাদের যিনি পরিচিতজন, তিনিও কিন্তু কম বড় নন। যত দূর জানি, গত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ধানের শীষের প্রতীকটা তাঁর জন্যই বরাদ্দ ছিল। বুঝি না, এই বড় মানুষগুলো হঠাৎ হঠাৎ কিভাবে যেন নিজেদের খুব বেশি ছোট করে ফেলেন।

রাত ১০:০০
বাসার প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল এসেছে। স্টিয়ারিংয়ে এখন সুকন্যা। বাবা-মা-ভাই সবাই চার দেয়ালে বন্দি। নিজের ঘরে বসে বাসার প্রশাসনটা ভালোই দেখভাল করছে বেচারি। বাপের জন্য ক্ল্যাগজেন ইনজেকশন আর সূর্যর জন্য আইসক্রিম তো দাদির ওষুধের বিলÑসব সামলাচ্ছে ভালোই। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও ভালোই করছে। বাবা-মা-ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আর বাসার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয়ে পরামর্শের জন্য ভিডিও কল চলছে। একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্র“পও তৈরি করেছে মা-মেয়ে। নাম ‘উই শ্যাল ওভারকাম!’
বাসায় বেশ কিছু প্রশাসনিক বিধি-নিষেধও আরোপ করা হয়েছে। আমার করোনা রুমের জানালার লাগোয়া জায়গাটা ঘিরে দেওয়া হয়েছে তার দিয়ে। কেউ যাতে জানালার খুব কাছাকাছি চলে না আসে। আমাদের ওষুধপত্র, দৈনিক পত্রিকা আর প্রয়োজনীয় এটা-সেটা সাপ্লাইয়ের অন্যতম প্রধান রুট এই জানালাটাই। তবে মাস্ক-গ্লাভসের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বাসার পোর্চের নিচে গার্ড পোস্টে এসব পিপিই সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সঙ্গে হ্যান্ড স্যানিটাইজারও। প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনই সুকন্যা ফিস্টের আয়োজন করেছে। ফুডপান্ডার বদান্যতায় হাজির স্টেক হাউসের টি-বোন স্টেক। ডিনারটা জম্পেশ হবে। সূর্যর খুশি দেখে কে! সঙ্গে আমারও।

করোনাকালের কথা-পর্ব-৩

রাত-০২:০০ ডা. আকবর ভাইয়ের সঙ্গে প্রাত্যহিক ফোনালাপটা মাত্রই শেষ হলো। ৩২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু আমাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আর সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন। কিউবান কলিগদের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। অগ্রগতি ভালোই। ওখানে ২০ জনেরও বেশি রোগীকে ন্যাসভ্যাক দিয়ে কভিডের চিকিৎসা করা হয়েছে। এখানে আছি আমরা আরো চারজন। তাদের সঙ্গে আমাদেরটা আর সঙ্গে কিছু বেসিক ল্যাবরেটরি ডাটা জুড়ে দিয়ে একটা ভালো সায়েন্টিফিক পাবলিকেশনের প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

ঘুমাতে যাব, এখন পর্যন্ত সাতজনই অ্যাসিম্পটোমেটিক। একটু হালকা লাগছে। বিকন ফার্মার পল্লব আর ডা. সুনান জানিয়েছেন, প্রয়োজনে আমাদের হাসপাতালে ভর্তির খরচের দায়িত্বও নেবে তাঁদের কম্পানি। যদিও মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত তারা এই খরচটুকু করার সুযোগ পাবে না। তার পরও পৃথিবী থেকে ভালোত্বটা যে শেষ হয়ে যায়নি ভাবতেই ভালো লাগছে। ভালো টি-বোন স্টেক, তার চেয়ে ভালো রিসার্চ রিলেটেড ডেভেলপমেন্ট আর তার চেয়েও ভালো কিছু ভালো মানুষের ভালো কিছু কথা—ঘুমটা ভালোই হবে।

সন্ধ্যা-০৬:০০ আবারও আলমগীরের ফোন। এবার অবশ্য অত বেশি দুঃসংবাদ নেই তাঁর ঝুলিতে। এই দফায় পজিটিভ মাত্র একজন। ড্রাইভার কাওসার। এখন আর দু-একটা পজিটিভ রিপোর্ট আর তেমন একটা গায়ে লাগে না। বাসার কভিডকালীন প্রশাসনটাও দাঁড়িয়ে গেছে। ওকে দ্রুতই আইসোলেশনে পাঠিয়ে ওষুধের ব্যবস্থা করলাম। ওর ঠাঁই হয়েছে বাসার পেছনের স্টাফ অ্যাকোমেডশনের তিনতলায় সাবেরের পাশের ঘরটাতে। ওদের দুজনের আইসোলেশন নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব ড্রাইভার নাসিরের ওপর আর বাসার তিনতলায় রিমার আইসোলেশনের দায়-দায়িত্ব রাবেয়ার কাঁধে। সুকন্যা দ্রুতই তহবিল ছাড় করছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। সবচেয়ে সন্তুষ্টির ব্যাপার আম্মার রিপোর্টটা নেগেটিভ এসেছে। সঙ্গে আম্মার দেখাশোনার দায়িত্বে যে দুটো মেয়ে, তাদেরগুলোও। নেগেটিভ মুনমুন, জুয়েল আর ওদের বাসার অন্যরাও। এখন তোড়জোড় চলছে আম্মাকে মুনমুনের বাসায় পাঠানোর। জিনিসপত্র গোছানো, দরজা-জানালা ঠিকঠাকমতো বন্ধ করে দোতলার লকডাউন নিশ্চিত করা। এসব জিনিস বলার চেয়ে করাটা ঢের বেশি কঠিন। বাংলাদেশ নামক এত বড় সংসারটা যাঁর দায়িত্বে সেই বড় আপার জ্বালাটা অল্প হলেও টের পাচ্ছি মনে হচ্ছে।

রাত-০৮:০০ আম্মা মাত্রই গাড়িতে উঠলেন। জানালা দিয়েই বিদায় জানালাম। বুকের ভেতরে একটা চিনচিনে ব্যথা। জানি না এই যাওয়া কত দিনের। আর ফিরে আসাটাই বা কবে, কিভাবে? গাড়িতে ওঠার আগে আম্মা জানতে চাইলেন বাসার আর কে কে অসুস্থ। সুকন্যা-সূর্য ঠিক আছে কি না। তারপর অসহায় হাসি এবং গাড়িতে চড়ে ভিনবাসে যাত্রা!

১৮-০৬-২০২০ বৃহস্পতিবার রাত-১১:০০ সারা দিন লেখার সময় পাইনি। সত্যি বলতে কী, দম ফেলার ফুরসতও না। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির চাচা আর সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল ভাইয়ের যুক্ত স্বাক্ষরে একটা বিবৃতি গেছে প্রেসে দুপুর নাগাদ। প্রথমে বুঝিনি। বুঝতে বুঝতে বিকেল হয়েছে। আমি এই জীবনে এক সন্ধ্যায় যে এত ফোনকল আগে কখনো রিসিভ করিনি সে কথা হলফ করে বলতে পারি। বিরক্ত হইনি, অবাক হয়েছি, সঙ্গে আপ্লুতও। এত মানুষ যে আমাদের এত বেশি ভালোবাসে, কভিড না হলে জানা সম্ভব ছিল না। লম্বা এ তালিকায় আছেন যেমন মন্ত্রিপরিষদের মাননীয় সদস্যবৃন্দ, তেমনি মাননীয় সংসদ সংসদবর্গ, আছেন তেমনি আওয়ামী লীগ আর নির্মূল কমিটির সহযোদ্ধারা। আছেন সম্প্রীতি বাংলাদেশের সাথিরা। সাবেক ছাত্রলীগ যেমন আছেন, তেমনি আছেন ছাত্রলীগের বর্তমানরাও। আছেন রোটারিয়ান, চিকিত্সক, স্কুল আর কলেজজীবনের ফেলে আসা বন্ধু-বান্ধব। নামিদামি থেকে শুরু করে ছোটখাটো সংবাদকর্মী আর আমার অসংখ্য রোগীও আছেন।

ভোরের পাতা আর দ্য পিপলস টাইমসের সম্পাদক সৈয়দ ইরতেজা হাসান জানালেন কাকরাইলের তাবলিগ জামাতের মসজিদে বাদ মাগরিব সুরা ইয়াসিনের খতম শেষে দোয়া হয়েছে। আগামীকাল বাদ জুমা দোয়া হবে আজমিরে খাজা বাবার দরগায় আর দিল্লিতে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারেও। উদ্যোক্তা যথাক্রমে ভারতের জাইডাস ফার্মাসিউটিক্যালসের পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বড়কর্তা আমিরুজ্জামান আর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের এমবিএ করা খাদেম ফিদা নিজামী।

চট্টগ্রামের জয় জ্যোতি ভিক্ষুর সঙ্গে আমার পরিচয় সামান্যই। ইনবক্সে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের নন্দন কানন বৌদ্ধবিহারে সন্ধ্যায় আমাদের রোগমুক্তির জন্য আয়োজন করছেন অষ্টপরিষ্কারদানসহ ভৈষজ্য সংঘদান এবং সূত্রপাঠের। দুই বেলা করে পূজা চড়াচ্ছেন বন্ধু দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য ঢাকায় আর সিআরআইয়ের ছোট ভাই প্রতীক চক্রবর্তীর মা বগুড়ায়। কাল জুমার নামাজের পর বিশেষ দোয়া হবে বসুন্ধরার বড় মসজিদেও। আমার এক রোগী দৌড়ঝাঁপ করে আয়োজন করেছে। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির ভাই তাহাজ্জুতের নামাজ শেষে টেক্সট পাঠিয়েছিলেন। মোনাজাতে নাম নিয়ে দোয়া করেছেন আমাদের জন্য, করবেন ফজরেও। শাকিল ভাই বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’! তবে নিউটনের তৃতীয় সূত্রটিও আরেক দফা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। উত্তমদা, নুজহাত আর আমার অসুস্থতার খবর দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিদার একটি সংগঠন। তাতে ‘হাঁ হাঁ’ পোস্ট দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে অনেকেই। যত্ন করে একটা স্ক্রিন শট রেখে দিয়েছি। মামলা করার জন্য না। ওরা মামলারও অযোগ্য! রেখে দিয়েছি অবিশ্বাসীদের বিশ্বাসের জন্য আর স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার চেতনার প্রতি অচেতন মানুষগুলোর ব্যাপারে সচেতন মানুষগুলোকে আরেকটু সচেতন করে তোলার তাগিদে। আর পাশাপাশি নিজেকেও মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতে যে বেঁচে থাকতে হবে এবং যেতে হবে আরো অনেকটা পথ। হাল ছাড়া যাবে না মোটেও।

১৯-০৬-২০২০ শুক্রবার সন্ধ্যা-০৬:০০ সিটি স্ক্যানের রিপোর্টটা হাতে পেয়েছি সকালে। গতকাল সকাল সকাল চোরের মতো গিয়ে সিটি স্ক্যান করে এসেছিলাম আমরা তিনজন, সঙ্গে হেলাল আর লেমন। ব্লাড টেস্টগুলোর রিপোর্ট ঠিকই আছে। রক্ত জমাট বেঁধে তালগোল পাকানোর আশঙ্কা আছে বলে মনে হচ্ছে না। শুধু চেস্টের সিটি স্ক্যানে খানিকটা ছন্দঃপতন। আমার ডান ফুসফুসের মধ্যাঞ্চলে একটা শ্যাডো। আমাদের ভাষায় যেটা কনসোলিডেশন আর কভিডের ভাষায় পাঁচ কি ছয় নম্বর বিপদ সংকেত। রেডিওলজিস্ট প্রফেসর সালাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। ভদ্রলোক আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন। গলায় জোরটা শুধু খানিকটা কম। আশ্বস্ত হলামও ঠিকঠাক। এখন আমার বাঁচার আশার ল্যাম্পপোস্টটা ইমন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. ফায়জুল হক। হোয়াটসঅ্যাপে রিপোর্টগুলো পাঠিয়ে তারপর কথা সারলাম মাত্রই। আগে থেকেই ওর সঙ্গে চুক্তি ছিল আমার কভিড হলে ও টেলিমেডিসিনে চিকিত্সার দায়িত্ব নেবে। ইমন কথা রেখেছে। আমি অ্যাগ্রেসিভ চিকিত্সায় বিশ্বাসী। আগে থেকেই ক্ল্যাগজেন ইঞ্জেকশন নিচ্ছিলাম। ইমন সঙ্গে একটা অ্যান্টিবায়োটিক যোগ করে দিল। এখন সত্যি সত্যিই আশ্বস্ত বোধ করছি। ঢাকা সিএমএইচের ওপর কভিড চিকিত্সায় পুরো জাতির যে অগাধ আস্থা, তার বেশ কিছুটা কৃতিত্ব আমার এই বন্ধুটির প্রাপ্য। কথায় আছে, আপনা-আপনি বাজে শুধু ধর্মের ঢাক। বাকিগুলো বাজাতে হয়। আমি না হয় আমার বন্ধুর ঢাকটা বাজিয়ে একটু পুণ্যই কামাই করলাম।

রাত-১১:০০ মাত্রই একটা লাইভ শেষ করলাম। ফার্মানিউজবিডির। ফেসবুক পেজে সংযুক্ত ছিলেন স্বাচিপের জিএস অধ্যাপক ডা. আজিজ ভাই আর ফার্মাসিস্ট কাম সাংবাদিক কাম রবীন্দ্র গবেষক সুভাষ সিংহ রায়। জম্পেশ আলোচনা। বরং বলা ভালো, আড্ডাই হলো হসপিটাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগ আর স্বাস্থ্য খাতের নানা ঝুটঝামেলা নিয়ে।

ডিনার শেষে এখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। আজ একটু আগেভাগেই ঘুমাতে যাব ভাবছি। ফুসফুসকে একটু বিশ্রাম দেওয়া আর কি। সকালে সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পাওয়ার পর থেকেই অবশ্য ফুসফুসের যত্নে মনোযোগী হয়েছি। পেটের ওপর ভর দিয়ে শোওয়ার প্র্যাকটিসটা তো কয়েক দিন ধরেই করছিলাম। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বেলুন ফোলানোর কসরতও।

ঘুমানোর আগে কয়েকটা কভিড প্রজ্ঞা শেয়ার করি। ঘড় ঝাড়ু দেওয়াটা একটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সেই সঙ্গে মোছাটাও। তা সে যত ভালো ঝাড়ু আর ফ্লোর সুইপই হোক না কেন। এক দিন করেই শিক্ষা হয়ে গেছে। এখন নুজহাত দায়িত্ব নিয়েছে বলে বাঁচোয়া। তাই বলে দিনে তিন বেলা প্লেট-বাসন ধোয়টাও কিন্তু খুব মামুলি না। আরেকটা ব্যাপার—টাওয়েল অপেক্ষা গামছা শ্রেয়তর। এটি ধোয়া ডালভাত। আধা মগ পানিতে জেটে চুবিয়ে সহজেই একটি আস্ত গামছা ধুয়ে ফেলা যায়। এটি শুকায়ও খুব তাড়াতাড়ি। অতএব হাইজেনিক। পাশাপাশি টাওয়েলের পরিবর্তে গামছার ব্যাপক প্রচলন দেশীয় কুটিরশিল্পের জন্য প্রণোদনাদায়ী। অতএব কভিড-উত্তর নিউ নরমাল জীবনে টাওয়েলকে তিন তালাক।

২০-০৬-২০২০ শনিবার দুপুর-০৩: ১৫ গত দুই দিনে দুজন বিশিষ্টজন আম পাঠিয়েছেন। দুজনের বাড়ি দেশের ‘ম্যাংগো ক্যাপিটাল’ রাজশাহীতে। একজন মন্ত্রিপরিষদের মাননীয় সদস্য, অন্যজন আওয়ামী লীগ এবং পাশাপাশি নির্মূল কমিটির বড় নেতা। দুজনই বলেই পাঠিয়েছিলেন। কারোটাই আসেনি। আম পাইনি জানিয়ে বিব্রত করতে চাইনি দুজনের কাউকেই। করোনা বাড়িতে মানুষ আসে না, আম আসবে কোত্থেকে? ব্যতিক্রম দিব্যেন্দু-পর্ণা দম্পতি। পেশাগত জায়গা থেকে পরিচয়, এখন একসঙ্গে রোটারিয়ান। করোনাকাল সামাজিকতার সময় নয়। মানা করেছিলাম তাই, শোনেনি। জানালার বাইরের তারের লক্ষণ রেখার ওপারে দাঁড়িয়ে মলিন হাসিতে আনন্দ বিতরণের ব্যর্থ চেষ্টা করে মাত্রই বিদায় নিল। রেখে গেছে ব্লিচিং পাউডারের দ্রবণে সিক্ত একটা ফুলের তোড়া। করোনা কাদায় নরম হূদয়ে যে গভীর দাগটা রেখে গেল, জানবে না তা হয়তো কোনো দিনও।

বিকেল-০৫:০০ করোনাকালে লেখালেখি অনেক সহজ। হাতে সময় বিস্তর। হাসপাতাল আর চেম্বারের ঝামেলা নেই। সমস্যা একটাই। আমি বাংলায় টাইপটা করতে জানি না। তবে বিপদ পড়লে কাকেরও তো বুদ্ধি খোলে। ঠিক ঠিকই সে হাঁড়ির তলানিতে পড়ে থাকা পানি পানের ব্যবস্থা করতে পারে। অতএব আমার বুদ্ধিই বা খুলবে না কেন? লেখা রিডিং পড়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজে পাঠিয়ে দিলাম ডা. সুনানকে। খানিক পরেই টাইপ করে পাঠিয়ে দিল মেসেঞ্জারে এবং সেখান থেকে সেটা সোজা জাগোনিউজের ড. হারুন রশিদের ইনবক্সে। ডিজিটাল প্রযুক্তির কী সাবলীল প্রয়োগ। আবাহনী আর জাতীয় দলের একসময়ের ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালা কাকা সম্প্রতি মারা গেছেন। ১৯৮৮ থেকে ৯৬ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় তাঁর ভাড়াটে হওয়ার সুবাদে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সে সময়টায় ছাত্রদলের তাণ্ডবে হোস্টেল থেকে বহিষ্কৃত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রলীগের ছেলেগুলোকে ব্রাহ্মপল্লীতে বাসা ভাড়া পেতে সাহায্য করা আর সে সময়কার পরিভাষায় তাদের ‘শেল্টার’ দেওয়ার একটা বড় জায়গা ছিলেন তিনি। নিভৃতচারী এই মানুষটির জীবনের এ অধ্যায়টি না তুলে ধরলে নিজের কাছেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেই দায়িত্ববোধের জায়গাটা থেকেই অভিনব কায়দায় এই লেখাটি লেখা। আশা করি সামনে একই কায়দায় আরো কয়েকটি লেখা প্রকাশ করা যাবে।

রাত-১০:৩০ মাত্রই রাজ টিভির একটা টক শো শেষ করলাম। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হক স্যারের সঙ্গে সুভাষদা আর আমি। স্যার স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো নিয়ে ভালো ভালো কিছু কথা বললেন। উঠে এলো হসপিটাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগের বিষয়টিও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কুম্ভকর্ণদের কর্ণকুহরে এসব কথা ঢোকে বলে অবশ্য শোনা যায় না।

করোনাকালের কথা পর্ব-৪

আজ ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশি দেরি হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর পার। রাতে সিআরআইর ইয়াং বাংলার ফেসবুক লাইভ। জানতে চাচ্ছিল কভিড নিয়ে সংযুক্ত হতে পারব কি না। বলেছি অবশ্যই। বললাম মরেটরে গেলে জীবনের শেষ ফেসবুক লাইভ হিসেবে এটার ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এহেন বক্তব্যে অন্য প্রান্তে ইয়াং বাংলার জয়েন্ট কো-অর্ডিনেটর বেচারি ইশরাতের চেহারার অবস্থাটা কী দাঁড়াল দেখতে খুব ইচ্ছা হচ্ছিল।
রাত ১১:০০
মাননীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ভাইয়ের সঞ্চালনায় ইয়াং বাংলার ফেসবুক লাইভটা ভালোই গেল। কথা হচ্ছিল মানুষ কেন কথা শুনছে না। আমার ধারণা, আমাদের কমিউনিকেশনের জায়গাটায় বড় ধরনের ঘাপলা আছে। যে মানুষ হ্যান্ডমাইকের ঘোষণায় দলে দলে, লাখে লাখে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে হাজির হয়, তারা কেন বুঝবে না লকডাউনকে ফাঁকি দেওয়া মানে ফাঁকি দেওয়া নিজেকেই। আমরা যদি জয় বাংলা কনসার্ট করে মুক্তিযুদ্ধ চেনাতে পারি আজকের তারুণ্যকে আর মিনা কার্টুন যদি ঢুকে গিয়ে থাকতে পারে আমাদের শিশুদের হাইজিন সেন্সের গভীর গহিনে, তাহলে কভিড কেন না? নতুন নতুন ওষুধ আর ভ্যাকসিন নিয়ে একেকবার একেক রকম আলোচনা আর টক শোতে বিশেষজ্ঞদের মতদ্বৈততা কি তাহলে ভুল মেসেজ দিচ্ছে মানুষকে? আমাদের জারি-সারি, লালন-ভাটিয়ালি, কবি আর পটের গান আর যাত্রা বা পুতুল নাচ কিংবা হ্যান্ডমাইকের মতো ট্র্যাডিশনাল কমিউনিকেশন টুলগুলোকেও কি আমরা পাশাপাশি আরেকটু ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি না। এসব নিয়ে আলোচনা করতেই কোন দিক দিয়ে দেড় ঘণ্টা নেই। দুদিন বাদে আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। একাত্তরের আওয়ামী লীগের কাছে করোনাকালে ছোট্ট একটা প্রত্যাশা নিয়ে রাতে একটা লেখা লিখব জাগোনিউজের জন্য।

২২-৬-২০২০ সোমবার
সকাল ১১:০০
আলমগীর এসেছে। রক্ত পরীক্ষা হবে আমার। সিটি স্ক্যানে আমার ফুসফুসে কিছুটা চেঞ্জ আসায় এসব পরীক্ষা জরুরি। কভিড টেস্টটাও রিপিট করিয়ে নেব। সঙ্গে নুজহাতের আর সূর্যরটাও। আশা যদি নেগেটিভ আসে। মানুষ তো আশাতেই বাঁচে!

দুপুর ০৪:০০
আলমগীরের ফোন পেলাম আচমকাই। এবারে কোনো দুঃসংবাদ নেই। আমাদের তিনজনের রিপোর্টই নেগেটিভ। বিরাট মুক্তি। সূর্য তো আনন্দে রীতিমতো লাফাচ্ছে। তবে বন্দিদশা আপাতত কাটছে না। কাল দ্বিতীয় দফা পরীক্ষা হবে। সেখানে নেগেটিভ এলেই চূড়ান্ত মুক্তি।
করোনার আইসোলেশন কোনো সোজা বিষয় নয়। রুমে বসে থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জনের বিরল সুযোগ এটি। সঙ্গে ঘর পরিষ্কার করা, প্লেট-বাসন ধোয়া, মশার ওষুধ মারা, আগ্রহভরে গাদা গাদা ওষুধ খাওয়া আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের প্রতি ভালোবাসাটা ভালোভাবে রপ্ত করার সুযোগও এটা অবশ্যই। তা-ও আমার মতো দলে-বলে হলে ভালো। একলা হলে শ্রেফ মাথায় বাড়ি।
২৩-৬-২০২০ মঙ্গলবার
রাত ১১:৪০
আজ ঘুম থেকে উঠেছি বাদ আসর। ভাবা যায়? খেয়ে গোসল সারতে সন্ধ্যা। সন্ধ্যাটা কাটল কঠিন ব্যস্ততায়। প্রথমেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এশিয়ান টিভির টক শো। মাননীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান আর অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যারের মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব আলোচকের তালিকায়। ওটা শেষ না হতেই অপসোনিন ফার্মার ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ টেলিমেডিসিন। আর সেটা কোনোমতে নাকে-মুখে শেষ করেই সম্প্রীতি বাংলাদেশের সম্প্রীতি সংলাপ। আজকের বিষয়বস্তু আওয়ামী লীগের ৭১তম জন্মদিন। শেষ হতে হতে রাত সাড়ে ১১টা।

আজ দেরিতে ওঠার কারণ সারা রাত জেগে আওয়ামী লীগের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। ঘুমিয়েছি সকালের সূর্য আকাশে অনেক দূর ওঠার পর। ঘাটতে গিয়ে একটা জিনিস খুব ভালোই বুঝেছি। এত দিন না বুঝেই বলেছি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশ একে অপরের সমার্থক, আর এখন থেকে বলব ভালো করে বুঝে-শুনে। ভারত ভাগের আগেই বঙ্গবন্ধু একটা অখণ্ড বাঙালি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ আর কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতৃত্বের সম্মতিও ছিল এতে। সম্মতি ছিল ব্রিটিশ রাজেরও। প্রস্তাবটা শেষমেশ ধোপে টেকেনি মুসলিম লীগ আর কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরোধিতায়। ভারত ভাগের পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম দিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নটিকে স্বপ্নের জায়গা থেকে মানচিত্রে নামিয়ে আনার জন্য। সম্প্রীতি সংলাপে পীযূষ দা যখন জানতে চাইলেন সম্প্রীতি বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের জন্মদিন উদ্যাপনের ব্যাপারে আমার মন্তব্য তখন বললাম স্বাধীন বাংলাদেশে বসে যদি কোনো সংগঠন এই দিনটিকে উদ্যাপন না করে, তাহলে তা হবে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা আর রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
আজ জাগোনিউজের আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে আমার লেখাটা এসেছে। লিখেছি একটু গাটা ঝাড়া দিন। টানা সাড়ে ১১টি বছর ক্ষমতায় থাকার আত্মতুষ্টির সুযোগে ঢুকে পড়েছে কিছু সুযোগসন্ধানীর দল। একটু সতর্ক হলে শুধুই শুভ্রতা। কোথাও এতটুকুও কালিমা থাকবে না।

২৪-৬-২০২০
দুপুর ১২:০০
আজ আবারও স্যাম্পল টেস্ট করতে দিলাম। আলমগীর এসে নিয়ে গেল। আমরা যারা পজেটিভ সবার পরীক্ষাই রিপিট করালাম। শুধু রমজান ছাড়া। ওর মাত্র ছয় দিন হলো। হেলালের স্যাম্পল নিয়ে আমাদের বাসা হয়ে ল্যাবএইডে ফিরে গেল আলমগীর অ্যান্ড গং। লেমন ল্যাবএইডে গিয়ে স্যাম্পল দেবে। কাল মহামুক্তির প্রত্যাশায় সময় গুনছি।

রাত ১১:৩০
সম্প্রীতি বাংলাদেশের টেলিমেডিসিনের ১৩তম পর্বে আজ রোগীদের আরেক দফা লিভার রোগ নিয়ে পরামর্শ দিলাম। প্রথম পর্বটাও আমাকে দিয়েই শুরু হয়েছিল। ভালোই প্রগ্রাম হলো। এর পরপরই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের একটা জুম মিটিংয়ে যোগ দিলাম। আগে থেকে শিডিউল করা ছিল না। তাদের অনুরোধে ঢেঁকিটা গেলা। কিন্তু ঢুকে অদ্ভুত ভালো লাগল। অদ্ভুত ডেডিকেশন ছেলেগুলোর। আগামী সপ্তাহে তাদের ইউনিটের পক্ষ থেকে তারা শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে পিপিই বিতরণ করবে। ভালো উদ্যোগ।

ইমনের বাবা ফজলুল হক মিয়া চাচাকে নিয়ে আমার একটা লেখা আজ জাগোনিউজ প্রকাশ করেছে। ভোরবেলায় লিখেছিলাম। চাচার মৃত্যুবার্ষিকী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন। অনেক দিন ধরেই লিখব লিখব করছিলাম। বাবার মৃত্যুর দিনটিতে ইমনের একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস একটু নাড়িয়ে দিল। শেষমেশ লিখেই ফেললাম। তবে লেখাটা যে তাদের পরিবারকে এতটা ছুঁয়ে যাবে বুঝিনি।

একটা ভালো খবর। রোটারি বাংলাদেশের ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারি রোটারিয়ান আরিফ জেবতিক ভাই আমার ক্লাব সেক্রেটারি রোটারিয়ান পর্নাকে ফোনে জানিয়েছেন, আমরা রোটারি ইন্টারন্যাশনাল থেকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল সাইটেশন’ পেয়েছি। আমাদের রোটারি ক্লাব অব ঢাকা জেনারেশন নেক্সটের বয়স দেড় বছরের মতো। এই সাইটেশনটা কোনো রোটারি ক্লাবের জন্য রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। যেকোনো রোটারি ক্লাবের জন্যই এটি একটি বড় ব্যাপার। দুই বছরের কম বয়সী রোটারি ক্লাবের জন্য তো অবশ্যই।

২৫-৬-২০২০
রাত ১১:৩০
অনলাইনে কানেকটেড ছিলাম বিডিনিউজএক্সপ্রেসের ফেসবুক পেজে। আমি-নুজহাত একসঙ্গে। সঙ্গে মাননীয় তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। কানেকটেড অবস্থায়ই প্রথমে ল্যাবএইডের এমডি ডা. শামীম ভাই আর জেনারেল ম্যানেজার ইফতেখার ভাইয়ের পর পর দুটি টেক্সট মেসেজ আর তার পরপরই আলমগীরের ফোনে জানতে পারলাম আমাদের তিনজনের সেকেন্ড স্যাম্পল নেগেটিভ এসেছে। নেগেটিভ এসেছে হেলালসহ বাদবাকিদেরও। বাদ পড়েছে শুধু লেমন। মুক্তির গান বাজছে চারদিকে। কাল আইসোলেশন থেকে মুক্তি। তবে কোয়ারেন্টিন শেষে কাজে ফিরতে আরো দিন সাতেক।

গতকালই ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি বুদ্ধপ্রিয় মহাথেরো ভিক্ষুর নেতৃত্বে আমাদের রোগমুক্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছে সুদূর বিহারে বুদ্ধ গয়ার গৌতম বুদ্ধের বোধিবৃক্ষের পাদদেশেও। এদিকে স্বপন মামা কলকাতায় বসে প্রার্থনা করেছেন জগন্নাথদেবের কাছে দোলযাত্রার দিনে। অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা যে এ দেশের মানুষগুলোর হূদয়ের এত গভীরে প্রোথিত কভিডে আক্রান্ত না হলে এই বোধটুকু আমার কখনোই হতো না। নতুন করে আবার চেনা, চিরচেনা এই বাংলাদেশে কাল থেকে আবার নতুন করে চলতে শুরু করব—এই প্রশান্তি নিয়ে একটু পরেই ঘুমাতে যাব।

লেখকঃ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
-চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

তারিখঃ ১৩/০৭/২০