বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম পুনর্বাসন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তসহ দেশের সকল জনগণের জন্য মুজিববর্ষে আবাসন নিশ্চিত করতে তাঁর সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে মুজিববর্ষ উদযাপন করছি। তাঁর জন্ম শতবর্ষে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। প্রত্যেকটি মানুষকে যেভাবে পারি, গরিবানাহালে একটি চালা হলেও আমরা করে দেব।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ গণভবন থেকে ভিডিও কানফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারে ‘খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নামে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
শেখ হাসিনা এ সময় বন্যা মোকাবেলায় তাঁর সরকারের সকল ধরণের প্রস্তুতি থাকার উল্লেখ করে বলেন, ‘এবারে বন্যার প্রকোপটা একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। এটা হচ্ছে শ্রাবণ মাস, হয়তো ভাদ্র মাসের দিকে আরো পানি আসবে অর্থাৎ আগষ্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরো বন্যার আশঙ্কা থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি আছে সেটা মোকাবেলা করার। সেইসাথে বন্যা এবং নদী ভাঙ্গণে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তাঁদেরকেও আমরা ঘর-বাড়ি তৈরীর জন্য জমির ব্যবস্থা করে দেব। সেটাও আমাদের লক্ষ্য রয়েছে এবং সেজন্য এবারের বাজেটে আমরা আলাদা করে টাকা বরাদ্দ রেখেছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকেও আমি বলবো কোন মানুষ গৃহহারা থাকবে না প্রত্যেকটি মানুষ সুন্দরভাবে বাস করবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা মুজিববর্ষে একদিকে যেমন বৃক্ষরোপন কর্মসূচি নিয়েছি তেমনি গৃহহারাদের ঘর-বাড়ি করে দেব এবং যাতে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জীবন-মান উন্নত হয় সেটাও আমরা দেখবো।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে উপকূলবাসীকে বেশি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি দেশবাসীর প্রতি প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বানও পুণর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের গতি খুব ভাল ছিল । কিন্তু এই করোনাভাইরাস এসে সব জায়গাতেই একটা বাধার সৃষ্টি করেছে।’
সরকার প্রধান বলেন, ‘আমি সকলকে অনুরোধ করবো আপনারা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে সেগুলো মেনে চলবেন। মাস্কটা পড়ে থাকবেন, যখন বাইরে যাবেন বা কারো সাথে কথা বলবেন। নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।’
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ গণভবন থেকে এবং দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী কক্সবাজার প্রান্ত থেকে বক্তৃতা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রকল্পের একটি রেপ্লিকাও তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয় এবং প্রকল্পস্থানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তিনজন উপকারভোগী তিনটি গাছের চারাও রোপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী পরে ভিডিও কনফারেন্সে উপকারভোগী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মত বিনিময় করেন।
কক্সবাজারের খুরুসকুলে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠান স্থলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরেই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফ্লাট প্রাপ্ত পরিবারগুলোর হাতে ফ্লাটের চাবি তুলে দেওয়া হয়।
এদিন কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের বাঁকখালী নদীর তীর ঘেঁষা বৃহৎ এ প্রকল্পে নির্মিত ২০টি পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভবনে ৬শ’টি পরিবার নতুন ফ্ল্যাট পেল। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। পর্যায়ক্রমে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার এখানে ফ্ল্যাট পাবে।
প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন বুধবার এই প্রকল্প সম্পর্কে ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘প্রতিটি পরিবার এখানে ১০০১ টাকার বিনিময়ে একটি প্রায় ৪৫৬ স্কয়ার ফিটের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ফ্লাট পাবে। যেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক র‌্যাম্প, সোলার প্যানেল, বিশুদ্ধ পানির সুবিধা, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং গ্যাস সিলিন্ডার সম্বলিত চুলার ব্যবস্থা থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে ২৫৩ দশমিক ৫৯ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন ১৩৯টি ৫ তলা বিশিষ্ট ভবনে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার পুণর্বাসিত হবে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮শ’ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রকল্প এলাকায় ২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ৩৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য পরিশোধন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, তীর রক্ষা বাঁধ, ছোট সেতু, ১৪টি খেলার মাঠ, মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন, তিনটি পুকুর, নদীতে দু’টি জেটি এবং দু’টি বিদ্যুতের সাবস্টেশন থাকবে।’
প্রকল্পে আবাসন, পর্যটন ব্যবস্থা, শুটকি পল্লী বা ‘শুটকি মহল’ এবং সবুজ বনায়নসহ চার ধরনের সুবিধা থাকবে বলেও তিনি জানান।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প। জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য এখানে যে পুনর্বাসন, এটাকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম জলবায়ু পুনর্বাসন প্রকল্প বলতে পারি, এ ধরনের প্রকল্প পৃথিবীতে বিরল।’
আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা ফ্ল্যাট পাবেন তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে বিক্রয় কেন্দ্র ও প্যাকেজিং শিল্পও গড়ে তুলবে সরকার, বলেন তিনি।
তিনি আরে বলেন, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জ্বলোচ্ছাসে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ এবং পরবর্তীতে কুতুবদিয়া পাড়া, নাজিরাটেক এবং সমিতি পাড়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারি জনগণ যারা কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তাঁদের পুনর্বাসনের জন্যই মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ উদ্যোগ।
প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী পৃথকভাবে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটি জায়গা। এ জায়গাটিকে সুরক্ষিত করার জন্য মাটিকে অনেক উঁচু করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিচের তলায় কোনো ফ্ল্যাট রাখা হয়নি। ফলে, ঘূর্ণিঝড় হলে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢোকারও আশঙ্কা নেই।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেই গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রথম প্রকল্প গ্রহণ করেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় আসলে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প শুরু হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ৩ লাখ ১৯ হাজার ১৪০টি পরিবার ঘর পেয়েছে।
ঘুর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস, মঙ্গাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে তাঁর দল এবং তিনি মানুষের সাহায্যে সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন এবং সাধ্যমত ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৭ সালের ঘুর্ণিঝড়ের পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গিয়ে ৭০টি ঘর-বাড়ি হারা পরিবারকে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরু।
তিনি বলেন, ‘সেই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু এবং এর পরে আশ্রয়ণটাকে আমরা একটি প্রকল্প হিসেবে নেই এবং সশ¯্রবাহিনী তথা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরতদের এই ঘরগুলো করে দেওয়ার দায়িত্ব দেই। এগুলো ব্যারাক হিসেবে করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় যাতে এসব কেউ চাইলেই বিক্রী করতে না পারে।’
সে সময়কার অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের তখন সামর্থ তেমন না থাকলেও আমরা উদ্যোগ নেই প্রত্যেক গৃহহীনকে গরিবানা হালে হলেও একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই বা ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার।’
পরবর্তীতে আশ্রয় লাভকারীদের প্রশিক্ষণ, কাজের সুযোগ এবং ঋণ সুবিধা প্রদানের সুবিধা এসব প্রকল্পে অন্তর্ভূক্ত হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কক্সবাজারকে ঘিরে থাকা ঝাউবনগুলো উপকূলীয় এই পর্যটন নগরীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষায় জাতির পিতার নির্দেশে লাগানো হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারকে একটি আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলায় তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়নে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। সেখানকার মানুষের আগে চিংড়ি ও লবন চাষ ছাড়া কোস জীবন-জীবিকাই ছিল না। কিন্তু এখন আমরা বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। একদিকে যেমন পর্যটন কেন্দ্রগুলো হবে অন্যদিকে মানুষের সবরকম জীবন-জীবিকার ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলও সেখানে করে দেব।
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করতে গিয়ে দেখলাম জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪ হাজার পরিবার সেখানে উদ্বাস্তু হয়ে আছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এদের পুণর্বাসন করবো এবং এই খুরুশকুল জায়গাটাও আমিই খুঁজে বের করেছিলাম।’
তিনি কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এখন ২০টি ভবন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাকী ভবনগুলো নির্মাণ হবে। যেখানে সবকিছুই থাকবে, একটি আধুনিক শহর হিসেবেই খুরুশকুলকে গড়ে তোলা হবে।’
তিনি জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সে সময়কার আবাসস্থল পরিদর্শনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আপনারা যেভাবে কষ্টের মধ্যে ছিলেন কারণ আমি নিজে গিয়েছি এবং দেখেছি সে অবস্থা। কাজেই এখন আপনারা সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারবেন। আপনাদের ছেলে-মেযেরাও ভালভাবে বড় হবে, মানুষ হবে। সেটাই আমরা চাই। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এই ব্যবস্থা নিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন ঘর করে দিচ্ছি। পাশাপাশি যাদের জমি আছে তাঁদের ঘর করে দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ তহবিল নামে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা তহবিল করা হয়েছে। পাশাপাশি, যাদের ভিটা আছে কিন্তু ঘর নাই তাঁদেরও ঘর করে দিচ্ছি।
আজকে যে ঘর-বাড়ি করে দেওয়া হল সেটাকে ‘রিজেক’ আখ্যায়িত করে তিনি এ সবের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি আবাসস্থলের পরিবেশ উন্নত রাখার জন্যও সেখানে ফ্ল্যাট প্রাপ্ত সকলের প্রতি আহ্বান জানান।