কোভিত-১৯, নতুন পৃথিবীর দ্বার টিকে থাকার লড়াই

করোনা সংক্রমণের কারণে সাধারণ ছুটি শুরু হলে, তার প্রথম ধাক্কাটা আসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের, বিশেষ কওে সৌখিন পণ্য বিক্রেতাদের উপর। কারণ, মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য পণ্যের জন্য টাকা ব্যয় করাটা সঠিক মনে করছিলেন না। কেউ-ই বুঝতে পারছিলেন না যে পরিস্থিতি আসলে কোনদিকে যাচ্ছে। তাই তাদের যা কিছু উপার্জিত অর্থ আছে, সেটি তারা সঞ্চয় করতে চাইছিলেন। ঐ সময়ের জন্য এটি খুব স্বাভাবিক ঘটনাই ছিল। কিন্তু এরই ধারাবাহিকতায় ভাগ্যের চাকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো একাধিক গোষ্ঠীর মানুষের, বললেন ইশরাত জাহান তাতীয়া।
তাঁতী আর তাঁত প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ইশরাত জাহান তাতীয়া বলেন, ‘আসলে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দুই মাস কোন কাজ-ই করা যায়নি। সারাবছর বিক্রি চললেও ব্যবসায়ের কিছু মৌসুম থাকে। যেমন পহেলা বৈশাখ। এই দিনটিকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের অনেক বড় পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা তো ভেস্তে গেল। বন্ধ করে দিতে হলো বেচা কেনা। অনলাইন সার্ভিসের সবচেয়ে বড় সহযোগী কুরিয়ার কোম্পানী। তাদের সার্ভিসও বন্ধ ছিল। ধীরে ধীরে কাজ শুরু করলেও তা ছিল সীমিত পরিসরে।’
তিনি আরো বলেন, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে অনলাইন কার্যক্রমও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ৩/৪ মাস বন্ধ থাকার পর সব বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই তাদের কার্যক্রম অনলাইনে নিয়ে এসেছে, যা আমার মতো ক্ষুদ্র উদ্দোক্তাদের জন্য একটি বড় হুমকি। কার্যত কোভিড-১৯ আমাদের জন্য এটা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জই ছুঁেড় দিয়েছে।’
তাতীয়া বলেন, যে কোন ব্যবসায়িক কার্যক্রমই একটা চেইন ওয়ার্ক। একটা প্রতিষ্ঠান বন্ধ মানে শুধু ঐ প্রতিষ্ঠানের মালিকের ক্ষতি না। এর সাথে জড়িত কারখানা শ্রমিক, তাঁতী, ডেলিভারি কর্মচারী সবার কাজ বন্ধ হওয়া। এবছর এখন পর্যন্ত একটি উৎসবেও কাজ হয়নি। তাই তাঁদের রোজগারও হয়নি। তবে, এটা ঠিক যে অন্য সময়ের চেয়ে এই সময়ে অনলাইনে ক্রেতা বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।’
অনলাইনে খাবার নিয়ে কাজ করছেন তানজিল আহসান। তিনি তাঞ্জিল’স কিচেনের কর্ণধার। মিরপুর এলাকা থেকে কাজ করায় তাঁর কাজ বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। কারণ, কোভিডকালীন প্রথম লকডাউন হয় মিরপুর। তিনি বলেন, খাবার নিয়ে কাজ করাটা খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কারণ, এই পরিস্থিতিতে খাবারের ডেলিভারি সময়মতো ও নিরাপদে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
হোম কিচেন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ একটি নতুন আশার আলো তৈরী করেছে। কারণ, এই সময়ে দীর্ঘদিন সবার বাসায় সাহায্যকারীর অনুপস্থিতিতে হোম কিচেন সার্ভিস আমাদের কর্মজীবীদের জীবনে বিরাট অবদান রাখছে। তেমনি একজন নাজলাস কিচেনের কর্ণধার ফাতেমা আবেদীন নাজলা। দীর্ঘদিন বাজার যাচাই বাছাই এর পর তিনি তাঁর কাজ শুরু করেছেন গত জানুয়ারিতে। তিনি গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন দরিদ্র সংগঠন, এতিমখানার শিশু, ভাসমান মানুষ, পথ শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন। এক্ষেত্রেও পুরো প্রসেসটি অনলাইনে সম্পন্ন হয়।
কেরাণীগঞ্জের মেয়ে নুর জাহান সাদিয়া। পুরান ঢাকার বেঁচারাম দেউড়ী থেকে পরিচালনা করছেন তাঁর খাবার বিষয়ক উদ্যোগ ‘ঢাকাইয়া পাকঘর’। আজিমপুরের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে সদ্য পড়ার পাট চুকিয়ে আসা সাদিয়া তাই হোম কিচেন এর উদ্যোগকেই বেছে নেন। জানালেন, প্রচুর সাড়া পাচ্ছেন তিনি।
অনলাইনের একজন নিয়মিত গ্রাহক ফারজানা প্রিয়দর্শিনী আফরিন বলেন, ‘কোভিডকালীন এই পরিস্থিতিতে অনেকেই অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন কোনরকম হোমওয়ার্ক না করেই। এরা প্রথম অর্ডারে খুব ভাল সার্ভিস দিচ্ছে কিন্তু দ্বিতীয় বারে দেখা যাচ্ছে পণ্য খুবই নিম্ন মানের। এই ধরনের উদ্যোক্তা বেশিদিন বাজারে টিকে না। কারণ, তারা স্থায়ী ক্রেতা হারান। পণ্যের মানের সাথে যারা কোন আপোষ করেন না, তারা কাস্টোমারও হারান না।’
বিডিপ্রেনারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরামর্শক, সাজ্জাত হোসেন বলেন, কোভিড -১৯ এর ফলে সারা বিশ্বের মত আমাদেরও লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তা
ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে, এই পরিস্থিতি বেশ কিছু ইতিবাচক দিকও নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তরুন ও অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত উদ্যোক্তারা এই সময়টাকে তাদের স্কিল ডেভলপমেন্টে, বিজনেস রি-স্ট্রাকচার করতে কাজে লাগাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই সময়ে একদিকে যেমন অনেক ট্রেডিশনাল উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে, কোনোটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তেমনি তার বিপরীতে প্রচুর অনলাইন উদ্যোগেরও সূচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা যদি এসব উদ্যোগকেও একটি জায়গায় এনে দাঁড় করাতে পারি, তাহলেই আমরা বলতে পারবো যে, আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থেই ডিজিটাল হয়েছে।
তার মতে, ‘করোনার থাবা থেকে কবে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া যাবে তা যখন নিশ্চিত না, তখন এটুকুই বলা যায় যে প্রতিটি মহামারীই বিশ্বে একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করে, যা আমরা এখনই প্রত্যক্ষ করছি বা করতে যাচ্ছি।’