বাকৃবির স্বাধীনতার দুইটি প্রকৃত দলিলঃ লেখক মোঃ ইফতু আহমেদ।

বাকৃবির স্বাধীনতার দুইটি প্রকৃত দলিল

লেখক মোঃ ইফতু আহমেদ

মরহুম প্রফেসর ডঃ কাজী ফজলুর রহিম (১৯১৭-২০০৪) ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) এর একজন দেশপ্রেমিক উপাচার্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাওয়ার পরে, তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চে প্রশাসনিক ভবন চত্বরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি “স্বাধীন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়” নামে পরিচিত হবে যা ইংরেজিতে “Independent Bangladesh Agricultural University”। আমি তখন ১৮ বছর বয়সী এবং বাকৃবির ক্যাম্পাসের একজন যুবক হিসাবে স্বাধীনতার এই ঐতিহাসিক মুহুর্তের নীরব প্রত্যক্ষদর্শী। আমার প্রয়াত পিতা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ তখন, বাকৃবির শারীরিক শিক্ষা পরিচালক হিসাবে কাজ করতেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, চট্রগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুর আহমেদ চৌধুরী (১৯১৬-১৯৭৪) ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) স্বাধীনতার ঘোষণা পেয়েছিলেন এবং চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান (১৯৩০-১৯৭৪), এটি বাংলায় অনুবাদ করেন এবং ২৬ শে মার্চ দুপুর ২ টায় চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের রেডিও কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণা দেন।

এর ২৯ ঘণ্টা পর ২৭ শে মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে আরেকটি ঘোষণা দেন এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাটের মোদিনাঘাটে রেডিও কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানী দখলদার সেনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ ঘোষণা করেন। জিয়া নিজেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবেও ঘোষণা দিয়েছিলেন যার কোন ঐতিতিহাসিক সত্য ও মূল্য ছিল না।

ফলস্বরূপ, পরের দিন ২৮ শে মার্চ, ১৯৭১ মেজর জিয়া এটিকে সংশোধন করেন এবং সর্বদলীয় বৈঠকের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দেন, “”I, Major Ziaur Rahman, at the direction of our great leader Bangabandhu Sheikh MujiburRahman, do hereby declare that the independent People’s Republic of Bangladesh has been established. At his direction, In the name of Sheikh Mujibur Rahman, I call upon all Bengalees to rise up against the attack of the West Pakistani Army. We shall fight to the last to free our motherland. Victory is, by the Grace of Allah, ours. Joy Bangla!” অর্থাৎ “আমি মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঘোষণা করি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার। শেখ মুজিবুর রহমানের নামে আমি সকল বাঙ্গালীদের আহবান করি পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। আমরা মাতৃভূমির শেষ মুক্তির জন্য যুদ্ধ করবো। খোদার কৃপায় বিজয় আমাদের। জয় বাংলা।” সুতরাং জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর হিসাবে। এটাই ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতার প্রকৃত দলিল এবং বাকৃবির দুইটি ছবিসমূহ এর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণ করেI

প্রফেসর রহিম এবং কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রয়াত প্রফেসর ডঃ শামসুল ইসলাম
দু’জন ই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার তমঘা-ই-কায়েদ-আজম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। প্রফেসর রহিম এবং প্রফেসর ইসলাম উভয়ের গৌরবময় অবদানকে জাতির উপেক্ষা করা উচিত নয়। উভয়ই বাংলাদেশ স্বাধীনতার অন্যতম সেরা বুদ্ধিজীবী হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে প্রফেসর রহিম আমার কাছে পরিচিত ছিলেন। আমি তাঁর সোনার স্মৃতি লালন করি। তাঁর সেরা স্মৃতিগুলির একটি অন্যতম স্মৃতি হলো আমি তখন আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বার্ষিক এথলেটিক্স ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম এবং তিনি ছিলেন আমাদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি। ক্রীড়া শেষে, প্রফেসর রহিম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি তোমাকে তোমাদের বাসায় পৌছিয়ে দিব।” অতঃপর আমি তাঁর নীল মার্সিডিজ গাড়িতে তাঁর পাশে বসেছিলাম এবং বাসায় ফিরি।
রাইডিংকালে আমি তাঁকে বাকৃবির ক্যাম্পাসের আমাদের খেলার মাঠ সমতল করার কথা বলেছিলাম। কিছু দিন পরে, আমি লক্ষ্য করি বাকৃবির প্রকল্প অফিসের কর্মীরা আমাদের খেলার মাঠ সমতল করতে আসে। তিনি এমন সুন্দর শ্রোতা ছিলেন। এছাড়াও তিনি আমাদের ক্যাম্পাসের ছেলে- মেয়েদের জন্য ক্যাম্পাসের চারপাশে সুইং সেট স্থাপন করেছিলেন। আমাদের ক্যাম্পাসের ছেলেদের অ্যাথলেটিক স্বপ্ন পূরণের জন্য ধূমকেতু ক্লাব এবং সবুজ মেলা ক্যাম্পাসে গড়ে উঠে। আমি আমাদের বাকৃবি ক্যাম্পাস থেকে জুনিয়র ফুটবল এবং বাস্কেটবল লীগের মত যুব ক্রীড়া কার্যক্রমের আয়োজন করি এবং জাতীয় দৈনিক বাংলা পত্রিকা, দৈনিক ইত্তেফাকে ক্যাম্পাসের ক্রীড়া কাহিনী ছবিসহ প্রকাশ করি। এগুলি সবই সম্ভব হয়েছিল প্রফেসর রহিমের দয়ালু মনের বিশালতায়।

লেখক মোঃ ইফতু আহমেদ

তারিখঃ ০৩/১২/২০