কোভিশিল্ড : ভ্যাকসিন বাজারি পণ্য নয়ঃ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

লেখকঃ
চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
“কোভিশিল্ড নিয়েও পানি ঘোলা করার চেষ্টা কম হয়নি। হঠাৎ যখন গুজব উঠল ভারত সরকার নাকি কোভিশিল্ড রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, তখন একদল মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেন সরকার আগেভাগেই বিকল্প ভ্যাকসিন সোর্সিং করে রাখেনি। ব্যাপারটা এমন যেন ফাইজার, মডার্না আর এস্ট্রাজেনকা ভ্যাকসিন নিয়ে হাট-বাজারে বসে আছে। সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের টাকাপয়সা দিয়ে পাঠিয়ে দেবে আর তারা হাট থেকে ভ্যাকসিন কিনে নিয়ে চলে আসবেন”

বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ দিন বলেই বোধ হয় চেম্বারে রোগীর চাপ একটু বেশিই থাকে। তারপরও রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে চেম্বারে চলতে থাকা টিভির স্ক্রলে চোখ বুলিয়ে নেয়াটা কেন যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে এই করোনাকালে। ল্যাবএইডে আমার সুপরিসর চেম্বারে টেলিভিশনের আমদানিও এই করোনাকালেই। প্যানডেমিকে হেডলাইন বদলায় নিয়তই। সকালে যা ঠিকঠাক, বিকেলেই ঠিক তার উল্টোটা। আর মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক টিভি আর ফেসবুক লাইভে ঠিকঠাক পারফর্ম করার তাগিদ তো থাকছেই। সে কারণেই চেম্বারে সগৌরবে বিরাজমান টিভি। রোগীর বিরক্তির যাতে উদ্রেক না হয় আর পাশাপাশি চেম্বারে মৃদুলয়ে বাজতে থাকা রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে যেন না হয় সাংঘর্ষিক, সে কারণে টিভির ভলিউম কমানো থাকলেও, খানিক বাদে-বাদে আড়চোখে টিভির স্ক্রলে উঁকি দেয়া থামায় কে? আর এমনি উঁকিঝুঁকি দিতে গিয়েই চোখে পড়ল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ব্রেকিং নিউজ। বাংলাদেশে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার উৎপাদিত অক্সফোর্ড-এস্ট্রাজেনকার কোভিড ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’-কে ইমার্জেন্সি ইউজ অথরাইজেশন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সকালেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ঔষধ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সির ক্ষেত্রে ঔষধ, ইনভেস্টিগেশনাল ড্রাগ, ভ্যাকসিন এবং মেডিকেল ডিভাইস মূল্যায়নের’ জন্য গঠিত কমিটির বৈঠক। কোভিশিল্ডের অনুমোদন চূড়ান্ত হয়েছে ওই মিটিংয়েই। কমিটির সদস্য হিসেবে মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে আমারও। ডাক্তারি, অধ্যাপনা, সোশ্যাল এক্টিভিজম কিংবা প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে মিটিং-মিছিল লেগেই থাকে। সঙ্গে আছে নানা সায়েন্টিফিক সেমিনার আর এই তালিকায় করোনাকালের সর্বশেষ সংযোজন একের পর এক ওয়েবিনার। তারপরও সকালের ওই বিশেষ মিটিং আমার কাছে অন্য রকম তাৎপর্যবাহী। কারণটাও বোধগম্য। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘হলি গ্রেইল’। চলমান এই কোভিড প্যানডেমিক থেকে আমাদের মুক্তির হলি গ্রেইল এই কোভিশিল্ড প্রাথমিকভাবে দেশে সরকারি উদ্যোগে বিতরণের জন্য যে ৩ কোটি ভ্যাকসিন আসতে যাচ্ছে, তা এই কোভিশিল্ডই। পাশাপাশি বেক্সিমকো এ দেশে বেসরকারিভাবে সরবরাহ করবে আরো ১০ লাখ ডোজ কোভিশিল্ড। আমরা কোভ্যাক্সের মাধ্যমে যে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন জুন নাগাদ পাওয়ার প্রত্যাশা করছি, তার বড় অংশও সম্ভবত হতে যাচ্ছে বিশেষ এই ভ্যাকসিনই। কারণ, এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রি-কোয়ালিফিকেশন পাওয়া একমাত্র যে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি, তা সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে, আর সেই সক্ষমতা বাংলাদেশের তো বটেই, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সীমিত। এরপর যে দুটি ভ্যাকসিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন দৌড়ে এগিয়ে আছে, সে দুটি হলো মডার্নার ভ্যাকসিন আর এই কোভিশিল্ড।

সারাক্ষণতবে কোভিশিল্ড নিয়েও পানি ঘোলা করার চেষ্টা কম হয়নি। হঠাৎ যখন গুজব উঠল ভারত সরকার নাকি কোভিশিল্ড রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, তখন একদল মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেন সরকার আগেভাগেই বিকল্প ভ্যাকসিন সোর্সিং করে রাখেনি। ব্যাপারটা এমন যেন ফাইজার, মডার্না আর এস্ট্রাজেনকা ভ্যাকসিন নিয়ে হাট-বাজারে বসে আছে। সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের টাকাপয়সা দিয়ে পাঠিয়ে দেবে আর তারা হাট থেকে ভ্যাকসিন কিনে নিয়ে চলে আসবেন। সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি আমরা কোনো পর্যায়েই দেখিনি। একনেকের সাম্প্রতিক একটি বৈঠকে শুধু অতিরিক্ত ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্যই বাড়তি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কোভ্যাক্সের ভ্যাকসিন প্রাপ্তি আগেভাগে নিশ্চিত করতে সরকার গত ৭ ডিসেম্বর দেশব্যাপী কোভিড ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও বিতরণের নীতিমালা কোভ্যাক্সের কাছে জমা দিয়েছে। উল্লেখ্য, ওই দিন থেকেই কোভ্যাক্স আবেদনগুলো জমা নিতে শুরু করে। ফলে নিশ্চিত হওয়া গেছে আমরা একদম শুরুর দিকে কোভ্যাক্স থেকে আমাদের জন্য বরাদ্দ করা ভ্যাকসিনগুলো পেয়ে যাব, কারণ কোভ্যাক্স বলেই দিয়েছে যেসব দেশ আগে তাদের জাতীয় নীতিমালা জমা দেবে, তারা আগে তাদের ভাগের ভ্যাকসিন বুঝে পাবে।

কোভিশিল্ড দামেও কম। ফাইজার আর মডার্নার ভ্যাকসিনের দাম যেখানে পড়বে ২৫-৩৭ মার্কিন ডলার, সেখানে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের দাম ৫ ডলারের মতো, যা এমনকি ৭ ডলার দামের চীনা ভ্যাকসিনের চেয়েও সস্তা। ভারত এবং বাংলাদেশ, এই দুই দেশের সরকারই একই দাম, অর্থাৎ ৫-৬ ডলারে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন পাবে। একই দাম নির্ধারণ করাটাও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জানিয়েছেন, ভারত সরকার ভ্যাকসিনটি আরো কম দামে পেলে, সেই সুবিধা পাবে বাংলাদেশ সরকারও। কাজেই যারা ভ্যাকসিনের দাম নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছিলেন, মাঠে মারা গেছে তাদের সেই অসৎ উদ্দেশ্যও।

নানামুখী কথা হয়েছে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া নিয়েও। ভাবখানা এমন যে কোথাকার কোন মফস্বলের ভ্যাকসিন কারখানা থেকে কোভিশিল্ড আনা হবে। অথচ সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া শুধু ভারতেরই নয়, এটি বিশ্বেরও বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। বছরে তারা ১৫০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা রাখে আর বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীর ১৭০টি দেশের ইপিআই প্রোগ্রামে যেসব ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়, তার বেশিভাগটাই আসে এখান থেকে। আসারই কথা, কারণ বর্তমান বিশ্বে ব্যবহৃত টিকার দুই-তৃতীয়াংশ ভ্যাকসিন উৎপাদন করে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। ভ্যাকসিন গবেষণায় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। র‌্যাবিশিল্ড নামের এন্টি-র‌্যাবিস হিউম্যান মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিটি সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস মেডিকেল স্কুল যৌথভাবে উদ্ভাবন করে। এ ছাড়া তারা একটা ইন্ট্রান্যাজাল সোয়াইন ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়েও গবেষণা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ১০ কোটি ডোজ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ। ইউএস এফডিএ অনুমোদিত পুনের এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে হল্যান্ডের বিখ্যাত বেটোফেন বায়োলজিক্যালসকে কিনে নেয়।

এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতির যে অগ্রগতি, তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। আর ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের সাফল্যও নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৯ সালে গ্লোবাল ভ্যাকসিন এলায়েন্স (গাভি), মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যাকসিন হিরো পদকে ভূষিত করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর হাতে পদকটি তুলে দিতে গিয়ে গাভির সিইও ড. সেথ বার্কলে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা ভ্যাকসিনেশনের সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন’। আর অত দূরেই বা যাই কেন, লিভার বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি নিজেই তো জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে আমাদের সফল ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা গত বছরই হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নির্মূলের এসডিজি টার্গেটের প্রাথমিক মাইলফলকটি অর্জন করেছি। দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি-র প্রাদুর্ভাব এখন ১ শতাংশের নিচে, যার স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর। সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসসংক্রান্ত স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপের সদস্য হিসেবে আমি দেখেছি, সংস্থাটি এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কীভাবে মূল্যায়ন করে। যে এক হাজার একটা কারণের জন্য বাঙালি জাতি শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে, সেই তালিকায় মাত্রই যুক্ত হলো আরো একটি বিষয়।

তারিখঃ ১০/০১/২০২১