আর্টিফিশিয়াল লিবিডো: কুসুম তাহেরা

লিখেছেনঃ বিশিষ্ট কবি এবং লেখিকা কুসুম তাহেরা

আজ এক আশ্চর্য বৃষ্টি দেখল নীলাঞ্জনা। এমনটা এর আগে কখনো দেখেনি তার ৩০ বছরের জীবনে। তীব্র গরমের পর শ্রাবণ ফিরেছে শ্রাবণের বেশে। আগের দিনগুলো বর্ষার ফ্যাকাশে তুলিতে ডোবানো ছিল। রঙহীন শরীরে রঙহীন মন। শুধু শরীরের গল্পে চুম্বনের স্পর্শ নেই, আত্মার টান নেই। ব্যবধান শুধু হু-হু করে গেঁথে গেছে জীবনের অমিমাংসিত সমীকরণে।

রায়হান তার নতুন খদ্দের। এই নিয়ে সে ছয়-সাতবার এসেছে। আজকে বৃহস্পতিবার তার আসার দিন। প্রতি বৃহস্পতিবারে সে আসে নীলাঞ্জনার কাছে। কান্দাপাড়ার যৌনপল্লীর এক তলা টিনশেড বাড়িতে একটা রুম আলাদা করা। একটা খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিল আর একটা ওয়ারড্রব। ঘরের দুটি জানালা সিস্টেমে সাদা পর্দা লাগানো। এই ছোট রুমটাকে সাজিয়েছে নীলাঞ্জনা। সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে শুধু রায়হানের জন্য। খাটে রঙিন চাদর বিছিয়েছে। ঘরে রুম স্প্রে দিয়ে সুগন্ধ ছড়িয়েছে। নিজেও সেজেছে খুব সুন্দর করে। মুখে পাউডার দিয়ে মুখটা একটু সাদা করেছে। ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক দিয়েছে। মোটা করে চোখে কাজল দিয়েছে। ছিপছিপে শরীরে সরু কোমরে সবটুকুই পরিদৃশ্যমান… একছিটে চর্বি নেই সেখানে। সোনার বাটির মতো দুটো বুক। লাল ঠোঁটে আগুন লেগেছে যেন চৈত্রের দাবানলের মতো। এমন ধরনের সৌন্দর্য দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

রায়হান রুমে ঢুকেই খাটের কিনারায় গিয়ে বসল। নীলাঞ্জনা এক গøাস পানি নিয়ে তার সামনে গেল। তীব্র কড়া একটা পারফিউমের ঘ্রাণ রায়হানের নাকে গেল। রায়হান দিশেহারা হয়ে নীলাঞ্জনার হাত ধরে টেনে নিল নিজের বুকের ভেতর। সেই মখমলের মতন নরম শরীরের স্পর্শে কেঁপে উঠল রায়হানের পৃথিবী। নীলাঞ্জনার গালে গাল ঠেকিয়ে তীব্র গলায় বলল, তোমাকে অসহ্য রকমের সুন্দর লাগছে, তোমাকে আমি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করতে চাই, নষ্ট করতে চাই তোমার গহিনের অরণ্য।

মুহূর্তে ভ্রƒক্ষেপ না করে নীলাঞ্জনা ঝাঁপিয়ে পড়ল রায়হানের ওপর। ভেজা ভেজা ঠোঁটে অজস্র চুম্বন আঁকতে থাকল। রায়হান তার হাত ধরে তাকে নিজের ওপর টেনে নিল এবং ডুবে গেল এক ভালোবাসার পৃথিবীতে। নিজের দু’খানা হাত ওর হাতের ভেতরে গুঁজে দিল। নীলাঞ্জনার নিঃশ্বাস ভারি ও গরম হয়ে পড়ছিল রায়হানের ওপর। দুজন দুজনের চোখের ভেতরে ডুব দিল।

রায়হান উঠে একটা সিগারেট ধরালো। ব্যাকুলভাবে নীলাঞ্জনার চোখে তাকিয়ে বলল, নীলা, আমাকে একটু শান্তি দেবে? আমি তোমার ভেতরে ডুবে যেতে চাই।

ময়না বলল, কী বলছো তুমি?

তোমার না সুন্দরী বউ আছে, সংসার আছে, ছেলে আছে। রায়হান পাগলের মতো নীলাঞ্জনাকে চুমু খেতে খেতে বলল, আমি তোমার কাছে এলেই শান্তি সুখ পাই। আমাকে ফিরিয়ে দিওনা কখনো। তোমার টাকা যা লাগে আমি দেব। তারপর খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার আদর করতে থাকল। নীলাঞ্জনার শরীর শিহরণে কেঁপে কেঁপে ওঠল। এমন অনুভব তার আর কখনো হয়নি। কেউ এভাবে বলেনি কখনো তারে। খদ্দের এসেছে কাজ করে টাকা ছুড়ে চলে গেছে। শরীরের মধ্যেও কোনো বোধ নেই তার আর।

কিন্তু এই রায়হান প্রথম যেদিন আসে তার স্পর্শটাও ছিল অন্যরকম। এরপর এই নিয়ে একাধিকবার সে এলো। প্রতিবার নীলাঞ্জনার শরীর এমন কেঁপে কেঁপে আনন্দে ভরে ওঠে। রায়হান এক ঝটকায় নীলাঞ্জনার মুখখানা তুলে ঠোঁট নিয়ে নিজের ঠোঁটখানা চেপে ধরল। নীলাঞ্জনা ফিসফিসিয়ে বলল, দরজাটার ছিটকিনিটা খোলা রায়হান। রায়হান যেন সম্বিত ফিরে পেল। উঠে গিয়ে দরজা লাগিয়ে এসে আবার নীলাঞ্জনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এভাবে ঘোরের মধ্যে কাটত তাদের বসন্ত দিন, বসন্ত রাত।

বাড়ির মোড়ে হাঁটু অবধি পানি জমে রয়েছে। সপসপে ভেজা শাড়ি, ভেজা মাথা নিয়ে নীলাঞ্জনা দাঁড়িয়ে রইল নিচেই। সন্ধ্যে হয়নি কিন্তু এক আকাশ অন্ধকার হয়ে পৃথিবী সন্ধ্যার আয়োজন করতে ব্যস্ত। নীলাঞ্জনা অপেক্ষা করে রায়হানের জন্য। সকাল গড়িয়ে দুপুর আবার দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা, আবার সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে আসে কালো অশ্বের গতিতে। কিন্তু রায়হান আসে না…রায়হানরা কি সত্যি আসে?

নীলাঞ্জনা একটু এগিয়ে গিয়ে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে ডেকে বলল, খেয়াল করে দেখেছো সবাই আমাদের এলাকা কেমন শুনশান নীরব হয়ে গেছে। কাকপক্ষীরও কোনো খবর নেই। মোড়ের কুকুরগুলোও ক্ষুধার্ত কেমন বেঘোরে পড়ে ঘুমাচ্ছে।

নীলাঞ্জনা কান্দাপাড়ার নিষিদ্ধপল্লীর বাসিন্দা। নিজেকে ‘বেশ্যা’ বলে পরিচয় দিতে তার বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবাধ করে। ধবধবে সাদা তার গায়ের রঙ। লম্বা প্রায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। চুলগুলো কোঁকড়ানো লম্বা। ছিপছিপে গড়ন আর ভারী নিতম্বে তাকে সুন্দরী লাগে। ঠিক কী কারণে সে নিজেকে বেশ্যা ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তার ব্যাখ্যা সে গুছিয়ে বলতে পারবে না। এসব যৌনকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অক্ষরকর্মী মিষ্টি শব্দগুলো পুরুষতন্ত্রের সাজানো ফাঁদ। পুরুষ তার আনন্দ ফূর্তির জন্য টাকা খরচ করে নিজেকে বিকিয়ে দেয় শরীর শরীর খেলায়, নিজেও বেশ্যা সাজে রোজ। কিন্তু বেশ্যা শব্দের ক্ষেত্রে নারীদের একতরফা নোংরা করতে থাকে। অন্য সবাই নোংরা ভাবলে ভাবুক নীলাঞ্জনা ভাববে না।

অতশী, মল্লিকা, জুঁই, তারাদের নিয়ে একটা মিটিং বসে। তাদের এই কান্দা পাড়ায় ক্রমেই খরিদ্দার কমে যাচ্ছে। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া দোকানের হোর্ডিংয়ের মতো কান্দাপাড়ার বেশ্যাপাড়া ক্রমেই যেন মুছে যাচ্ছে মলিন অবসাদে। অথচ কিছুদিন আগেও এই কান্দাপাড়ার বেশ্যাপাড়া কতই না রমরমা ছিল।

দেশি মদ, দেশি খাসি, মুরগি দিয়ে ভজন-ভোজন হতো। এখন বিলেতি মদ, নেশাদ্রব্য গ্রাস করছে কান্দাপাড়ার বেশ্যাপট্টি। হিন্দি গান ধুমচিয়ে বাজতে থাকে। সঙ্গে শরীর দোলানো তালহীন নাচ।

কান্দাপাড়ায় এখন নতুনত্ব এসেছে সুমি, রুমি, ময়নার মতো শাড়ি পরা পুরুষ আকৃতির কিছু মানুষ। এদের কণ্ঠ ভারী, বুক ভর্তি লোম, হাত ভর্তি লোম, বুকের লোম ভেদ করে উঠে এসেছে দুটি স্তন। এই স্তনের কৃতিত্ব এনড্রোক্রিনোলজিস্ট ডক্টরের হরমোন থেরাপির। এদের নিয়ে নীলাঞ্জনার ভয় আছে, হিংসাও আছে। এদের যৌন আচরণ ভিন্ন প্রকৃতির। পুরুষরা এদেরকে এখন মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কাস্ট করে। এদেরকে ‘বাটলি বালি’ বলে সবাই। বাটলি ওয়ালি বা বাটলি বালি হচ্ছে পশ্চাদ্দেশ বা নিতম্ব। কেটলি যেমন গরম চা ঢেলে দেয়, তৃষ্ণা জুড়ায়, বাটলি তেমনি খরিদ্দার পুরুষের উষ্ণ গরল বীর্য ধারণ করে, তৃষ্ণা মেটায়।

নীলাঞ্জনা ভেজা শরীর নিয়ে ওপরে উঠে গেল। কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে গেলেই তাদের ঘিঞ্জি ঠাসা ঘর। সুমি হেলেদুলে এসে পুরুষ কণ্ঠে বলল, কিরে নাগর ধরতে পারলি না? আয় আমাদের সঙ্গে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি।

সুমি, শাড়ি বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে প্যান্ট, লুঙ্গি পরে চন্দন হয়ে যায়। রুমি শাড়ি বাদ দিয়ে পাঞ্জাবি পরে রাসেল হয়ে যায়।

ময়না শাড়ি বাদ দিয়ে রান্না বান্না ছেড়ে মসজিদে তারাবি পড়ে, জামাতে নামাজ পড়তে যায়।

কান্দাপাড়ার বেশ্যাপাড়ায় খঞ্জনী বেজে ওঠে হারমোনিয়াম ডুগি তবলার সঙ্গে। বিভিন্ন চাহিদা বিভিন্ন আয়োজন। যখন যেমনটি রূপ ধরা যায়, ধাঁধায় ফেলানো যায়। কোনটা তাদের রূপ, কোনটা সত্যি, কোনটি মিথ্যা এই সাইকোলজির ঘোরপ্যাঁচে এক আশ্চর্যের পৃথিবীতে অবাক হয়ে ভেবে যেতে হয়।

ভদ্রলোকের ডেরায় সুমি, রুমি আর ময়নাদের সাজানো সংসার আছে, ঘরে কারো বউ আছে, স্বামী আছে, সন্তান আছে। তাদের চাদর টানটান করে বিছানো সংসার আছে, আলনায় গোছানো কাপড় আছে, বাথরুমে শরীর পরিষ্কারক সাবান আছে। বড় বড় মাছ কিনে বড় ডেগে রান্না হয়, গরু জবাই দিয়ে আকিকা করানো হয়।

ঘর সাজানো ফার্নিচার লাখ টাকার ওপর। বড় ফ্রিজারে মাছে মাংস উপচে পড়ে। কান্দাপাড়ার অন্ধকার আজব বাটলি ব্যবসা তাদের জীবন সহজ করেছে, বিলাসময় করেছে।

রাতে থাকার ব্যাপার নেই। কাজ করো, টাকা নাও, ফূর্তি করো, বাড়ি যাও।

এই সুমি, রুমি, ময়নাদে? নিয়ে সর্দার খালাদের সমস্যা নেই। নাবালিকা কেস নেই, পুলিশের ঝামেলা নেই। এনজিও প্যারা নেই। তার ওপর বাটলি এখন ডিক্রিমিনালাইজড। চারশ নিরানব্বই অকেজো, ধ্বজভঙ্গ।

একটা রাত কুয়াশায় মুড়িয়ে নীলাঞ্জনা নীরবতার খুব কাছে এসে বসে, আগুন পোহায়। বড় শীত তার দুচোখে তবু অসময়ে শ্রাবণের মেঘ কেন ডেকে যাচ্ছে? পথ বদলে যায় অন্য কোন পথে, রাস্তায় আবার তাদের সঙ্গেই দেখা হয়ে যায়। নীলাঞ্জনার এই চেনা পাড়াগুলো সব সময়ের গায়ে রয়েছে দুঃখের মতো, রমরমা শরীরের ঝলকানির টাকা মনে হয় নিলামে উঠেনি। যে হাত গড়িয়ে যায় আঙ্গুলের ফাঁক থেকে দূরে তাকে অন্ধকার নয়, ভোর নামে ডাকবে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে নীলাঞ্জনা। একটি দুঃখিত মুখ ঢেকে রাখে নিজের মুখোশ। যেভাবে মুখোশ ঢাকে দুঃখগুলো, সঙ সাজের প্রসাধনে। লাল টুকটুকে লিপস্টিক বেয়ে গড়িয়ে যায় একচোখো ঈশ্বর।

এই নিস্তব্ধ নিষিদ্ধ পল্লীতে ক্রিমিনালাইজড হতে ভালোবাসে মধ্যবিত্ত গেরস্থ পুরুষ, কখনো নারী। মূলস্রোতে ভদ্রলোক সেজে থাকা মানুষগুলোর কঙ্কাল দেখতে পায় একমাত্র নিষিদ্ধ পল্লীর অতশীরা। সুমী, রুমী ও ময়নারা পুরুষ সাজ ছেড়ে নারী সেজে ভালো খদ্দের পায় মোটা টাকায় এবং এই খদ্দেরের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। তারা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

নীলাঞ্জনারা তাই ক্রমেই শুকিয়ে আসছে। শব্দ নেই গলায় ও ঠোঁটে। কখনো রাত্রি ভেঙে চাঁদ ওঠে না নিষিদ্ধ পল্লীর রাত ছেঁড়া গানে! নীলাঞ্জনা অপেক্ষা করে আবেগ মাখানো রাতের, অপেক্ষা করে ক্লোরোফিল মাখা রোদের সবুজ সতেজ হবে বলে।

কিন্তু না ঘুণে ধরা জঞ্জালময় সমাজে তাদের বেঁচে থাকা কীটের মতো ঘিনঘিনে।এই জনম তবে কেন পেল সে এক জীবনে!!