ডা. ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
অনেকদিন থেকেই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে লিখব লিখব ভাবছিলাম। বন্ধু Sadia Chowdhury কে কথাও দিয়েছিলাম। সাদিয়া, বেশ খানিকটা দেরী হলেও কথা কিন্তু রাখলাম। দুষ্টু হলেও মেয়ে ভালো, কথা রাখি, হা হা..। মূল ঘটনায় যাওয়ার আগে আসেন একটু ট্রেলার দেখি-
১. চাচার গলা ব্যাথা, ওই কানু একটা ঔষধ দে তো। নেন কাকা ফাস্ট কেলাস এন্টিবাটিক, খাইবেন, এক্কেরে ফকফকা, কোন ব্যাথা বেদনা থাকব না। দুইটা এজিথ্রমাইসিন খেয়ে চাচা দারুণ খুশি। খালি খালি ডাক্তারের ফি দিব ক্যান। ডাক্তার আবার কয় ফুল ডোজ ওষুধ খাইতে। খালি ধান্দা, বুঝিনা মনে করছে। ওষুধ কম্পানির দালাল একেকটা। চাচা গো আপনের জন্য এক বালতি আফসোস দিলাম আপাতত, কেনো দিলাম সেটা পরে কবানে।
২. বাংলাদেশের সরকার নাকি প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবাটিক বির্কি বন করতে চায়? কসাই ডাক্তাররা সরকাররে কিন্না নিসে মনে লয়। তয় জনগন বাইচা থাকতে কোনদিনও এই দুরভিসন্ধি সফল হইতে দিব না, দিব না। আমার খুশি আমি খাব, যখন খুশি তখন খাব। একটা খাব দুইটা খাব। এন্টিবাটিক আমাগো মৌলিক অধিকার। একবার এমন একটা পোস্টে কমেন্ট করতে গিয়ে এমন দাতানি খাইলাম, সাথে সাথে নাক কান ধরে পালিয়ে বাঁচলাম। ডাক্তার পরিচয় পাওয়ার পর বলছিল, শেয়াল, লেজ কাটার ধান্দা। আমরা বুঝি না মনে করছে। কোন মতেই সরকারকে এই মিশন সফল করতে দেয়া হবে না, এবং হয়নিও। কার ক্ষতি তা যদি একবার চিন্তা করতেন বিজ্ঞ বিপ্লবী ভাউ লোক। আফসোস, নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে!
৩. বছর দুয়েক আগে সিঙ্গাপুরে সারাবিশ্বের গাইনীকোলজিস্টদের নিয়ে এক সম্মেলন হয় রয়েল কলেজের তত্বাবধানে। আমাদের এফসিপিএসস করা এক বান্ধবী, তার গাইনীর প্রফেসর মা সহ সেখানে যোগদান করতে যান। হঠাৎ শুরু হলো বান্ধবীর পেট ব্যাথা সাথে চাকা চাকা রক্ত।
এবরশন! বান্ধবী জানত না সে প্রেগন্যান্ট! এমনিতে ইরেগুলার মাসিক ছিলো। যাহোক আজকে রাতেই তো দেশে ফিরে আসবে। আপাতত রক্ত বন্ধ করার জন্য আর ব্যাথা কমানোর জন্য দুটো ট্যাবলেট হলেই হয়। কিন্তু ঔষধ কিনতে গিয়ে খেলো এক ধাক্কা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোন ঔষধ নয়, এই হলো সিঙ্গাপুরের স্ট্রাটেজি।
এই আর এমন কি? ম্যাডাম খসখস করে ঔষধের নাম লিখে দিলেন। না, ফার্মেসি ম্যান সুন্দর করে বল্লেন, ম্যাম আপনি এদেশের রেজিস্টার ডক্টর না, আমি ঔষধ দিতে পারব না, প্লিজ আমাকে রিকোয়েস্ট করবেন না, হসপিটালে যান। অগত্যা নিকটস্থ এক হাসপাতালে যেতে হলো। সেখানে গিয়ে আরেক চমক। পাঁচশ ডলার কনসালটেন্সি ফি দিয়ে নাম লেখানো হলো। অনকল কনসাল্টেন্ট আসলেন দুইঘন্টা পর। ওরা মরিয়া হয়ে বল্ল, আমাকে শুধু এই এই ঔষধটা একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দেন প্লিজ। কনসালটেন্ট খুবই সহজ করে বল্লেন, আল্ট্রা রিপোর্ট ছাড়া কোন মতেই উনি কনফার্ম হতে পারছেন না। স্যরি। অতএব আল্ট্রাসাউন্ড ডক্টরের কাছে রেফার্ড, আরো দুই ঘন্টা খুশিমনে অপেক্ষা, শ পাঁচেক ডলারের মামলা মাত্র।
আল্ট্রা রিপোর্টে দেখা গেলো দেড় মাসের ক্ষয়ে যাওয়া প্রেগন্যাসি, যা আগেই ওরা সাসপেক্ট করছিলো। সবমিলে মোট বারো শ ডলার মাত্র খরচ করে হাতে পেলো দুটো বড়ি! একটা ট্রানেক্সামিক এসিড, আরেকটা মেফেনামিক এসিড! যা বাংলাদেশের হিসাবে পঁচিশ থেকে ত্রিশ টাকার মামলা অথচ সব কিছু মিলিয়ে খরচ করতে হলো ছিয়ানব্বই হাজার টাকা মাত্র! জ্বি ঠিক শুনেছেন জনাব। আর এমন কিছু ঔষধ ফোনে বা ইনবক্সে এমনি এমনিও খুশি মনে আমরা লিখি আরকি! অন্যকে খুশি করতেও মাঝেমধ্যে লিখি। ভাইরে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা ভালো হবে না কি রসুল পুরের চিকিৎসা ভালো হবে? সবই কপাল। মাওলা, ডাক্তার যখন বানাইলাই জন্ম কেনো রসুল পুরে দিলা? কেনো কেনো কেনো?
একটু আগে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের একটা রিপোর্ট দেখলাম। প্রথম কমেন্টে আছে আপনাদের জন্য। একটু দেখেন, দেখলেন তো! এখানে R লেখা যে ব্যাপারটা দেখছেন, তার অর্থ হলো উক্ত এন্টিবায়োটিক গুলো এই রোগীর ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্স, মানে কোন রোগে এগুলো তার শরীরে আর কাজ করবে না। ও মাই গড! তাহলে এই লোকের চিকিৎসা হবে কি দিয়ে? একেবারে গেছে দেখছি! এটা শুধুমাত্র একটা রিপোর্ট নয়। ভয়াবহ এক অবস্থার নাম।
আচ্ছা রেজিস্ট্যান্স বলতে আমরা কি বুঝি?
কোন রোগের জীবানু যখন তার জন্য বরাদ্দকৃত এন্টিবায়োটিক দ্বারা মারা না যায়, তখন তাকে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলে। রোগ হবে কিন্তু ঔষধে কাজ হবে না, কী ভয়ংকর অবস্থা! ফলে সামান্য সর্দিকাশিতে লোকজন উপ্তা হয়ে পড়ে থাকবে, মরে সাফ হবে! গাদা গাদা ঔষধ গিলবে কিন্তু কোন ফায়দা নেই। এক প্রজন্মের মুড়ি মুড়কির মতো যথেচ্ছ এন্টিবায়োটিক এবিউজের জন্য আরেক প্রজন্ম বেশুমার মারা পড়বে। আহা, মানুষ, তোমার এত বুদ্ধি অথচ নিজের ভালোটা বুঝলে না?
পৃথিবীর কোন দেশেই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষধ বিক্রি হয় না, এন্টিবায়োটিক তো নয়ই। আবার যদি হয়ও, এন্টিবায়োটিক অবশ্যই ফুল ডোজ ছাড়া বিক্রি হবে না। বিদেশে অবস্থান কারিরা আশাকরি ভালো বলতে পারবেন। তাই তারা মায়ের হাতের আচারের সাথে কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় ঔষধও যে ব্যাগ ভরে নিয়ে যান। এত কথা বলার একটিই কারণ এন্টিবায়োটিক ঠিকঠাক ডোজে না খেলে, কোর্স কমপ্লিট না করলে জীবানুগুলো সব মরে না। কিছু মরে, কিছু বেঁচে থাকে। আর এই বেঁচে থাকারা তাদের শত্রু এন্টিবায়োটিক, যা তাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিলো, তাদের চিনে রাখে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জ্যাকেট তৈরী করে, সেই জ্যাকেট নিজেরা পরে এবং তাদের আন্ডাবাচ্চাকেও পরিয়ে দেয়। এরপর যতই এন্টিবায়োটিক মিসাইল নিক্ষেপ করেন না কেনো, লাভ নাই রে ভাই লাভ নাই; এই জ্যাকেট মিসাইল ভেদ করতে পারবে না, ফলে তারা কিন্তু মরবে না, বরং বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকবে।
ফার্মেসি থেকে একটার পর একটা মুড়িমুড়কির মতো এন্টিবায়োটিক খাবেন, আর এর বিরুদ্ধে জ্যাকেট তৈরী হবে। এই জ্যাকেট পরুয়ারা আবার খুবই ভ্রমন বিলাসী। এর শরীর থেকে ওর শরীরে, ওর শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে। এতে দেখা যায় যে জীবনে একবারও এন্টিবায়োটিক খায়নি, তার শরীরেও জ্যাকেট বাহীনি বাসা বেঁধেছে। বেচারা তো কোন দোষ করেনি? তারপরও যথেচ্ছ এন্টিবাটিক খাওয়া এক সুখী দেশে জন্মানোর দায় মিটাবে সামান্য সর্দি কাশি র মতো রোগে লাখে লাখে মরে। এই দিন আর বেশি দূরে নাই। এখন আপনারাই ঠিক করেন, ডাক্তারের পরামর্শ মতো ফুল কোর্স এন্টিবায়োটিক খাবেন নাকি, গরীব টরীব রোগে এমনি এমনি মারা যাবেন। সিদ্ধান্ত আপনার, বোঝা গেলো ব্যাপারটা?









