দফায় দফায় বাড়তে বাড়তে ওষুধের দাম এখন দরিদ্র মানুষের নাগালের প্রায় বাইরে চলে গেছে। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে একবার বেড়েছে বিভিন্ন ওষুধের দাম।
এরপর সারা বছর একটি-দুটি করে দাম বাড়লেও বছরের শেষদিকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে মানুষের জীবনরক্ষাকারী এ পণ্যের দাম। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওষুধ কোনো বিলাসী ভোগ্যপণ্য নয়। এর ওপর মানুষের জীবন-মরণ নির্ভর করে থাকে।
এক্ষেত্রে ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা করা তাই অনেক বেশি জরুরি। যখন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো হয় তখন বুঝতে হবে এর পেছনে অসৎ কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে। ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলোর উচ্চাভিলাষী বিপণন নীতি এবং অধিক মুনাফা করার প্রবণতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোম্পানিগুলো মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের মাধ্যমে চিকিৎসকদের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, ওষুধের দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছে সেই টাকার সমন্বয় করে থাকে। অর্থাৎ ওষুধ কোম্পানিগুলোর অতিমুনাফা প্রবণতার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এটি অনৈতিক। সরকারকে অবিলম্বে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে দেশে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ১৯৯৪ সালের এক সরকারি আদেশ অনুযায়ী মাত্র ১১৭টি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সরকার। জানা যায়, এই ১১৭টি ওষুধের অর্ধেকই এখন আর ব্যবহার হয় না। ফলে কার্যত প্রায় গোটা ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে দেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো।
তারা কাঁচামালের দামবৃদ্ধির অজুহাতে ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দিচ্ছে ওষুধের দাম। দুর্ভাগ্যজনক যে, এ পরিস্থিতি রোধে নেয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। আমরা বলব, এ ব্যাপারে সরকারের নির্বিকার থাকার সুযোগ নেই। ওষুধের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উপায়ান্তর না দেখে অনেকে ঝুঁকছে ঝাড়ফুঁক আর টোটকা চিকিৎসার দিকে। এতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা মুখথুবড়ে পড়তে বাধ্য। চিকিৎসা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। সরকারের দায়িত্ব জনগণের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা নিরসনে উদ্যোগী হওয়া।
বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সুস্থতার জন্য জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। এজন্য যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে, সেক্ষেত্রে দ্বিধা করলে চলবে না।
বস্তুত ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের পুরো ক্ষমতা থাকা উচিত সরকারের। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণের অধ্যাদেশে যে কোনো ওষুধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতেই ছিল। এ বিধান আবার ফিরিয়ে আনা জরুরি।
দেশে ওষুধ শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। চাহিদার সিংহভাগ মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে দেশে উৎপাদিত ওষুধ। এ খাতের প্রসার ঘটলে সার্বিকভাবে লাভবান হবে দেশের অর্থনীতি।
সেজন্য ওষুধ শিল্পের বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে, এটাই আমরা চাই। তবে ওষুধের মান বজায় রাখার এবং অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা রেখেই যা কিছু করার তা করতে হবে। এ লক্ষ্যে ওষুধের বাজার নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।













