ভুল- ৪১ তম পর্ব লিখেছেন কবি ও সাহিত্যিক শাহিনা খাতুন।
বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ রেবাদের কলোনিতে বেশিরভাগ বিল্ডিং দোতালা। ভবনগুলির কমন বারান্দা। সারি সারি পনেরটি ভবন। একটা ভবন থেকে আর একটা ভবনের যে দূরত্ব তা একেবারে কম নয়। তারপর আছে খেলার মাঠ। মাঠটি বেশ বড়। আন্তঃ জুটমিলেরখেলা হলে এখানে ম্যাচ সম্পন্ন হয়। বছরে একবার খুব খুব আরম্বরে খেলা হয়। সে ফুটবল ম্যাচ ছেলে বুড়ো মমা চাচী সবাই মিলে উপভোগ করে। মা চাচীরা দোতালার বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে খেলা দেখে। যখন খেলা হয় কে কার আগে চেয়ার পাতবে তার প্রতিযোগিতা লেগে যায়। খেলা দেখতে বসে চলে সুখ দঃখের গল্প। মুড়ি চানাক্সুর মাখানো খাওয়া, আচার কখাওয়া ইত্যাদি চলতে থাকে। এক কথায় বলা যায় যেন সবাই মিলে সুখদুঃখের এএকটা বড় সংসার। তবে দুইটি ভবন মুখোমুখি করে বানানো। এজন্য পরিবারগুলোর মাঝে সামাজিক বন্ধন বেশি। প্রায় সকলে সকলের সুখ দুঃখের সাথি হয়ে বেঁচে আছে। এজন্য সুখ দুঃখ কেউ জানতে না পারলে অভিমানকারো অনুযোগটাও একটু বেশি। সমবয়সী এবং কাছাকাছি বয়সের ছেলেমেয়েরা একসাথে খেলাধুলা করে। আবার ঝগড়াঝাঁটি মারামারিও করে। তবে শাসন করার সময় সব অভিভাবক সবার ছেলেমেয়েদের শাসন করে থাকে। যেমন বিকেল বেলা ছেলেমেয়েরা খেলতে নামে। খেলতে খেলতে সন্ধ্যা হলে একজন অভিভাবক এসে সবাইকে মাঠ থেকে ডেকে নিয়ে যায়। প্রয়োজনে একজনের ছেলেমেয়েকে আর একজন শাসন করে। আর শাসন করাটাই স্বাভাবিক। বরং একজনের ভুল দেখে আর একজন পাশ কাটিয়ে গেলে সেটাকে অস্বাভাবিক মনে করা হয়। তাই আজাহার আর আয়েশার পরিবারের দুঃখ আর তাদের একার নেই। উঠতে বসতে আশরাফ সাহেব আর ফরিদাকে লোকজন গালমন্দ করে। আশরাফ সাহেব আর ফরিদার জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত এখন ঐ এলাকাবাসীর মুখে মুখে। কথায় কথায় উপমা টানতে ভুল করেনা। কেউ অহংকার করলে চোখে আঙুল দিয়ে সানুর বাবা মাকে দেখিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কেউ উপহাস করে তাদের নিয়ে টিপ্পনী কাটে। তবে যখন প্রথম রেবা আর সানুর প্রেম জানাজানি হয়েছিল তখন রেবার বাবা মাকে লোকজন কটাক্ষ করত। “মেয়ে মানুষ করতে পারেনি। বেলাল্লাপানা করে বেড়াচ্ছে সে বিষয়ে আজাহার আর আয়েশার কোন মাথাব্যথা নেই। ” এ ধরনের আলাপ আলোচনা চলতো। কিন্তু এতসব ঘটনা ঘটার পর আজাহার আর আয়েশার প্রতি সে মনোভাব আর নেই। বরং তাদেরকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের শাসন করতে একটু ভয় পায় মনে করে আবার কেউ যদি বিষ খেয়ে মরে যায়। অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। রেবা আজকাল সানুর মত ছোটদের নিয়ে মাঝেমাঝ বসে। মাঠে খেলতে থাকা বাচ্চাদের নিয়ে সন্ধ্যায় একটু গল্প করে। সে গল্প হচ্ছে এরকম
কে কি হতে চায়?
কার কি প্রয়োজন?
কেউ খুব মন খারাপ করে আছে কিনা?
কারও শারীরিক সমস্যা আছে কিনা?
ছোটখাট সমস্যায় কারও পড়ালেখার কোন ক্ষতি হচ্ছে কিনা?
এসব করতে করতে রেবা যেন কখন সকলের অলক্ষে এলাকায় মানুষের ভালবাসার আর আস্থার পাত্র হয়ে উঠেছে। সানুর মত মনে হয় তার নিজেকে। এখন আর তার মনে কোন আক্ষেপ নেই। সানুর উপর খুব অভিমান ছিল কেন সে একা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি? কেন তাকে মরার আগে একবার বলেনি। আসলে এরকম স্বভাবের মানুষের সাথে যে আচরণ কিরা হয়েছে তা সত্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। সব অভিমান মন থেকে মুছে ফেলে শুধু ভালবাসে। আসলে সানু সবার ভালবাসা বুকে নিয়ে ঐ মেঘদের মধ্যে লুকিয়ে গেছে। এখন সে ভালবাসা ফেরত দেবার পালা। মানুষককে ভালবেসে বেসে সে ঋণ শোধ করতে হবে। সত্যি রেবা ভেবেছিল তার ভালবাসা ফুরিয়ে গেছে। সানু সব নিয়ে গোয়ালখালী কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু না অনেকগুন হয়ে তাদের প্রেম ফিরে এসেছে। রেবার ভালই লাগে। মনে হয় কেউ যেন তার হ্রদয়ে প্রেমের আগুন জালিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। সানুর কবরের উপরে লাগানো পাতাবাহার আর জবা গাছদূটো বেশ বড় হয়ে গেছে। আজকাল পাতাবাহার গাছ দেখলে সেই গাছটির কথা মনে পড়ে। রাস্তাঘাটে সাইকেলের বেইলের শব্দে চমকে ওঠে। পৃথিবীটা বড় মায়ার। সানু আর কোনদিন ফিরবেনা। কিন্তু সানুর মায়া আর স্মৃতি কত প্রকট হতে পারে সে শুধু রেবা জানে। তরিও জানে কিন্তু ও না জানলেই ভাল হতো। সানু স্বপ্ন দেখতো তরি এক সময় বড় খেলোয়াড় হবে জাতীয় দলে খেলবে। কিন্তু সেই তরি হারিয়ে যেতে বসেছে। এত ভাবনা সে যেন আর নিতে পারেনা। অজানা আশংকায় আতংকিত হয়ে থাকে। প্রতিদিন ওর সাথে দেখা হলে ভাল হতো। কিন্তু সেটা সম্ভার না। রেবা তরিদের বাসায় যেতে পারেনা। আর একদিন ওভাবে দেখা হয়ে গেলে ভাল হতো। শিমুকে দিয়ে উর্মির সাথে কথা বলতে হবে।
এবার যেন একটু আগেই শীত এসে পড়েছে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঠিক করেছে এবার শীতে তারা একটা নাটক করবে। নাটক করতে গেলে টাকা পয়সা লাগবে, কি নাটক করবে? কে কি অভিনয় কিরবে? কোনদিন মঞ্চস্থ হবে এগুলো ঠিক করা দরকার। ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে খেলার মাঠে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসে রেবার পরামর্শ নিতে। ওরা বকে সানুদা থাকলে আমরা তাকে নিয়েই সব করতাম। এখন তোমাকে আমাদের সংগে থেকে কাজ করতে হবে। বিষয়টা রেবারও পছন্দ হলো। সে বললো চল আমরা আমাদের স্পোর্টস টিচার অরবিন্দ স্যারকে বলি, স্যার আমাদের বুদ্ধি দিবে আমরা সেমত কাজ করবো। পরেরদিন কয়েকজন মিলে রেবাকে সাথে করে অরবিন্দ স্যারের সাথে দেখা করে তাদের ইচ্ছার কথা ব্যাক্ত করে। অরবিন্দ স্যারতো মহাখুশি। ঠিক আছে আমরা কাল খালিশপুর ক্লাবে বিকেলে মিটিং করবো। মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেবো কিভাবে আমরা নাটক মঞ্চস্থ করবো।
তারিখঃ ০৮/১০/১৯













