খেলাধূলার এক বিরল প্রতিভা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ
লেখকঃ ইফতু আহমেদ, অরোরা, ইলিনয় ইউএসএ
সেই ব্রিটিশ-ভারত আমলে ময়মনসিংহের এক বিশিষ্ট সুসন্তান মরহুম ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ (১৯২৬-১৯৮৭) সর্বভারতীয় খেলোয়াড়, কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবলার ছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম আমেরিকার ইউজিন নগরীতে অবস্থিত ওরীগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরিক শিক্ষার উপর স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। নর্থ ক্যারোলিনার কনকর্ড শহরের মেয়র জ্যাক রবার্ট মরহুমের সম্মানার্থে কনকর্ড শহরের চাবি প্রদান করেছিলেন। দেশ-বিদেশে খেলাধূলার উপর নানান অভিজ্ঞতা ছাড়াও তিনি ছিলেন কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধীন কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের ইতিহাসে অনার্সসহ স্নাতক ও কলেজের “Sports Blue” এবং ভারতের বিশ্ব উন্নয়ন সংসদ সম্মানসূচক Doctor of Science (D.Sc.) ডিগ্রী প্রদান করে। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ (আইন) ডিগ্রিধারী। ১৯৬৭ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় গেমসে তদানীন্তন পাকিস্তানের চীফ ডি মিশন ও ১৯৭২ সালে তদানীন্তন পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিকে বঙ্গবন্ধু সরকারের বাংলাদেশের প্রথম ‘অবজারভার’ নির্বাচিত হয়রছিলরন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে তিনি ভরে তুলেছিলেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নব রূপায়ণে বাংলাদেশের খেলাধূলা যুগপৎভাবে বাংলা ও ইংরেজীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রশিক্ষণ পরিচালক ছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য।
হাউড় জঙ্গল মইষের শিং আর ব্রহ্মপুত্র বিধৌত রত্নগর্ভা ময়মনসিংহে জন্ম নিয়েছে ক্রীড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু বিস্ময়কর প্রতিভা এবং কালের চক্রে সেই সমস্ত স্বর্ণময় প্রতিভা অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
১৯৪৫ সালে কলিকাতার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ ও Indian Football Association (IFA) শীল্ডের চ্যাম্পিয়ন দল ইস্ট বেঙ্গল ফুটবল ক্লাব ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ মাঠে এক প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচে ময়মনসিংহের জেলা দলের সাথে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়। যিনি ময়মনসিংহের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি ময়মনসিংহের ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ। সেই থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ময়মনসিংহের ফুটবলের কিংবদন্তী।
১৯২৬ সালের ৭ই জানুয়ারী বাংলাদেশের ক্রীড়া জগৎ এর বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন।
পিতা আব্বাস আলী আহমেদ ছিলেন ময়মনসিংহের জাজ কোর্টের একজন এডভোকেট
এবং ময়মনসিংহ জেলার একজন খ্যাতনামা ক্রীড়া সংগঠক। তিনি ১৭ বছর ধরে
২
ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩৯ সালে ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল দল কলিকাতার Barborne Shield এ অংশগ্রহণ করেছিল এবং শ্রীলংকা একাদশকে পরাজিত করেছিল। আব্বস আলী আহমেদ ছিলেন ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল দলের প্রধান কর্মকর্তা। একই বছরে অর্থাৎ ১৯৩৯ সালে ময়মনসিংহের ফ্রেন্ডস ইলেভেন ক্লাব IFA শীল্ডের সমপর্যায় Indian Cup বিজয় করে এক দুর্লভ সম্মানের অধিকারী হয়।
১৯৪০ সালে ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্বাস আলী আহমেদ এবং কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক খাজা নুরুদ্দিনের সৌজন্যে ময়মনসিংহে সর্বোবৃহৎ ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব বনাম সম্মিলিত ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব এবং কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব বনাম কলিকাতা কালিঘাট এথলেটিক ক্লাব। কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব উক্ত দুই প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচে ১-০ গোলে বিজয়ী হয়েছিল। এ ছাড়াও আব্বাস আলী আহমেদ ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে ময়মনসিংহ ডেলিগেটদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এ ভাবে যোগ্য পিতার প্রভাবেই ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে।
শিক্ষা বিষয়ক ডিরেকটরেট
ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের জীবন-চরিতে জানা যায় যে, ১৯৫৩ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা বিষয়ক ডিরেকটরেট দেশের খ্যাতনামা ক্রীড়াবিদদের আমেরিকায় শারীরিক শিক্ষার উপর উচ্চ শিক্ষার জন্য একটি নির্বাচন বোর্ড গঠন করে। নিম্নলিখিত সদস্যদের নিয়ে এই বোর্ড গঠিত হয়ঃ
. ড: মমতাজ উদ্দিন আহমেদ
ডি.পি.আই., আহবায়ক
. ড: মোয়াজ্জেম হোসেন
উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড: এম. ও. গনি
প্রভোস্ট, এস. এম. হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
. জনাব শামসুল হক
এ. ও. পি. আই., পূর্ব পাকিস্তান সরকার
. লে: কর্ণেল মতিউর রহমান
৩
শারীরিক শিক্ষা পরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
. জনাব এ. রউফ, ভারপ্রাপ্ত শারীরিক শিক্ষা অফিসার, পূর্ব পাকিস্তান সরকার
মনোনয়ন
উল্লিখিত বোর্ড মনোনয়ন দান করেন মেধানুসারে জনাব ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম এবং জনাব কাজী আবদুল আলীম দ্বিতীয়। ফলস্বরূপ: জনাব ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের শারীরিক শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি ১৯৫৮ সালে আমেরিকার ইউজিন নগরীতে অবস্থিত ওরীগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরিক শিক্ষার উপর প্রথম স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
অন্যান্য শিক্ষাসমূহ
এটা পরীক্ষিত সত্য যে, খেলোয়াড়দের অনেকের কাছে পরীক্ষাতে ক্লাস নিয়ে পাশ করা একটি কষ্টসাধ্য ব্যাপারে তাও আবার বৃটিশ-ভারত আমলে। এর কারণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, খেলাধূলার অনুশীলন বা ট্রেনিং নিয়ে খেলোয়াড়দের ব্যতিব্যস্ততা থাকতে হয়। কিন্তু ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ছিলেন এর ব্যতিক্রম।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাসমূহ
১৯৪২ ও ১৯৪৪ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ও ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে যথক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগের ছাত্র হিসাবে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন।
বি. এ. অনার্স পরীক্ষা
১৯৪৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া অলেজ থেকে অনার্সসহ বি.এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাশ করেন।
ল ডিগ্রী
১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ময়মনসিংহ ল কলেজ থেকে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ আইনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
সম্মানসূচক ডক্টর অভ সাইয়েন্স ডিগ্রী
১৯৮৬ ভারতের বিশ্ব উন্নয়ন সংসদ ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদকে সম্মানসূচক ডক্টর অভ সাইয়েন্স সায়েন্স ডিগ্রী প্রদান করে।
৪
ক্রীড়াঙ্গন
ফুটবল
গৌরবময় ফুটবল কীর্তি ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট সূচনা করেছিল।
১৯৪১ সালে ময়মনসিংহের স্পোর্টস এসোশিয়েশনের ফুটবল লীগ চ্যাম্পিয়নশীপে ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব বিখ্যাত পন্ডিতপাড়া এথলেটিক ক্লাবকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে। এই খেলায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হল ২২ গজ দূর থেকে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের প্রচন্ড শক্তিশালী শট যা পরাভূত করেছিল পন্ডিতপাড়া গোলকিপারকে এবং ইতিহাস সূচনা করেছিল ময়মনসিংহের গৌরবময় ফুটবল।
উল্লেখ্য, পন্ডিতপাড়া এথলেটিক ক্লাব এক নাগাদ ১৮ বছর ধরে ১৯২২ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের স্পোর্টস এসোশিয়েশনের ফুটবল লীগের চ্যাম্পিয়ন ছিল। এমন কি কলিকাতার বিখ্যাত মোহন বাগান ফুটবল ক্লাব কতকবার পন্ডিতপাড়ার সাথে খেলছিল, কিন্তু কোনবারেই পন্ডিতপাড়াকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় নাই। এছাড়া পন্ডিতপাড়া কতকবার বিখ্যাত সূর্যকান্ত ফুটবল শীল্ড বিজয় করেছিল।
১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জন্ম হয়েছিল, পক্ষান্তরে পন্ডিতপাড়া এথলেটিক ক্লাবের জন্ম ১৯১০ সালে।
জন্মলগ্ন থেকেই ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব অধিকাংশ সময়ই ময়মনসিংহের ফুটবল লীগের চ্যাম্পিয়ন ছিল এবং কয়েকবার সূর্যকান্ত শীল্ড অর্জন করেছিল।
ময়মনসিংহের ফুটবল লীগের একটা পেনাল্টি কিক নিয়ে জনশ্রুতি আছে। ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ এমন প্রচন্ড জুড়ে বল শট করলেন যে পন্ডিতপাড়ার বিখ্যাত গোলকিপার দিপু (যিনি আবার কলিকাতার বিখ্যাত ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবে খেলেন) শক্তভাবে দুই হাত ধরে বলটি আঁকড়িয়ে ধরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁকে বলসহ গোল নেটের ভিতর উড়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এটা একটি অলৌকিক গোল ছিল এবং রাত ১২ টায় দিপুর জ্ঞান ফিরে ছিল।
কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
সর্ব ভারতীয় ফুটবলার হিসাবে ময়মনসিংহের যাঁরা কলিকাতার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ খেলেছিলেন তন্মধ্যে ইলিয়াউদ্দিন আহমেদ একজন অন্যতম।
১৯৪৬ সালে বিশ বছর বয়সে তিনি কলিকাতার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে খেলার সুযোগ পান।
৫
১৯৪৭ সালে তিনি কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে কুমিল্লাতে দুটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন।
পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ
১৯৫৪ সালে লাহোর অনুষ্ঠিত তদানীন্তন পাকিস্তানের জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ পূর্ব পাকিস্তান দলের পক্ষে সেন্টার হল হাফে খেলেন। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ। সুতরাং এটা বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবলের পর্যায় পড়ে।
প্রাদেশিক ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ
১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে বিজয়ী ময়মনসিংহ জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ। এই বিজয়ী দলের ময়মনসিংহের ফুটবলাররা ছিলেন আবদুল হামিদ, উপেন রায়, চান, মকবুল হোসেন, ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ, দুলু ঘোষ, নেপাল চক্রবর্তী, মাসুদ হাসান জামিল, তায়বুর রহমান ভানু, গিরিন মাষ্টার ও মল্লিক। উল্লেখ্য, ১৯৫১ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম আন্ত: জেলা ফুটবল শুরু হয়। ময়মনসিংহ জেলা একাদশ ফাইন্যালে প্রথম তিন সময়ে খেলে এবং বিজয় লাভ করে প্রথম ও তৃতীয় সময়ে।
ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ ও স্বাধীনতা ফুটবল
১৯৫১-৫৪ সালে ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ঢাকার ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডার্স ও জিমখানার পক্ষে অংশ নেন।
১৯৪৯ ও ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আন্ত: বিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে তিনি যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ল স্টুডেন্ট) ও ঢাকা বিভাগের অধিনায়কত্ব করেন।
আমেরিকান সকার
১৯৫৬ সালে আমেরিকায় অধ্যয়নকালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ওরীগন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকার (ফুটবল) ক্যাপ্টেন ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি পোর্টল্যান্ডের কসমস সকার ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে বিশ্ব ফুটবল প্রতিভা ব্রাজিলের পেলে নিউইয়র্ক কসমস সকার ক্লাবের পক্ষে খেলেছিলেন। এ থেকেই ধারণা করা যেতে পারে যে, ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ একজন উঁচু দরের ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন।
অন্যান্য ফুটবল
৬
ময়মনসিংহের ফুটবল লীগে ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, রোনাল্ড শো শীল্ড ফাইন্যাল এবং কুচবিহার মহারাজা কাপ ইত্যাদির প্রত্যেকটিতে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ অংশগ্রহণ করেছিলেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফুটবল যেমন: কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজ এবং ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ ও জেলা স্কুলের লীলা দেবী শীল্ডে তাঁর ফুটবল প্রতিভা ছিল ভরপুর।
টেনিস
১৯৫৬ সালে আমেরিকায় অধ্যয়নকালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ নেপালের এক নম্বর টেনিস তারকাকে হারিয়ে দেন।
১৯৫৫ সালে নর্থ করোলিনার ক্যারোলিনার কনকর্ড শহরে অনুষ্ঠিত এক প্রদর্শনী টেনিস খেলায় তিনি কাউন্টি চ্যাম্পিয়নের সাথে ড্র করেন।
১৯৫১-৫২ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান টেনিস প্রতিযোগিতায় দ্বৈতে অংশ নিয়েছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত টেনিসের দ্বৈতেও তিনি খেলেন।
আমেরিকার কনকর্ড শহরের চাবি
১৯৫৬ সালে নর্থ ক্যারোলিনার কনকর্ড শহরের মেয়র জ্যাক রবার্ট ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদর সম্মানার্থে কনকর্ড শহরের চাবি প্রদান করেন। কনকর্ডের টেনিস ও শহরের চাবি প্রদান সংক্রান্ত সংবাদ ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের ফটোসহ প্রকাশিত হয়েছে কনকর্ডের দৈনিকে।
ক্রিকেট
ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ক্রিকেট ক্রীড়াতেও পারদর্শী ছিলেন।
১৯৫৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা পরিচালক থাকাকালীন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অংশ নেন। সে খেলায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটিং পারফরমেন্স ছিল ৭৪ রান।
১৯৪৫-৪৬ সালে তিনি কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন ছিলেন এবং কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষেও ক্রিকেট খেলেছেন।
১৯৪১-৪২ সালে মহারাজা কুচবিহার ক্রিকেট টিমের বিরুদ্ধে তিনি ময়মনসিংহের ফ্রেন্ডস ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করেন।
৭
ফিল্ড হকি
১৯৫১-৫২ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ঢাকার প্রথম বিভাগ হকি লীগে ঢাকার ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে অংশ নেন।
১৯৪৫ সালে তিনি কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে হকি খেলেছিলেন।
১৯৪১-৪২ সালে তিনি ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষে হকি লীগে অংশ নেন। এছাড়া স্কুল জীবনে তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের হকি খেলোয়াড়।
এথলেটিকস (ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড)
১৯৭৭ সালে ময়মনসিংহ ষ্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পঞ্চম জাতীয় এথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ “অলিম্পিক মশালের বাহক” হিসাবে সম্মানিত করা হয়েছিল এবং টিভি-মেডিয়াতে প্রচার করা হয়েছিল।
১৯৫৬ সালে আমেরিকায় অধ্যয়নকালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ আমেরিকার প্রখ্যাত অলিম্পিক কোচ মি: বিল বোয়ারম্যান কর্তৃক এথলেটিকসে ট্রেনিং প্রাপ্ত হন।
১৯৪৫-৪৬ সালে তিনি কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের বার্ষিক এথলেটিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রানার-আপ হন।
১৯৪০ সালে ময়মনসিংহের আন্ত:স্কুল এথলেটিকস প্রতিযোগিতায় তিনি ১০০ মিটার দৌড়ে “দ্রুত মানব” ছিলেন।
ব্যাডমিন্টন ও ভলিবল
১৯৪৫-৪৬ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় একক ও দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হন এবং ভলিবলে কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের প্রতিনিধিত্ব করেন।
টেবিল টেনিস ও জল ক্রীড়াসমূহ
১৯৬৬-৬৭ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা পরিচালক থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে অনুষ্ঠিত টেবিল টেনিস ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হন। জল ক্রীড়ায় যেমন: সাঁতার, ডাইভিং ও ওয়াটার পলোতে তিনি পারদর্শী ছিলেন।
৮
ব্লু-সনদ
১৯৪৫-৪৬ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ কলিকাতার ইসলামিয়া কলেজের “শ্রেষ্ঠ চৌকস ক্রীড়াবিদ” হিসাবে গৌরবময় ব্লু- সনদ অর্জন করেন।
ক্রীড়া লেখক
বাংলাদেশ স্বাধীনতা উত্তর যাঁর ক্রীড়া বিষয়ক লেখাদি বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসমূহে ভরপুর হয়ে উঠতো তিনিই ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ।
“নব রূপায়ণে বাংলাদেশের খেলাধূলা” লেখনীর মাধ্যমে তিনিই জাতিকে প্রথম আহবান করেছিলেন প্রগতিশীল বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক খেলাধূলার আয়োজন ও প্রয়োজনের ব্যবস্থাদির অবলম্বন করার।
“দেড় মিনিটের ব্যবধান ঘুচাতে হবে” তাঁর এই লেখাটির উপর ভিত্তি করে ইত্তেফাকে উপ সম্পাদকীয় কলম প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এটা লিখেছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত এথলেট সেনাবাহিনীর মুস্তাক আহমদকে ঘিরে।
জাতীয় সংবাদপত্রাদির খেলাধূলা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যায় তাঁর লেখা শোভা বর্ধন করতো। এছাড়া ইংরেজী ভাষায় খেলাধূলা ও শারীরিক শিক্ষার উপর তাঁর প্রচুর লেখাদি প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকায় অধ্যয়নকালে তিনি লিখেছিলেন সেখানকার পত্র-পত্রিকায়।
ক্রীড়া সংগঠক
ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ তদানীন্তন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
১৯৫০-৫১ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্পোর্টস ফেডারেশনের সেক্রেটারী-জেনারেল ছিলেন।
পাকিস্তান আমলে তিনি এমেচার এথলেটিকস ফেডারেশন, আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস বোর্ড, ন্যাশনাল কোচিং কমিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহী বিভাগীয় স্পোর্টস এসোশিয়েশন এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদির সাথে কাজ করে গিয়েছেন।
তিনি তদানীন্তন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস (১৯৬০-১৯৬৮) এর নেতৃত্বে তত্কালীন পাকিস্তানের জাতীয় অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের বিশেষ উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন।
৯
বাংলাদেশ আমলে তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ড, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ এমেচার এথলেটিকস ফেডারেশন, বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোশিয়েশন, বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন, বাংলাদেশ আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ ফিজিক্যাল এডুকেশন এসোশিয়েশন, ময়মনসিংহ ফিজিক্যাল এডুকেশন এসোশিয়েশন (প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি), ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা, ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং ময়মনসিংহ ক্রীড়া লেখক সমিতি (প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) ইত্যাদির সাথে জড়িত ছিলেন।
স্পোর্টস কোচিং
১৯৫৮ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় ফুটবল ট্রেনিং ক্যাম্পের অবৈতনিক “চীফ কোচ” নিযুক্ত হন।
১৯৫৮ সালে তাঁর সফল কোচিং সুবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ৩-২ গোলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে প্রথম আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় শিরোপা অক্ষুন্ন রাখে।
১৯৫৮ সালে একই বছরে তাঁর সুদক্ষ ক্রিকেট কোচিং এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। স্কোর ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৬২ রান, পক্ষান্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৩৫ রান।
১৯৬০ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর ফুটবল ট্রেনিং ফ্লিমে প্রচার করে।
১৯৬১-৬২ সালে তিনি জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় রাজশাহী বিভাগ ফুটবল দলকে কোচিং দেন ।
ক্রীড়া ভাষ্যকার
১৯৫১-৫২ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে ক্রীড়া ভাষ্যকারের ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অভিজ্ঞতাসমূহ
১৯৭২ সালে তদানীন্তন পশ্চিম জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিকে বাংলাদেশ শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশের পর্যবেক্ষক মনোনীত করেন।
১০
১৯৬৭ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় গেমসে তদানীন্তন পাকিস্তান বিশ্ববিদ্যালয় দলের চিফ-ডি-মিশন ছিলেন তিনি।
১৯৫৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল দলের চীফ হিসাবে তিনি তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেছিলেন।
ক্রীড়া সেমিনার
১৯৭৬ সালে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত খেলাধূলার উপর জাতীয় ক্রীড়া সেমিনারে অংশ নেন।
১৯৭৬ সালে একই বছরে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পরিষদের ক্রীড়া সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন।
১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের T.S.C. তে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা সেমিনারে শারীরিক শিক্ষার ভবিষৎ সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠ করেন।
ক্রীড়া জীবনী
১৯৬৭ সালে তদানীন্তন Pakistan Observer পত্রিকায় ভেটরন কলামে চৌকস ক্রীড়াবিদ ও কলিকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড় হিসাবে ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের ক্রীড়া জীবনী প্রকাশিত হয়।
এছাড়া ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্হ ময়মনসিংহ ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে তাঁর খেলাধূলা সম্পর্কে অবদান লিপিবদ্ধ আছে।
জীবনাবসান
১৯৮৭ সালের ৩০শে অক্টোবর বাংলাদেশের এই ক্ষণজন্মা ক্রীড়া ব্যক্তিত্ত্ব ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহে তাঁর বাসভবনে ইন্তেকাল (ইন্নালিল্লাহে ……রাজেউন) করেন।
প্রতিক্রিয়া
ময়মনসিংহের ক্রীড়া লেখক মো: গোলাম হায়দার বাদল অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলাতে লিখেন: “তাঁর মৃত্যুতে ময়মনসিংহ যেমন হারালো জেলার এক বিশিষ্ট সুসন্তান, তেমনি বাংলাদেশ হারালো এক বিরল ক্রীড়া ব্যক্তিত্ত্ব ও চৌকস ক্রীড়াবিদ। এটা সহজেই পূরণ হওয়ার নয়।”
১১
ময়মনসিংহের সম্মান
ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পতাকাদ্বয় ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের সম্মনার্থে তিন দিন ধরে অর্ধনিম্ন রাখে। এর কিছুকাল পর ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা “ইলিয়াস স্মৃতি ব্যাডমিন্টন” ও “ইলিয়াস স্মৃতি ফিল্ড হকি” আয়োজন করেছিল।
তারিখঃ ২৩/০৮/২০











