ভুল-১৯ঃ শাহিনা খাতুন
বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ ফরিদা বেগমের চিন্তার জগত আলোড়িত হলো। সে ভাবতে শুরু করলো যে তার সংসার আর আগের মত নেই। সানু চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। কিন্ত তার সংসারের সব সুখ কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। ইদানীং তার ছেলেমেয়েদেরকে তার অপরিচিত মনে হয়। তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা তাকে দিনের পর দিন উপেক্ষা করে যাচ্ছে। আগে আমিন উর্মি তরি ওরা ছুটির দিনে বিভিন্ন খাবারের বায়না ধরতো। একটু বৃষ্টি হলে চিনিগুড়া চালের ভুনা খিচুড়ি আর গরুর মাংস অথবা ইলিশ মাছ ভাজা থাকতেই হবে। আর সানুর পছন্দ ছিল কালোজিরা ভর্তা। ইলিশ মাছ করলে আর গরুর মাংস ভুনা হতোনা তবে কাল জিরার ভর্তা করতেই হতো। অনেকদিন পর সেদিন বৃষ্টির দিন ছিল। ফরিদা গরুর মাংস, ইলিশ মাছ আর কালজিরা ভর্তা সব করেছিল। রান্নাকরা শেষ হলে টেবিলে খাবার সাজিয়ে যখন সবাইকে ডাকলেন আমিন বললো তখন ক্ষুধা নেই পরে খাবে। উর্মি টেবিলে এসে খাবারের ঢাকনাগুলো তুলে একবার দেখে রুমে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল। ফরিদা কয়েকমিনিট পর রুমের সামনে গিয়ে দেখল দরজা আটকানো। কয়েকবার ধাক্কা দিলেও উর্মি দরজা খুললোনা। তবে ভিতর থেকে ফরিদা কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। অনেকদিন পর তারও চিতকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে সত্যিই অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে। কী এমন হতো রেবাকে পূত্রবধু হিসাবে মেনে নিলে। ওরা সংসার করবে, ওদের ভাল থাকাটা জরুরি ছিল। আসলে এভাবে কেন আগে ভাবেনি। কেন ছেলেটাকে হারিয়ে আজ এ অবস্থা হলো। মনে মনে সব দোষ প্রথমে আশরাফ সাহেবকে দিল তারপর ভাগ্যকে দিল। তরির ঘরে গিয়ে দেখলো তরি ঘুমিয়ে আছে। খাবার খেতে ডাকার সাহস হোলনা। মনে হলো এই বুঝি তরি উঠে তাকে আবার কোন অপমানকর কথা বলে ফেলে। আজকাল তরি খুব জোরে উচ্চস্বরে কথা বলে। পাশের বাসার লোকজন সব শুনতে পায়। একদিন আস্তে কথা বলার অনুরোধ করায় তরি কথার ভলিউম আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল আমি চাই সবাই সব জানুক সব শুনুক। তোমাদের কথা না জানার কী আছে?
তাই কোন শব্দ না করেই ফরিদা তরির রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। মনে মনে হিসাব করে দেখে আসলে সে এখন তিন ছেলে মেয়েকে ভয় পায়। কেউ তার সাথে উচ্চস্বরে কথা বললে সানু তাকে মায়ের কাছে মাফ চাইতে বাধ্য করতো। দিনগুলো সব হারিয়ে গেছে। সানু সংসারের সব শান্তি কবরে নিয়ে চলে গেছে। মাঝে মাঝে আশরাফ সাহেবের সাথে তার কথা বলতে ইচ্ছে করেনা। মনে হয় তার পিতার ভুল হয়েছে জামাই সিলেকশন করতে। আগে তার মনে হত তার সমসাময়িক সকল বান্ধবীদের চেয়ে সে ভাল স্বামী পেয়েছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারে সে ধারনা ভুল। আশরাফ অহংকারী নির্বোধ টাইপের মানুষ। তাকে এত মূল্যায়ন এত ভালবাসার কিছু নাই। এ যাবত সে তার ভালবাসা অপাত্রে দান করেছে।
আগে আশরাফ সাহেব অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথে এক কাপ চা দিত। মাঝে মাঝে চা এর সাথে কিছু নাস্তা তৈরি করতো। সানুর মৃত্যুর পর এসব করা সে বাদ দিয়েছে। ভেবেছে এত গুরুত্ত্ব দেওয়ার মত মানুষ আশরাফ সাহেব কোনদিনও ছিলোনা। নিজের উপর কত যে রাগ হয় তা আর বলার নয়। মনে হয় এই যে রান্নাঘর সংসার সন্তান পালন এসব সবই ভুল। বাইরের সমাজ সংসার এসব সম্পর্কে আশরাফ সাহেবের ধারনাই যে সঠিক তা নয়। অথচ ঈমামের পিছনে নামাজ পড়ার মত নির্বিচারে সব কথা মেনে না নিলে তার ছেলেটা মারা যেতনা। বড় বিচিত্র এই সংসার! অনেক বছর পর আজ ফরিদার বাবা মায়ের উপর অভিমান হচ্ছে। কেন তারা স্বামীই সব বলে মন্ত্রণা দিয়েছিল বিয়ের দিন। আর নিজের উপর রাগ হচ্ছে এই ভেবে কেন সন্তানের মা হিসাবে নিজে কেন কোন ভূমিকা পালন করেননি। বহুবছর পর মনে হচ্ছে নারীশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি বিষয়।। সত্যই সে যদি তার চাচার মেয়েদের মত এস এস সি পাশ করে কলেজ পর্যন্ত পড়তো তাহলে সে আশরাফককে গুরু জ্ঞান করে তার সকল সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মেনে নিতোনা। আসলে চলে যাওয়া দিন ফেরত আসেনা। ক্যাসেটের ফিতার মত জীবনকে পিছনো যায়না। তাই আক্ষেপ করে বাকি জীবন কাটানো ছাড়া আর কিছু করার নেই একথা সে বুঝে নিল।
ভুল -২০ঃ শাহিনা খাতুন
তরি ঘরে খাওয়া কমিয়ে দিল। ইদানিং সারাদিন বাইরে থাকে। কোথায় যায় কী করে জিজ্ঞেস করলে কোন উত্তর দেয়না। দিন দিন স্বাস্থ্য খারাপ হতে লাগলো। বি আই ডি সি রোড পার হয়ে রেল লাইন দিয়ে হেটে হেটে নতুন রাস্তার মোড় পার হয়ে বি এল কলেজে যাওয়া যায়। কলোনির গেটে এসে রিক্সায় যাওয়া যায়। আবার মেইন রোডে গিয়ে টেম্পুতে উঠে দুই টাকা খরচ করে দৌলতপুর বাস স্ট্যান্ড এ নেমে অল্প একটু হেটে কলেজে ঢোকা যায়। পাটকলগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদী দুঃখ কষ্ট মান অভিমান ভালবাসা ঘৃণার সাক্ষী হয়ে থাকে। দিনের বেশিরভাগ সময় ভৈরবের তীরে বসে থাকে। ঘর পিতা মাতা ভাই বোন বন্ধু বান্ধব কলেজ মাঠ খেলাধুলা সব কিছুই তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। শুধু মনে হয় ভুল করে সে এ সংসারে জন্মগ্রহণ করেছে। ইচ্ছে করলেই জন্মপরিচয় পাল্টানো যায়না। মাঝে মাঝে নদীর বার্মাশীল ঘাটের পাশে একটা বট গাছের নীচে বসে থাকে। নদীর ঢেউ গুনে, নৌকা দেখে, জাহাজ দেখে, বট গাছের নীচে ঘুমিয়ে দিন চলে যায়। কয়েকজন ভিখারি প্রতিদিন আসে। তারা থালা হাতে এসে প্রতিদিন গাছতলায় বসে। গল্প করে। আগের দিন কার কত আয় হয়েছে? কি কি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে? সংসারের ভালমন্দ বিষয়, নিজেদের দুঃখ সুখ স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করে, পরামর্শ করে। তরি বুঝতে পারে ওদের মধ্যে শেয়ারিং আছে। তরির মনে খুব দুঃখ জমা হয়। ভিখারিদের শেয়ারিং আছে অথচ তার পরিবারে একটু সামান্য সহানুভূতি নেই। শেয়ারিংতো দুরের কথা। অথচ শিক্ষিত পরিবার বলে সমাজে দাবী আছে। সবচেয়ে বেশি পর মনে হয় মাকে। তার মনে হয় জন্মদাত্রী যদি সন্তানের কষ্ট আনন্দ বুঝতে না পারে তাহলে অন্য কেউ কী করে বুঝতে পারবে? মরতে ইচ্ছে করে প্রায়শই। কয়েকদিন বাজারে সহজলভ্য বিষ কিনে চেষ্টাও করেছে। আবার সিদ্ধান্ত বদলিয়েছে। নদীর তীরে বটগাছটাকে দিনে দিনে ভালবাসতে শুরু করেছে। আজকাল গাছের নীচ, ভিখারির দল, রাস্তা, নদীর তীরের বাজার, খেয়া পারাপারের নৌকা, নৌকার মাঝি, বারোয়ারী লোকজনদেরকে ভালবাসতে শুরু করেছে। তার ক্লাসে মৌরী নামে একটা মেয়ে আছে। সুন্দরী, সুহাসিনী, ধনী ঘরের মেয়ে। সে দু একবার তার পাশে এসে বসেছে, তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে পাত্তা দেইনি। পাত্তা দেইনি একথা ভেবে যে তার পরিবার ভালবাসো বিষয়টাকে সহজভাবে নেবেনা। রেবা আপুর মত সংসারী সহজ সরল ভাল মেয়েকে যে পরিবার বউ করে নিতে পারেনা, সে পরিবারে মৌরীর মত মেয়েকে নিয়ে সংসার করার কথা না ভাবাই ভাল। শুরুই যেন না হয় সেজন্য সে তাকে পাত্তা দেয়নি। আজকাল তার মৌরীর মুখটাও মনে পড়ে। মনে হয় মৌরী এসে যদি এই গাছতলায় তার কাছে বসতো, খানিক গল্প করতো, একটু যদি তার হাতটা ধরতো তবে তার কষ্ট হয়তো কিছুটা কমতো।
ভিখারিরা কোন একটা নেশা জাতীয় কিছু একসাথে খায় এটা সে অনুভব করেছে। ওরা যখন নেশা করে তখন বিশ্রী ভাষায় একজন আর একজনকে গালিগালাজ করে। মা বাপ তুলে কথা বলতেও দ্বিধা করেনা। এত খারাপ কথা মানুষ মুখে উচ্চারণ করতে পারে একথা সে এখানে না এলে বুঝতে পারতোনা। একদিন সে চোখ বুঝে আছে ভিখারিরা ভাবলো ঘুমিয়ে আছে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলল যে এই ছেলেটা কে? কতদিন ধরে দেখছি দিনরাত এখানে থাকছে। কোন খুন টুন করে মনে হয় পালিয়ে বাঁচতে এখানে থাকছে। আর একজন বললো না হতে পারে প্রেম করে ছ্যাকা খেয়েছে। আর একজন বললো নারে মনে হয় ওর কোন পরিবার নাই সব হারিয়ে গেছে, বানের জ্বলে বা নদীর ভাংগনে সব চলে গেছে। আর একজন বললো হতে পারে এক্সিডেন্ট এ সব মারা গেছে। আর একজন বললো এত কথা না ভেবে চল ওকে জিজ্ঞেস করি।
তারিখঃ ১৮/০৭/১৯











