ভুল-১ঃ কবি শাহিনা খাতুন
বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ আমি অনেক মানুষের মুখে শুনেছি যে তারা জীবনের কোন না কোন সময় ভুল করেছে। ভুল করেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আমার এক সময় মনে হতো আমিই বোধ হয় ভুল করি কারন আমি বোকা। আমি বিদূষী নই আমার জ্ঞান ভান্ডার এত ছোট যে আমি কুলিয়ে উঠতে পারিনা। যখন বালিকা ছিলাম অথবা ছাত্রী ছিলাম তখন ভাবতাম প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করে জ্ঞানী গুনী ব্যক্তিদের অনেক বই পড়ে ফেলবো। একটা ডায়েরিতে অনেক বইয়ের নাম লিখে রাখলাম। বইগুলো খুঁজতাম বিভিন্ন জায়গায়। বইমেলায় অথবা অন্য অনেক বইয়ের দোকানে। বেশিরভাগ বই খুঁজে পাইনি। সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে পড়ালেখা মানুষকে কতটা সঠিক পথে নিয়ে যায় এটাই প্রশ্ন। আমি অনেক লেখাপড়া জানা, ডক্টরেট করা, অনেক বেশি বই পড়া লোকজনকে মূল্যহীন জীবন যাপন করতে দেখেছি। মুলত বেশিরভাগ শিক্ষিত লোকেরা ব্যর্থ জীবন যাপন করে। কেউ কেউ মৃত্যুর আগে বুঝতে পারেন যে তিনি ভুল করেছেন। আবার কেউ কেউ সেটাও না বুঝে মৃত্যুবরণ করেন। তাহলে এত এত সাবজেক্ট এত এত বই পড়া, পরীক্ষা দেওয়া, সার্টিফিকেট অর্জন এগুলোর কি আদৌ কোন মূল্য আছে? আমি দুই ভাই বোনের কথোপকথন কথন তুলে ধরছি। বোন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আট সন্তানের জননী হয়েছে। স্বামী ক্যান্সারজনিত কারনে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে। টানাটানির নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবন। আর ভাই সারা বিশ্বের মধ্যে একজন নামকরা ডাক্তার। একটা বিষয়ে সুপার স্পেশালিষ্ট। ইউরোপ থাকেন। অনেক টাকা আয় করেন। কয়েক বছর পর পর দেশে ফিরে ভাইবোনদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে যান। ভাই ছোট বোন বড়। বোনের স্বামীর মৃত্যুর পর বোন তার ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাইয়ের ঢাকার বাসায় থাকতে শুরু করেছিল। কিন্ত কয়েকবছর পর ভাইয়ের পরিবারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বোনের পরিবারকে বাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। তখনো বোনটির কোন ছেলে মেয়ের জীবনে স্বচ্ছলতা ফিরে আসেনি। অর্থাৎ ঢাকায় একটি বড় পরিবারের জন্য যে ঘর দরকার সে ঘরের ভাড়া দিয়ে থাকার সমর্থ হয়নি। বোনটি ভেবেছিল তার ভাইয়ের অনেক আছে ঐটুকু সাহায্য করলে ভাইয়ের কোন কিছু কমবেনা। অথবা যদি প্রয়োজন হয়ে যায় তাহলে ভাইকে দুঃখের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরলে সে নিশ্চয়ই অসহায় দরিদ্র বোনকে পথে বের করে দেবেনা।
বোন- তোর দুলাভাই এর মৃত্যুর পর তোর বাসায় উঠে আসাটা আমার মস্তবড় ভুল ছিলো।
ভাই- সেকথা কেন বলছো? আমি কি তোমাদের বিপদের দিনে সাহায্য করিনি?
বোন- তুই সাহায্য করেছিস বলে আমার ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করে যাচ্ছে। তা নাহলে হয়তো সবার জীবন নষ্ট হয়ে যেত।
ভাই- তাহলে তুমি কী বলতে চাচ্ছ?
বোন- আমি বলতে চাচ্ছি আজ যদি আমি তোর সাহায্য না নিতাম নিশ্চয়ই আমার ছেলেমেয়েরা কোনভাবে ভাড়াবাসায় থাকার টাকা উপার্জন করতো। তোর বাসায় থেকে ওরা ভেবেছে মামা অনেক ধনী মানুষ এই তিনরুমের ভাড়া না হলেও মামার চলবে। একথা ভেবে ওরা টাকা আয়ের চেষ্টা করেনি। কিন্ত আজ মনে হচ্ছে এসব ভাবনা ভুল ছিলো।
ভাই- তুমিতো বুবু একটা ভুল করেছো আর আমার জীবনেরতো সবকিছু ভুল।
সেদিনের সেকথার অর্থ এখন বুঝতে পারি। সত্যিই সুপার স্পেশালিষ্ট ডাক্তার অনেক সুনাম, অনেক টাকা, এসবের কোন মূল্য নেই। তার জীবনের পুরোটাই ভুল।
পাঠক কিভাবে বুঝবেন যে ভাইটির জীবনের পুরোটাই ভুল। বছর তিনেক আগে তার স্ট্রোক হয়েছে। হাটাচলা করতে পারেনা। ভাল করে কথাও বলতে পারেনা। শুনেছি লন্ডন এ তার নিজের বাসার টয়লেটে একদিন চার ঘন্টা পড়েছিল। তার স্ত্রী বাসায় ছিলোনা। সে ফিরে এসে তুলেছে। অনেক টাকা বাড়ি গাড়ী তাকে শান্তি দিতে পারছেনা। বিনা সেবায় ধুঁকছে।
ভুল-২ঃ কবি শাহিনা খাতুন
আমি সে বোনকে তাঁর ভাইয়ের জন্য কাঁদতে দেখেছি। ছেলে মেয়েকে বারবার অনুরোধ করে তাদের মামার খোঁজ নিতে। ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়ে বলে মামাতো কথা বলতে পারেনা ফোন করে কী লাভ? প্রতি উত্তরে তিনি বলেন তোর মামিকে বা লন্ডনে থাকা অন্যদের ফোন করে একটু জেনে নে, রাগ করিসনা, ওর বুদ্ধি কম, ও ছোট, আমাদের মা ছোট বেলায় মারা গিয়েছিল, কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি তাই ওর জন্য খুব মন খারাপ হয়। ও অনেক লেখাপড়া শিখেছে কিন্ত মানুষ হয়নি। তোদের মামিকে এত করে বললাম ওকে বাংলাদেশে রেখে যাও আমরা দেখাশুনা করি বিনিময়ে তোমার কাছে কিছু চাইনা কিন্ত সেটা সে করবেনা কারন ইংল্যান্ড সরকারের কাছ থেকে তার চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা পায়। সেগুলো ওদের খুব দরকার। সেই বোনের কাছে মানুষ হওয়ার ব্যাখ্যা অন্য রকম। আসলে বেঁচে থাকার জন্য কত টাকা দরকার? মানুষ তার প্রয়োজনের সীমানা জানেনা। আমি কোরআন শরিফ এ পড়েছি আল্লাহ পাক বলেছেন আমি বান্দাকে একটি পাহাড় পরিমাণ সম্পদ দিলে সে আর একটি পাহাড় পরিমাণ সম্পদের জন্য লালায়িত হয়। আমরা বেশির ভাগ মানুষ লালসার বশবর্তী হয়ে ভুল জীবনই যাপন করি। লোভ সংবরণ করার মত জ্ঞান যে শিক্ষা ব্যবস্থা করতে পারেনা সে শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ আছে। কিছু জিনিস মানুষ বই পড়ে শেখে আর কিছু পরিবেশ থেকে দেখে শেখে। আমাদের চারপাশে আমরা চুরি, বাটপারি, ধোঁকাবাজি করে,অন্যকে ঠকিয়ে টাকার মালিক হওয়া লোকজন দেখি, যারা ভালো খায় ভালো পরে বিলাসী জীবন যাপন করে। তারা মুলত বস্তুপুজা করে। কিছুদিন পর পর মোবাইল ফোনের, গাড়ীর মডেল পাল্টায়। প্রতিবেশী না খেয়ে আছে কিনা সে খবর রাখেনা।
যে লোকটি জীবনের বেশির ভাগ সময় পড়াশুনা আর অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যয় করলো তার অসুস্থতার সময় অথবা হতে পারে তার জীবনের শেষ সময়ে তার পাশে কেউ নেই। এটা খুব দুঃখজনক। আমি মনে করি তার চেয়ে সে যদি কিছুটা সময় ভালবাসার চর্চা করে কাটাতো, কিছুটা সময় আত্মীয় বন্ধু বান্ধবকে দিত, টাকা উপার্জনের সময়কে কমিয়ে একটু আনন্দে সময় কাটাতো তাহলে এত অল্প বয়সে এত অসুস্থ হতোনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে মানুষ যত আনন্দে থাকে তত সে সুস্থ থাকে। আমি গ্রামের খেটে খাওয়া অনেক লোক দেখেছি যারা খুব দরিদ্র, সারাদিন পরিশ্রম করে শুধু পরিবারের দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থার জন্য। আমি তাদের প্রাণখুলে হাসতে দেখেছি। অন্যের দুঃখে কাঁদতে দেখেছি। বিনা পয়সায় প্রতিবেশী আত্মীয় পরিজন বন্ধু বান্ধবের জন্য কাজ করে সহায়তা করতে দেখেছি।
কে সফল?
কে আনন্দিত?
কে সঠিক?
ছোট একটা জীবন। একটা বটগাছ অথবা একটা কচ্ছপ যতদিন বাঁচে ততদিনও আমরা বাঁচিনা। কাড়িকাড়ি টাকা, অনেক বড় বাড়ি, ঘর ভরতি দামি আসবাবপত্র, বিভিন্ন দেশের দামি ব্যবহার্য্য এইতো স্বপ্ন। কোটি মানুষের এইরূপ স্বপ্নের সমাজ আমাদের। আমি বেশির ভাগ মানুষের আহাজারি দেখেছি কী পাইনি সেকথা ভেবে। এই যে স্থুল চিন্তার সমাজ ব্যবস্থা এ থেকে আমাদের বের হওয়া দরকার। এসব বিষয়ে সামাজিক গবেষণা দরকার। আর এ থেকে পরিত্রাণলাভ এর জন্য সরকারের কাজ শুরু করা দরকার। জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কাকে বলে?
আমরা ভবিষ্যতের বাংদেশেকে কেমন দেখতে চাই?
আমাদের প্রিয় সন্তানের জন্য কেমন সমাজ চাই?
আমি আমার দেখা ভুল জীবনের কিছু গল্প শুনাবো।
ভুল-৩ঃ কবি শাহিনা খাতুন
সাইফুলরা চার ভাইবোন। তারা এক বোন তিন ভাই। সাইফুল সবার বড়। তরিকুল মেঝ। আমিনুল ছোট। তবে সবচেয়ে ছোট বোন উর্মি। তাদের বাবা খুলনা জেলার খালিশপুর শহরের ক্রিসেন্ট জুট মিলের জুনিয়র অফিসার। সাইফুলের ডাক নাম সানু। সানুর পরিচিত মহলে খুব নাম ডাক। কারন সে খুব ভদ্র। সিনিয়র লোকজন তাকে খুব ভালবাসে। তার কারন মহল্লার মুরব্বিদের ফুট ফরমাশ খাটায় তার কোন জুরি নেই। কেউ বাজারের থলে নিয়ে হেটে যাচ্ছে দেখলে সানু অবশ্যই সে বোঝা তার বাসায় পৌঁছে দেবে। টিউশনি করে যে হাতখরচ নিজের জন্য জমা করে তা থেকে কিছু টাকা বরাদ্দ থাকে মহল্লার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চকলেট আইসক্রিম খাওয়ানোর জন্য। তাই পাড়ার সকলে তাকে ভালবাসে। তার শুধু একটাই দোষ সে রেবাকে ভালবাসে। দোষ বলছি এজন্য যে এটা এখন থেকে আরও বছর চল্লিশ আগের কথা। তখন এভাবে ছেলে মেয়েরা প্রকাশ্যে প্রেম করতোনা। প্রেম ছিল চিঠি পত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বহুদিন পর হয়তো প্রেমিক প্রেমিকা একবার দেখা করতো কোন বন্ধু বান্ধবীর বাসায়। টি এন্ড টি ফোন যাদের বাসায় ছিল তাও থাকতো বড়দের অধীন। বাবা মার চোখ ফাকি দিয়ে কথা বলাও ছিল কঠিন। এমনই সময়ে সানু ভালবাসতো ঐ একই জুট মিলের শ্রমিক আজাহার উদ্দিনের মেয়ে রেবাকে। একেতো ভালবাসা দোষের আবার শ্রমিকের মেয়ে। রেবা দেখতেও আহামরি সুন্দরী ছিলনা। অনেকের মনেই এ প্রশ্ন ছিল সানুর মত ছেলের রেবাকে ভালবাসার কী আছে? অনেকে কানাঘুষা করতো সানু কী পেয়েছে রেবার মধ্যে সেটা আল্লাহই জানে। আবার সমালোচকরা একথাও বলতো আজাহার আর তার বউ হয়তো কোন যাদুটোনা করেছে।
আজাহার সাহেবের এক ছেলে দুই মেয়ে। রেবা, শিমু আর শশী। রেবা সবার বড়। সে একটু মোটা খাট, গায়ের রং ফর্সা। পড়ালেখায় ভাল। বরাবর এক থেকে তিনের মধ্যে তার রোল নম্বর। সে তখনকার মেয়েদের তুলনায় কিছুটা আধুনিক।
সে লেখালিখি করে, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। যে কোন মেয়ের বিপদে আপদে এগিয়ে আসে। এসব অবশ্য তার বাবা মা অথবা পাড়া প্রতিবেশীর কাছে কোন গুন হিসেবে বিবেচিত নয় বরং বেশি স্মার্ট বলে বিবেচিত। রেবার বোন শিমু সুন্দরী লম্বা মুখের গড়ণও সুন্দর বলে লোকে বলাবলি করে। শশী সবার ছোট। আজাহার সাহেবকে এলাকার লোকজন ভালই জানে তবে মেয়েকে শাসন করেনি বলে সমালোচনা আছে। রুপসা নদীর তীর ঘেঁষে অনেক গুলো জুট মিল। পিপলস, ক্রিসেন্ট, সোনালী, প্লাটিনাম। আরও রয়েছে পাশেই হার্ডবোর্ড মিল এবং খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিল যা এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম পেপার মিল বলে পরিচিত ছিল। নদীরর তীরে কারখানা আর কারখানার পরই অফিসার্স কোয়াটার। অফিসার্স কোয়াটার এর পর বি আই ডি সি রোড। বি আই ডি সি রোড এর পর শ্রমিকদের কোয়াটার। অবশ্য সবগুলো কোয়ার্টার শ্রমিকদের নয়। কয়েকটি অফিসার্স কোয়ার্টারও আছে। কলোনির মধ্যে আছে স্কুল। সে স্কুলে অফিসার শ্রমিক সকলের বাচ্চারা লেখাপড়া করে। সেখানে শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কোন বৈশম্য নেই। মিলগুলোর স্কুলের মধ্যে পড়ালেখার একটা সুস্থ সুন্দর প্রতিযোগিতা আছে। অফিসারদের ছেলেমেয়ের সাথে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের প্রেম বন্ধুত্ব এগুলো সেখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।
কৈশোরকালের অনেক প্রেমের ঘটনা আছে। কিন্তু সানু আর রেবার প্রেম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারন বেশিরভাগ প্রেম নিভৃতে শুরু হয়ে সময়ের সাথে সাথে চোখের আড়াল হলে শেষ হয়ে গেছে। দু একটি যে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি তা নয়। তবে তাদের নিরবে পড়ালেখা শেষ করে কাজবাজ করে পিতা মাতার কাছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
ভুল-৪ঃ কবি শাহিনা খাতুন
সানু আর রেবার সম্পর্ক যখন শুরু হয় তখন সানু ক্লাস টেইনে এবং রেবা ক্লাস এইটে পড়ে। সানু এস এস সি শেষ করে বি এল কলেজে ভর্তি হয়। সাইকেলে করে সানু কলেজে যেত। সানু নিজেদের কোয়ার্টারের গেইট পার হয়ে বি আই ডি সি রোড অতিক্রম করতো, তারপর রেবাদের গেইট দিয়ে ঢুকে যাওয়া আসার সময় রেবাদের বাসার সামনে দিয়ে যেত। রেবাদের কোয়ার্টারের সামনেকার জায়গাটা অতিক্রম করার সময় সাইকেলে বেল বাজাতো। বেলের শব্দ পেয়ে রেবা দৌড়ে দরজার কাছে এসে দাড়াতো। সানু সাইকেল থেমে নেমে কিছুটা পথ হেটে যেত। এসময় একটু চোখাচোখি হত। সাইকেলটা যতক্ষণ দেখা যেত রেবা তাকিয়ে থাকতো। এটা ছিল ওদের প্রেমের রুটিন কাজ। রেবাদের বাসার ঠিক দুটো বাসার পরে ছিল জাহাংগিরদের বাসা। জাহাংগির আর রেবা এক ক্লাসে পড়তো। জাহাংগিরের বোন মাহমুদা সেও রেবার বোন শিমুর সাথে এক ক্লাসে পড়তো। জাহাংগির ওদের চিঠি আদান প্রদানের কাজ করতো। জাহাংগিরকে ওদের পোস্টম্যান বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। চিঠি দিত বইয়ের মলাটের মধ্যে করে যাতে কেউ বুঝতে না পারে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে ওদের সম্পর্কের কথা এলাকাবাসী জেনে গেল। এ নিয়ে রীতিমত কানাঘুষা চলতে লাগলো। আস্তে আস্তে কথাটা সানুর বাবা আশরাফ সাহেবের কানে গেল। আশরাফ সাহেব এটা কোনোভাবে মেনে নিতে পারলোনা। সে প্রথমে সানুকে বকাবকি করলো। সানু তার বাবাকে বললো আমি রেবাকেই বিয়ে করবো এবং তোমার মত নিয়েই করবো। আর যদি সেটা না হয় তাহলে কখনো বিয়েই করবোনা। সানুর দৃঢ়তা দেখে আশরাফ সাহেব ছেলেকে কিছু না বলে রেবার বাবাকে ডাকালেন এবং অনেক বকা ঝকা করলেন। এক পর্যায়ে বললেন
” আপনার মেয়েকে সামলে রাখবেন
স্ট্যাটাস মনে রাখবেন
আমি এলাকাবাসী নিয়ে বিচার বসাব”
আজাহার সাহেব ভিষণ অপমানিত বোধ করলেন এবং রেবার মাকে বললেন যদি রেবাকে সামলাতে না পার তবে বিষ খাইয়ে মেরে ফেল। আর যদি তাও না পার আমি বিষ খাব। শ্রমিকের কি মান সম্মান নেই?
সানুর চেয়েও ভাল ছেলের কাছে রেবার বিয়ে দেব। আজাহার সাহেব অল্পদিনের মধ্যে আরমান নামে এক ছেলেকে খুঁজে বের করলেন। রেবাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আরমান রেবার ফুফাতো ভাই। দেখতে সুন্দর। ফিজিক্স এ অনার্স মাস্টার্স করে একটা কলেজে লেকচারার হিসাবে চাকরী শুরু করেছে। সে রেবাকে পছন্দ করতো কিন্তু বলতে পারেনি। বিয়ের প্রস্তাব আরমান আনন্দ চিত্তে মেনে নিল। এ খবর এলাকাবাসী যেনে গেল। রেবাকে গৃহবন্দী করা হল। জাহাংগিরের বাবাকে ডেকে বলা হল সে যেন রেবাদের ঘরে না আসে। উল্টা পাল্টা কোন ঘটনা ঘটলে সে দায় জাহাংগিরের উপর বর্তাবে। জাহাংগিরের বাবা জাহাংগিরকে আচ্ছা করে শাঁসালো যেন কোনভাবে রেবাদের পরিবারের সাথে কোন সম্পর্ক না রাখে।
রেবাকে রেবার ভাইবোন দুজন পাহারা দিত। রেবা কোনভাবে সানুর সাথে দেখা করতে পারলোনা। রেবার বাবা সানুর বাবার সাথে দেখা করে বললো
“আপনার ছেলে যেন আমাদের বাসার সামনে দিয়ে কলেজে না যায় সে খেয়াল রাখবেন ”
সানুর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল। সে আর আগের পথে কলেজে যায়না। রেবা বেলের শব্দের অপেক্ষায় থাকে। কান্নাকাটি করে। রেবাদের বসার সামনে দিয়ে সানুর বেল বাজিয়ে যাওয়া আসাটা সে সময় রেবার সমবয়সী অনেকেরই জানা ছিল। রেবার মা যাদেরকে সন্দেহ করলো তাদের সবার রেবাদের বাসায় যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। রেবা আর সানু যেন আর কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পারে তার সব ব্যবস্থা পাকা করা হল। ওদের ভালবাসার বিষয়টি এমন হলো যেন এত বড় অপরাধ কেউ কখনো করেনি। সানু মাহমুদার হাতেপায়ে ধরে রেবার কাছে একটা চিঠি পাঠালো। মাহমুদা অত সতর্ক থাকতে পারলোনা রেবার মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেল। এটা নিয়ে জাহাংগিরদের আর রেবাদের পরিবারের মধ্যে মনোমালিন্য হলো। মাহমুদাকে তার মা দুই গালে দুটো চর বসালো।
ভুল-৫ঃ কবি শাহিনা খাতুন
রেবা অনেক চেষ্টা করেও কোনভাবে সানুর সাথে যোগাযোগ করতে পারলোনা আর সানুও আর কোন মাধ্যম খুঁজে না পেয়ে নিরাশ হতাশ হয়ে রেবার জন্য নিরবে কষ্ট পেতে লাগলো। এভাবে পনেরো দিন কেটে গেল। পনেরো দিন পাহারায় রেখে রেবাকে ঝালকাঠি তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আরমানের সাথে বিয়ে দেওয়া হলো। রেবার পরিবার কিছুদিন পর রেবাকে ছাড়া খালিশপুর এ ফিরে এলো। সকলে ভাবলো রেবা সানুর প্রেমের গল্প এখানেই শেষ। আপাতদৃষ্টিতে সানুর পরিবার এবং রেবার পরিবার চিন্তামূক্ত হলো। আজাহার সাহেব বুক ফুলিয়ে হাটতে শুরু করল ভাবলো তাকে আর শ্রমিক বলে ছোট করে দেখার ককিছু নেই আর সানুর বাবা মা জিতে যাবার আনন্দে আত্মতৃপ্ত অনুভব করলো। সানুকে আর বেল বাজিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে কেউ দেখেনি।
সপ্তাহ খানেক পর আরমান আর রেবা খালিশপুর কোয়ার্টারে ফিরে এল। পাড়াপড়শি সবাই অপেক্ষায় আছে রেবা কীভাবে আনন্দে বা দুঃখে থাকে তা দেখার জন্য। রেবাকে দেখা গেল ঠিক তেমনি আছে যেমন বিয়ের আগে ছিল। কোন নতুন কাপড় বা গহনা তার গায়ে ছিলনা। বরং মনে হয়েছিল যেন এক সপ্তাহে সে এক যুগ পার করেছে। চোখের কোনে কালি জমেছে। চোখদুটো খানিক গর্তে ঢুকে গেছে। মনে হয় সাত বছর যুদ্ধ করে বাড়ী ফিরেছে। একেবারেই চুপচাপ। কারো সাথে সাধারণ কথাও বলছেনা। আরমান রেবাকে যেদিন পৌঁছে দিল সেদিনই তার কর্মস্থলের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিয়ে চলে গেল। অনেক চেষ্টা করেও কেউ তাকে একদিনের জন্য রাখতে পারলোনা। কেউ কিছু জানতে পারলোনা। সবাই অনুভব করলো কী যেন একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে যা তখনো পাড়াপড়শি কেউ জানতে পারেনি। আজাহার সাহেবের ঘরটাকে মৃত্যুপুরীর মত মনে হতে লাগলো। রেবার বোন শিমু ভাই শশী দুজন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল। এ অবস্থায় কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন ক্রিসেন্ট উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার আজাহার সাহেবের বাসায় এল কেন বাচ্চারা পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছে তা জানার জন্য। হেড মাস্টার রবিউল হক ছিলেন একজন সর্বগ্রাহ্য ব্যক্তি। ধনী দরিদ্র, শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তা সবাই তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো কারন ঐ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনেক। আজাহার সাহেব হেডমাস্টার সাহেবের কাছে কোন কথা লুকিয়ে রাখতে পারলেননা। ঘটনাটা ছিল এরকম রেবা প্রথমদিন আরমানকে সানুর সাথে তার প্রেমের বিষয়টি খুলে বলেছে এবং সে দাবী করেছে যে বিয়ের সম্পর্কের আগেই তারা মামাতো ফুফাতো ভাইবোন। এ সম্পর্কের বাইরে কোন সম্পর্ক করতে চাইলে সে আত্মহত্যা করবে। সে একথা বিয়ের আগে জানাতে চেয়েছিল কিন্তু কোন সুযোগ দেওয়া হয়নি। আরমান তাকে প্রেসার না দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু রেবা তার অবস্থানে অনড় থাকাতে আরমান আর জোর জবরদস্তি না করে ফেরত নিয়ে এসেছে। আরমান যাওয়ার সময় ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর দিয়ে তা আজাহার সাহেবের হাতে দিয়ে গেছে আর বারবার অনুরোধ করেছে যেন রেবাকে এ ব্যাপারে কোন চাপ না দেওয়া হয়। রেবাকে যেন আবার পড়ালেখা শুরু করানো হয় এ ব্যাপারেও সে আজাহার সাহেব এবং তার স্ত্রীকে অনুরোধ করে গেছে। সব শুনে হেডমাস্টার সাহেব আজাহার সাহেবকে ভৎসনা করলেন। তিনি বললেন সবকিছু নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করা ঠিক হয়নি। যা হবার হয়ে গেছে এখন সবাই আবার লেখাপড়া শুরু করুক। একটা ভুল নিয়ে পড়ে থাকাতে নিষেধ করলেন। তিনি রেবাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন তুমি হচ্ছো আমার সাহসী মেয়ে, তোমাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন, সেটা মিথ্যা প্রমাণ করোনা। জীবন সবে শুরু পরে কী হবে তা সময় বলে দেবে। এখন মন দিয়ে পড়াশুনো করতে হবে। হেডমাস্টার সাহেবের কথা অমান্য করার সাহস আজাহার সাহেবের ছিলনা। রেবা শিমু শশী আবার স্কুলে যেতে শুরু করলো।
ভুল-৬ঃ কবি শাহিনা খাতুন
রেবা এস এস সি তে ভাল রেজাল্ট করলো। সানু এইচ এস সি পাশ করে বে এল কলেজে অংকে অনার্স পড়তে শুরু করলো। এর মধ্যে কখন তাদের মধ্যে আবার যোগাযোগ হয়েছে সে খবর আর কেউ আলাদা করে রাখেনি। তবে তাদের ভালবাসা এলাকাজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ বিষয়ে এখন আর কোন গসিপ নেই। যে যার মত পড়াশুনা করছে। আগের মত জাহাংগির পোস্টম্যানের কাজ করে তবে বিষয়টি নিয়ে কোন আলোচনা নেই। রেবা বয়রা উইমেনস কলেজে ভর্তি হয়েছে। হয়তো তাদের মাঝে মাঝে কোথাও দেখা হয়। আরমান আর কখনো রেবাদের বাড়িতে আসেনি। তবে জানা যায় সে মাস ছয়েক পরে এক সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করেছে এবং ভাল আছে। রেবা গল্প করেছে যে আরমান ভাই খুবই ভাল ছেলে। সে যখনি শুনেছে যে রেবা আর একটি ছেলেকে ভালবাসে আর প্রয়োজনে সারাজীবন তার অপেক্ষা করবে তখন তাকে আর জোর করেনি। তিনদিন ভাবতে সময় দিয়েছিল। তিনদিন পর ডিভোর্স পেপার রেডি করে প্রস্তুতি নিয়ে নিজের বাবা মাকে রাজী করিয়ে ঝালকাঠি থেকে খুলনা ফিরেছে। রেবার বাবা মাকে বুঝিয়ে সবকিছু ব্যবস্থা করে ফিরে গেছে। তাই রেবা আরমানের কাছে কৃতজ্ঞ। সেকথা সে তার পরিবারের কাছে, বন্ধু বান্ধবের কাছে স্বীকার করেছে। আজাহার সাহেব রেবার বিয়ে নিয়ে আর কখনো ভাবেনি বা কাউকে একবারের জন্য বলেনি। কিন্তু এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের দুই একজন মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করেছে যে সানুর বিয়ের প্রস্তুতি কখন। কে কিভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে। তবে এসব ব্যবস্থা সানুর উপরই বর্তায় বলে সকলে ধারনা করে। সানু অনার্স শেষ করে টিউশনি করছে আর মাস্টার্স এ ভর্তি হয়েছে। বি সি এস পরিস্কার প্রস্তুতিও নিচ্ছে ফাঁকেফাঁকে।
আশরাফ সাহেবের ইচ্ছা সম্পর্কে কেউ কখনো প্রশ্ন করেনি। অনেকেই ধারনা করে যে এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর তিনি নিশ্চয়ই আর অফিসার শ্রমিকের বিষয়ে ভাববেননা। তরিকুল আমিনুলও এখন বড় হয়েছে একজন কলেজে ভর্তি হয়েছে আর একজন এস এস সি পরীক্ষার্থী। একদিন সানুর মা সানুকে তার এক দুর সম্পর্কের বোনের মেয়েকে বিয়ে করার কথা বলে। সানু সাথে সাথে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় যে সে রেবাকে বিয়ে করবে। সানু একটু অবাক হয় যে এখনও তার মা এই অবস্থানে আছে। সানুর মা ফরিদা বেগম স্বামীর কথাকে আল্লাহ পাকের কথার পরই মান্য করেন। তিনি বলেন তোর বাবা আগের অবস্থানে আছেন। তিনি কখনো ঐ পরিবারে বিয়ে করাবে না।
সানু জানতে চায় সমস্যা কোথায়? ফরিদা বেগম বলেন একই মিলের শ্রমিকের মেয়ে বিয়ে করিয়ে সে সমাজে মুখ দেখাতে পারবেনা। তাই রেবার ভাবনা বাদ দিয়ে অন্য কারও কথা ভাবার জন্য ছেলেকে অনুরোধ করেন। তিনি আরও বলেন
তুমি সবার বড় তুমি যদি ঐ পরিবারে বিয়ে কর তাহলে তরিকুল আমিনুল কেউ ভাল পরিবারে বিয়ে করতে পারবেনা এবং উর্মিরও ভাল পরিবারে বিইয়ে হবেনা। সানু বহুদিন পর বাবা মার অবস্থান সম্পর্কে ধারনা লাভ করে। তরিকুল আমিনুল উর্মি মাকে অনুরোধ করে তাদের বাবাকে রাজী করানোর জন্য। কিন্তু ফরিদা বেগম বলেন আমি তোমাদের বাবার কোন কথায় কোনদিন দ্বিমত করিনি আজও করবোনা। তার চেয়ে বরং ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে বাবা মার পছন্দ মত বিয়ে করে ফেল। সানু হতাশ হয়। কী করবে বুঝে উঠতে পারেনা। সে এবিষয়টি নিয়ে তার বন্ধু বান্ধবের স্মরণাপন্ন হয়। বন্ধুরা পরামর্শ দেয় যে তারা ওদের বিয়ে দিয়ে রেবাকে ঘরে তুলে দেবে। কিন্তু সানু এ সিদ্ধান্ত ভাল মনে করেনা। তার ধারনা নিশ্চয়ই তার বাবা রাজী হয়ে যাবে। সে যদি একা একা বিয়ে করে ভাইবোনগুলোও হয়তো বাবা মার অমতে ভুল কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে।
সানু এবার তার এক চাচারর স্মরণাপন্ন হয়। চাচাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদের বাসায় নিয়ে আসে। এটি যে প্ল্যান করা আশরাফ সাহেব বস ফরিদা বেগম কাউকে বুঝতে দেয়না। রাতে খাবার টেবিলে বিষয়টি নিয়ে আশরাফ আর ফরিদার সাথে কথা বলে। প্রথমেই আশরাফ সাহেব রেগে গিয়ে বলে তুমি যদি এ উদ্দেশ্য এ এসে থাক আমি কোন কথা বলতে নারাজ। তুমি চলে যেতে পার। তখন চাচা বলেন আপনি শুনবেননা কেন আপনাকে সন্তানদের কথাও ভাবতে হবে। আশরাফ সাহেব বিভিন্ন রকম যুক্তি দেখায়য় এবং কোনদিনও সে এ বিয়ে করাবেনা বলে জানিয়ে দেয়। সে বলে যখনি রেবা নিখুঁত ছিল তখনই রাজী হইনি আর এখনতো সে আর ঘর করে আসা দোজবর মেয়ে সুতরাং তাকে এ সংসারে বউ করে আনার প্রশ্নই আসেনা। আজাহার তার মেয়ে নিয়ে ঠেকেছে এটা তার পারিবারিক ব্যাপার সে সামলাবে। তার কিছু করার নেই। আর যদি সানু একা একা বিয়ে করে করতে পারে সেক্ষেত্রে সে ত্যাজ্যপুত্র হিসাবে গণ্য হবে। সানুর চাচা তার ভাবীকে অনুরোধ করে তার ভাইকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু তার ভাবী অপারগতা প্রকাশ করে। চাচা বলে ভাই ভাবী ভুল করলেনন পরে পস্তাতে হবে। আশরাফ সাহেব বলেন তোকে নিয়ে এসেছি ওকালতি করতে তুই যেতে পারিস আমার ভাবনা আমি ভাববো। অগত্যা চাচা অপমানিত হয়ে ফিরে যায়। যাওয়ার সময় সজোরে বলে যায় সানু তুই একা একা রেবাকে বিয়ে কর। এরা সেই ব্যাকডেটেড রয়ে গেছে, এদের ছেড়ে দে।
ভুল-৭ঃ কবি শাহিনা খাতুন
এদিকে রেবার বাবাকে এলাকার লোকজন পরামর্শ দেয় এলাকার মুরব্বীরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে তাহলে নিশ্চয়ই আশরাফ সাহেব না করতে পারবেনা। আজাহার প্রথমে রাজী হয়নি। পরে ভাবে মন্দ কি? তার মেয়ে একাতো আর প্রেম করেনি। সুতরাং তাকে বাধ্য করালে এমন দোষের কী থাকতে পারে? সেমত এলাকার মুরব্বীরা বিষয়টি নিয়ে প্রথমে ঐ ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার রাজ্জাক সাহেবের সাথে দেখা করে। কমিশনার সাহেব বলেন রাজীতো তাকে হতেই হবে। এসব ব্যাপারে তিনি যুক্ত থেকে তিনি উপস্থিত থেকে ওদের বিয়ে পড়াবেন। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড প্রেমের জন্য সিংহাসন ছেড়েছে আর আশরাফ এমন কী হয়েছে যে আজাহারের মেয়েকে মেনে নিতে পারবেনা। মেনে তাকে নিতেই হবে। কমিশনার সাহেবের কথায় আজাহার সাহেব সহ অন্য মুরব্বীরা আস্বস্থ্য হয়ে ফিরে যায়। এসব খবর আর চাপা থাকেনা। রেবা আর সানুর ভালবাসা আবার মুখরোচক আলোচনায় পরিনত হয়। অবশ্য যারা এতদিন ওদের ভালবাসাকে বাঁকা চোখে দেখতো তাদের দৃষ্টিভংগীরও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। প্রেম করলেই যে ছেলে মেয়েরা উচ্ছ্বন্যে যায়না এ ধারনা অভিভাবকদের মনে তৈরি হয়েছে। অনেকের মনে বদ্ধমূল ধারনা ছিল যে রেবা সানু নিজেরা বিয়ে করে নেবে। কিন্তু দিনে দিনে এ ধারনা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। সানুও তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল যে সে একা একা বিয়ে করবেনা।বাবা মা তাদের ভালবাসার মর্যাদা দিয়ে তাদের বিয়ে করাবে।
সানুর এরূপ বিক্ষিপ্ত ভাবনার সময় একদিন কমিশনার সাহেব তাকে ডেকে নিলেন। বললেন “বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও
আমি যেদিন বসবো সেদিন বিয়ে পড়িয়ে উঠবো
আমি কাজীকে বলে রেখেছি। খবর দিলে সে রেজিস্টার নিয়ে হাজির হবে।”
একথা শুনে সানুর মাথা থেকে যেন বহুকালের বোঝা নেমে গেল। সানু ভাবলো এবার নিশ্চয়ই তার বাবা আর না করতে পারবেনা। সে সবকথা তার দুই বন্ধু রাজা আর সমিরকে শেয়ার করতো। রাজা আর সমির বললো চাচা এবার আর না করতে পারবেনা। এদিকে এসব কী ঘটছে একদিন রেবার সাথে দেখা করে সব জানালো সানু। রেবা খুব খুশি। মনে হচ্ছে সব বাধা অতিক্রম করে তাদের ভালবাসা সফলতার মুখ দেখতে যাচ্ছে।
রেবাও খুশীতে তার বন্ধুদের সাথে গল্প করলো যে যেদিন কমিশনার সাহেব বসবেন সেদিন বিয়ে হবে অথবা যদি সানুর বাবা আত্মীয় স্বজন নিয়ে অনুষ্ঠান করতে চায় তাহলেও দিনক্ষণ ঠিক হয়ে থাকবে। খুশীটা ঠিক যেন ওদের একার নয় এলাকাজুড়ে সবার। রেবার খুব কাছের বান্ধবীর নাম হেলেন। হেলেনকে সে সব বলে। একদিন আজাহার সাহেব আর তার স্ত্রী ঘরে ছিলনা। এ ফাঁকে হেলেনকে এক ট্রাংক চিঠি দেখায়। সে বলে এগুলো সে কোনদিন ফেলে দেবেনা। তাদের বাচ্চাদের এগুলো দেখাবে আর বলবে লাইলী মজনু শিরী ফরহাদ সফল হয়নি কিন্তু তারা সফল হয়েছে। সফলতার গল্প কল্পকথা থাকবেনা বাস্তবরূপ নেবে। বিয়ের বহু বছর পরে তারা দুজন একসাথে মিলে চিঠিগুলো পড়বে আর এসব কষ্ট এর দিনের কথা মনে করবে। হেলেন অবাক হয়ে যায়। এত চিঠি!
হেলেন – কত বছর ধরে জমাচ্ছিস?
রেবা- আরে ওর প্রথম চিঠিটাও আছে দেখবি?
হেলেন – অবশ্যই দেখবো।
রেবা- আরে আমাকে নিয়ে লেখা ওর অনেক কবিতা আছে। ও বলেছে বিয়ের প্রথম বিয়ে বার্ষিকীতে রেবা নামে একটা কবিতারর বই ছাপিয়ে দেবে। এটাই হবে আমার উপহার।
হেলেন -এত ভালবাসলি কীভাবে?
রেবা- জানিসনা ও এত ভাল ওকে ভাল না বেসে থাকাই যায়না। ওকে পাওয়ার জন্য ও যদি বলে একটা পাহাড় কাটতে আমি তাও পারবো। অথবা যদি বলে একটা নদী খনন করে দিতে আমি তাও করবো।
হেলেন – যা বাবা এখন আর তোর ওসব কিছু করতে হবেনা। বিয়ে করে ঘর সংসার কর আর এসব কথার আমি সাক্ষী হলাম। ঝগড়া করলে আমি কিন্তু বলবো এসব কথা।
রেবা -ঠিক আছে ঝগড়া হলে তুই আসিস তখন। কিন্তু তোর সে সুযোগ হবেনা। আমাদের কোনদিন ঝগড়া হবেনা।
হেলেন – ঠিক আছে আমি লিখে রাখলাম। কত তারিখ কয়টারর সময় তুই বললি যে তোদের কোনদিন ঝগড়া হবেনা।
সত্যই হেলেন একটা খাতার পাতায় দিন তারিখ লেখে পাতাটা ছিঁড়ে নিয়ে চলে যায়। রেবা তার চিঠি আর উপহারের ট্রাংকটা তালা দিয়ে রাখে।
ভুল-৮ঃ কবি শাহিনা খাতুন
বেশ কিছুদিন ধরে সানুর দুই বন্ধু রাজা আর সমির খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের নিরানব্বই পারসেন্ট ধারনা যেদিন কমিশনার বসবেন সেদিনই ওদের বিয়ে হয়ে যাবে। কী কী হতে পারে তার একটা প্রস্তুতি থাকা দরকার। হতে আশরাফ চাচা কোন টাকা পয়সা খরচ করলেননা। তখন কোথায় টাকা পাবে? তাই আগে থেকে কিছু টাকা যোগাড় রাখতে হবে। সানু, রাজা আর সমিরের টাকা একত্রিত করা হল। একটা আংটি একটা নাকফুল আর একটা ভাল শাড়ি নিজেরা কিনে লুকিয়ে রাখলো। যদি আশরাফ চাচা টাকার জন্য দেরী করার কথা বলে তারা বলবে এ মুহুর্তের অতি প্রয়োজন যা না হলে নয় তা তারাই ব্যবস্থা করবে। একথা বলে তারা কিছুসময় পর ওগুলো সামনে নিয়ে আসবে। সবচেয়ে কাছে যে কাজি অফিস সেখানে তারা যোগাযোগ করে বলে রাখে যে যেদিন মুরব্বীরা বসবেন যত রাত হোক সে যেন আসে। প্রয়োজনে তারা আলাদা করে তাকে টাকা দেবে। আরও কয়েকজন বন্ধুকে বলে রেখেছে যে তাদের দাওয়াত না দিলেও যেন তারা আসে। সানুর আফতাব চাচা যে আগে এসে ওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলে গিয়েছিল তার কাছেও যাওয়ারর সিদ্ধান্ত হয়। যদিও তিনি আসতে চাইবেননা কারন তাকে সেদিন আশরাফ চাচা কম অপমান করেনি। তবুও তারা তিনজন মিলে অনেক অনুরোধ করলে নিশ্চয়ই আসবেন। জাহাংগির হেলেনসহ আরও কয়েকজন বন্ধুরা মিলে কিছু টাকা চাদা তুলে জোগাড় করে রাখলো কারন মিষ্টি খাবার দাবারের ব্যবস্থা কিছুই যদি আশরাফ চাচা না করে তাহলে যেন তারা সামলাতে পারে।
এদিকে হেলেন আর রেবা মিলে খুলনা নিউমার্কেট গিয়ে রেবার জমানো টাকা দিয়ে সানুর জন্য একটা আংটি আর একটা পাঞ্জাবী কিনে লুকিয়ে রাখলো। আসলে আরো আগে থেকে কিছু টাকা জমানো উচিৎ ছিল তা এখন মনে হচ্ছে। তবে ধারনা আজাহার চাচা কিছু টাকা খরচ করবে।
ওয়ার্ড কমিশনারের অফিসেও রাজা আর সমির খোঁজ রাখছে। কবে নাগাদ তারা বসতে পারে। কমিশনার অফিসের সচিব রফিক সব ঘটনা জানে। সেও চায় যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ওদের বিয়ে হয়ে যাক। সেতো মাঝে মাঝে আশরাফ সাহেবকে গালি দেয় আর সানুকে কাপুরুষ বলে ভৎসনা করে। সে আবার একটু বেশী কথা বলে। সে বলে সানু রেবাকে কম ভালবাসে বলে এখনো বিয়ে করতে পারেনি আর রেবা বেশী ভালবাসে বলে বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও সংসার করেনি। ওর কথায় অত কান দেয়না ওরা। কমিশনার চাচা তার নিয়মিত শরীর চেকআপে ভারত গেছেন বলে দেরী হচ্ছে। তিনি দশ দিনের জন্য গেছেন। ফিরে এসে কোন এক শুক্রবার সময় দেবেন। তার সিডিউল লিখে রাখে সচিব রফিক ভাই। সে বলেছে তোমরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও এসব চিন্তা আমার উপর ছেড়ে দাও।
যদিও সব ঘটনা সানুর অনুকূলে তবুও কেন যেন এক অজানা আশংকায় সানুকে পেয়ে বসেছে। ইদানিং তার ঘুম কম হচ্ছে। আগে সে প্রতিদিন পড়া শেষ করে ঘুমুতে যাবার আগে রেবাকে একটা চিঠি লিখতো। সেটা দুই লাইনের হলেও। কয়েকদিন ধরে চিঠি লেখা হয়ে উঠছেনা। লিখতে শুরু করলে কেমন যেন একটা অস্থিরতা অনুভব করে আর লিখতে পারছেনা। সব যেন এলোমেলো লাগছে। এত সুখ কি তার কপালে সইবে? সত্যই কি তার বাবা মা রেবাকে মেনে নেবে? রেবার মত একটা ভাল মেয়েকে কোনদিন তাদেরর সন্তানের ভালবাসারর মানুষ হিসেবে ভেবে দেখতে পারলোনা। শুধু শ্রেণি বৈশম্য ছাড়া আর মনের মধ্যে কিছুই নাই? তার খুব অভিমান হয় তার মায়ের উপর। বন্ধুদের মাকে দেখেছে সন্তানদের জন্য কত কি করে! অথচ তার মা কোনদিন রেবা সম্পর্কে কোন আগ্রহ দেখায়নি। একদিন সে বলেছিল মা তোমারতো একটা কাজের লোকের দরকার। তুমি না হয় সে মর্যাদা দিও তবুও রেবাকে মেনে নাও। তারপরও তার মা তার প্রতি সদয় হয়নি। সারাজীবন মিসেস আশরাফ হয়ে রইল মা হতে পারলোনা। অবশ্য এ দেশে হাজারো অশিক্ষিত কম শিক্ষিত মায়েরা সন্তানদের জন্য লড়াই করতে পারেনা। আবার কেউ কেউ কায়িক পরিশ্রম করে এত বেশী করে যে অনেক মাকে হার মানায়। তার ভাগ্যে এমন মা জোটেনি। ডায়েরী লেখার দরকার তাও ইচ্ছে করছেনা। ইদানিং টিউশনির জায়গাগুলোতে অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। সে একটা ক্রাইসিস সময় পার করছে সেকথা অবশ্য বলেছে। তারপরও ভাবছে একটু অস্থিরতা কমাতে হবে। মনের অবস্থা রেবাকেও জানাতে পারছেনা কারন রেবা আনন্দে আছে। ওর আনন্দ ভেঙে দিতে মন চাচ্ছেনা। আর রাজা আর সমিরও এত আনন্দ নিয়ে এত কাজ করছে যে ওদের আনন্দও আশংকায় ভরে দিতে ভাল লাগছেনা। তবে ঠিক করে যে একটা চিঠি রেবাকে লিখতে হবে।
ভুল -৯ঃ কবি শাহিনা খাতুন
কয়েকবার কাগজ কলম হাতে নিয়েও রেবাকে লেখা হয়ে ওঠেনি। আজকাল তার মা বাবা তার সাথে কম কথা বলছে। মনের আশংকা বারবার ভুল বলে উড়িয়ে দিয়ে আবারো পড়ালেখা টিউশনিতে মনযোগ দিয়েছে। একবার রেবার সাথে দেখো করা দরকার। রাজা আর সমির বলেছে এত কী তোর তাড়া? মনের মানুষকেতো কাছেই পেয়ে যাচ্ছিস। সানুও সেই ভাবনায় রেবার সাথে দেখা করেনি।
এদিকে মহল্লার ছেলেমেয়েরা ঠিক করেছে তারা একটা মঞ্চনাটক করবে সেখানে অভিনয় করতে হবে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে হবে। নাটকের নাম “উদয়নালা”। বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলাকে হত্যার পর পর মীর কাশিম মীর জাফর এর সিংহাসনে আসিন হওয়া সিংহাসনচ্যুত হওয়ার ঘটনা নিয়ে ড্রামা। পাড়ার ছেলেমেয়েরা এসব ব্যাপারে তার উপর খুব নির্ভর করে। তাই ওরা বার বার আসে বিভিন্ন রকম সিদ্ধান্ত চায়। আসলে কোনকিছু ঠিক যেভাবে কনসেনট্রেড করা উচিৎ তা পারছেনা। সমির এসে জানিয়ে যায় ওয়ার্ড সচিব রফিকের সাথে দেখা হয়েছিল। দুই দিন পর চেকআপ শেষ করে কমিশনার চাচা দেশে ফিরবেন। ফিরেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বসার জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন। সে টাকারর হিসাব করতে গিয়ে রেবার জন্য কিছু জিনিষপত্র পায় আসলে ওগুলো কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে কেনা হয়েছিল। এরপর ওর সাথে দেখাও হয়নি দেয়াও হয়নি। একটা ব্যাগে জিনিষগুলো ভরে ব্যাগের উপর মোটা কলম দিয়ে রেবা লিখে রাখে। দুইদিন পর কমিশনার রাজ্জাক চাচা ফিরে এসেই তাকে ডেকে পাঠায়। সন্ধ্যায় রাজা সমির আর সানু মিলে কমিশনার চাচার অফিসে গিয়ে দেখা করে। কমিশনার তাকে জিজ্ঞেস করে
বল কোথায় বসলে তোর সুবিধা হবে?
তুই যেখানে বলবি সেখানে বসবো
শোন বিয়ের পর আমাকে খুব ভাল করে কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়াবি
রেবা কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করতে পারেতো?
আমি কিন্তু কাচ্চি ছাড়া কিছু খাবোনা বুঝেছিস
প্রয়োজন হলে আমি বাজার করে দেব
আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে রেবার হাতের কাচ্চিবিরিয়ানি খাব।
সানু এসব কথারর উত্তর না দিয়ে বলে চাচা কোথায় বসলে ভাল হয় এ বিষয়ে আপনি আব্বার সাথে কথা বলেন। আব্বা যেখানে বলে সেখানে বসেনন। তিনি বললেন আচ্ছা যা আমি তোর আব্বার সাথেই কথা বলবো। ওরা তিনজন ওখান থেকে ফিরে আসে। পরেরদিন রফিক খবর দেয় পরের শুক্রবার রাত আটটার সময় মহল্লার একটা ক্লাব ঘরে বসার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জাহাংগির এসে তাকে ডেকে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসে। জাহাংগির জানায় রেবার বাবা এবং ঐ এলাকার গণ্যমান্য সবাইকে রেবার বাবা থাকতে অনুরোধ করেছে। সবাই আগ্রহভরে থাকতে রাজী হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় শ দেড়েক লোক থাকবে মনে হচ্ছে। সানু রাজা ও সমিরকে ডেকে আপ্যায়ন করার জন্য কী কী ব্যবস্থা করা তা নিয়ে চিন্তা করে।
রাজ্জাক চাচা বলেছেন কথা বলতে বলতে দেরী হয়ে যাবে। আর বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে তিনি ঐ সময় কাজী ডেকে বিয়ে পড়াবেন। সুতরাং রাতের খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে আবার হালকা নাস্তা বসার পর পরই দিতে হবে। রাজা আর সমির আপ্যায়নের সব দায়িত্ব নিল। রফিকের সাথে কথা বলে রাজা আর সমির নাস্তা এবং রাতের খাবারের সব ব্যবস্থা করে ফেলে। এসব ওরা করলেও সানু সব কাজে ইনভলব থাকে। কাকে কাকে তার বাবা থাকতে বলেছে তা নিয়ে তার কৌতূহল থাকলেও সে সাহস করে জিজ্ঞাসা করতে পারেনা। তবে সে তার মাকে জিজ্ঞেস করে মা আমাদের পক্ষে আব্বা কাদের থাকতে বলেছে তুমি কি জান? মা জবাব দিল ” আমি জানিনা, তোর আব্বা বলতে পারবে।”
সে বুঝতে পারলোনা সত্যি তার মা জানে কিনা।
তাদের প্রেমের শুরুতে তারা একবার ভেবেছিল যে একসাথে তারা মরে যাবে। কীভাবে মরবে এ চিন্তা করতে গিয়ে দুজনা ভয় পেয়ে যায়। এরপর সিদ্ধান্ত নেয় লড়াই করে তারা দুজন বাঁচবে। একসাথেই বাঁচবে। একসাথ হতে না পারলেও অন্য কারও সংগ জোর করেও চাপাতে পারেনি সে প্রমাণ ইতোমধ্যে রেবা দিয়ে দিয়েছে। তাই ভালবাসার পরীক্ষায় রেবা একধাপ এগিয়ে আছে। রেবা অবশ্য বলে সানু বেশী ভালবাসে। এখন যদি এতদূর আসার পর দুজন একত্রিত হতে না পারা যায় সে দায় তার উপর বর্তায়। কিন্তু হেরে যেতে মন চায়না। রেবা বলে সে কিছুই চায়না শুধু সারাজীবন সানুর পাশে থাকতে চায়। অনেকেই মনে করে কেন তারা নিজেরা বিয়ে করে সংসার শুরু করলোনা? আসলে দুজনই বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। যদি তারা এটা করে তাহলে তাদের ছোট ভাইবোনেরা বাবা মাকে অমান্য করে যে যার মত জীবন বেছে নেবে যেটা তারা করলে বাবা মায়ের উপর অবিচার হয়। তবে হয়তো তাদের অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে এসেছে বলে এসব ঘটনা ঘটে চলেছে।
ভুল-১০ঃ কবি শাহিনা খাতুন
অবশেষে সেই কাঙ্খিত দিন এল। সানু রাজা আর সমির প্ল্যান মাফিক সব কাজ গুছিয়ে ফেললো। রাত সাড়ে সাতটা থেকেই লোকজন আসতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর ওয়ার্ড কমিশনার তার কয়েকজন লোক নিয়ে সভা স্থলে হাজির হলেন। সবাই মিলে মহল্লার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলো। উপস্থিত সবাই আশরাফ সাহেবের অপেক্ষা করতে লাগলো। মহল্লার রাস্তাঘাট স্কুল কলেজ পানি ইলেক্ট্রিসিটি পয়ঃপ্রণালী এসব নিয়ে অনেক কথা হল। রাজ্জাক সাহের নাস্তা দিতে বললেন। রাজা সমির তাদের ঠিক করা ছেলেদের নিয়ে নাস্তা দেওয়া শুরু করলো। নাস্তা খাওয়া প্রায় শেষের পথে তখনো আশরাফ সাহেব এলোনা। কয়েকজন সানুকে প্রশ্ন করলো কিরে তোর বাবা এত দেরী করছে কেন?
সানু চুপ ছিল। ভাবছিল এখনি তার বাবা এসে পড়বে। অনেক মুরব্বীদের অনেকদিন পর একসাথ হওয়া। সবাই সবার কুশল বিনিময় করছিল। সময় যাচ্ছিল কিন্তু কিন্তু যে কাজে আজকার জমায়েত সে কাজের কিছুই হচ্ছিলনা বলে অনেকে অধৈর্য্য হয়ে পড়ছিল। এক মুরব্বী উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসা করলো কি বাবা রাজ্জাক আশরাফ কি আদৌ আসবে? কমিশনার রাজ্জাক তখন দুজনকে পাঠালো খবর নিতে। তারা ফিরে এসে জানালো তারা বাসায় নেই। সন্ধ্যায় বেড়িয়ে গেছে আশরাফ সাহেব এবং তার স্ত্রী ফরিদা। কোথায় গেছে কাউকে বলে যায়নি। একথা শুনে অনেকে একসাথে বিরক্ত সহকারে বলাবলি শুরু করলো। সবচেয়ে মুরব্বী আলিম যাকে সবাই দাদা বলে সম্বোধন করে তিনি বললেন এটা কোন ধরনের বেয়াদবি? আশরাফ তার ছেলের জন্য আজাহারের মেয়েকে না নিতে পারে, সেকথা সে মজলিশ এ এসে বলবে কিন্তু এতগুলো লোক ডেকে এনে সে চলে যাবে এটাতো হতে পারেনা। এতগুলো লোককে অপমান করার সাহস সে কোথা থেকে পেল? কি এমন অফিসার সে হয়েছে যে এলাকার জনপ্রতিনিধিকেও সে মূল্যায়ন করেনা। কমিশনার বললেন সানু তুই গিয়ে খুঁজে দেখ তোর বাপ মা কোথায় গেছে। সানু সভাস্থল থেকে বাসায় এল দেখে তার দুই ভাই পড়ারর টেবিলে বসে গল্প করছে। ওদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল সন্ধ্যায় তারা বেড়িয়েছে কোথায় যাচ্ছে বলে যায়নি। সানু আসেপাশে যেখানে যেখানে সম্ভাব্য যেতে পারে বলে ভাবলো সবখানে খোঁজ করলো। কোথাও খুঁজে পেলনা। মনে হলো দুইটা মানুষ হাওয়া হয়ে গেছে। সভাস্থলে ফিরে যেতে হবে কিন্তু পা দুটো সরছিলনা। কী বলবে গিয়ে? রাত কম হয়নি। সকলের ঘুমের সময় হয়ে গেছে। অথচ লোকগুলো তার জীবন গুছিয়ে দেওয়ার জন্য বসে আছে। রাজা আর সমিরকে রাতের খাবার পরিবেশন করতে বলে এসেছে। ওরা যে কীভাবে সামলাচ্ছে? এসব চিন্তা করে মনে হচ্ছে ওর সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই কিছুদিন ধরে ঠিকমতো গোসল খাওয়া ঘুম হয়নি। তার মনে হচ্ছে তার চারপাশের সবকিছু ঘুরছে। সুস্থ থাকতে হবে। সবাই তার অপেক্ষা করছে। ওখানে গিয়ে সবার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সে বার বার বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলো আল্লাহ তুমি আমাকে এসব সামলানোর শক্তি দাও। রাজা আর সমির ঠিকমত রাতের খাবারটা লোকজনকে সার্ভ করতে পারলো কিনা? আসলে এ সময় তার থাকার দরকার ছিল। এমনই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে পথ চলছিল। এমন সময় দেখে ওয়ার্ড সচিব রফিক তাকে ডাকছে।
রফিক বললো সানু সবাই ভিষণ বিরক্ত তুমি সামলাও। দেরী করোনা। যাই বল আশরাফ চাচার একাজটা ঠিক হয়নি। সে তোমাকে বলতে পারতো যে কমিশনারের ডাকে আসবেনা। তাহলেতো কমিশনার স্যার এ আয়োজন করতোনা। ভাই খুব খারাপ ব্যাপার হল। তুমি কি বুঝতে পারছো? সানু রফিকের এসব কথার কোন উত্তর না দিয়ে তার সাথে যতটা সম্ভব ত্রস্ত পায়ে হেটে সভাস্থলে উপস্থিত হল।
ভুল-১১ঃ কবি শাহিনা খাতুন
রফিক আর সানু সভাস্থলে পৌঁছে দেখে সবাই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রাত এগারোটা বেজে গেছে। অনেকেই একসাথে প্রশ্ন করতে শুরু করলে কমিশনার রাজ্জাক সবাইকে থামতে অনুরোধ করলো এবং বললো আপনারা অনুমতি দিলে আমি কথা বলি।সকলে চুপ করলো। সে বললো আশরাফ সাহেব কাজটা ঠিক করেনি। আমি ইলেক্টেড জনপ্রতিনিধি, আমাকেও এত লোকের মাঝে অপমান করলো। অনেকেই বলে উঠলো ঠিকই বলেছেন।
কমিশনার- আমি আপনাদের মধ্যে পাঁচজনের কথা শুনবো। প্রথমে আলিম চাচা আপনি বলেন।
আলিম- আমি বলবো আজাহারের আশরাফের পরিবারে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা বাদ দেওয়া উচিৎ। ওরকম বেয়াদব শশুর শাশুড়ি নিয়ে মেয়েটা সুখি হতে পারবেনা। আর সানুর উচিৎ ছিল তার বাবাকে নিয়ে বসার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর নিষেধ করা। ওর বাবা মা এতগুলো লোককে অপমান করতে পারে তা ওর আন্দাজ করা উচিৎ ছিল।
কমিশনারঃ- এবার মানিক চাচা বলেন।
মানিক ঃ- কি আর বলবো বাবা আশরাফ সাহেবের মত বড় অফিসারতো আমরা এ জনমে দেখিনি। সে আমাদের কাউকে পরোয়া করেনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। তবে আলিম ভাইয়ের সাথে আমি একমত সানুর বিষয়টা বোঝা উচিৎ ছিল। তাহলে এতগুলো লোকের এত সময় নষ্ট হতোনা।
হেডমাস্টার সাহেব সাভাস্থলে প্রথমে উপস্থিত ছিলোনা। তাকে ডেকে আনা হয়েছিল। কমিশনার সাহেব তাকে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন।
হেডমাস্টার ঃ- আমার জানামতে এ সম্পর্ক থেকে রেবাকে বের করে আনার জন্য আজাহার অনেক চেষ্টা করেছে তা আপনারা সবাই জানেন। আর ভালবাসা এমন দোষের কিছুনা। পশ্চিমা দেশগুলোতে বাবা মা ধরে এনে একজনকে জোগাড় করে দেবে তাকে বিয়ে করতে হবে এমন কখনও হয়না। আশরাফ সাহেব অহংকারে অন্ধ হয়ে গেছে। ছেলের কষ্ট অনুভব করতে পারেনি। আপনারা একটা সিদ্ধান্ত আজ দিয়ে দেন।
মাজেদা নামে একজন মহিলা কমিশনারের কাছে রাজ্জাক সাহেব কিছু বলবে কিনা জানতে চাইলো।
মাজেদা-আমি মনে করি আজকের এ ঘটনার পর আমাদের উচিৎ আশরাফের সাথে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করা। সে আমাদের সবাইকে অপমান করেছে। তার শাস্তি পাওয়া উচিৎ। রেবাকে তার ছেলে ভালবেসেছে। এতখানি অবহেলা সে করতে পারেনা। এর একটা বিহিত করা দরকার।
কমিশনার- আজাহার সাহেব এবার আমি আপনার মুখে কিছু শুনতে চাই।
আজাহার -আমার কোন কথা নেই। আপনারা সব জানেন। আপনারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমি মাথা পেতে নেব।
কমিশনার ঃ-আমি এবার সানুর মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই।
সানু মিনিট দুয়েক নিরব থাকে। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। দু একজন বলে উঠলো তোমার বাবা মা ডেকে পালিয়েছে আর তুমি চুপ করে আছো এটা হবেনা কী করতে চাও বল। সানু সামনে বসা লোকজনকে আবছা দেখেছিল। মনে হচ্ছিল তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছিল।
সানুঃ- আমি শুধু আপনাদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছি।
সভার লোকজন তার মুখ থেকে আরও কিছু শুনতে চাইছিল। কিন্তু সানু কিছুই বললোনা। রাজা আর সমির খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সানু আগেই বলে রেখেছিল মেহমানদের এমনিতেই অপমান করা হয়েছে খাবারটা অন্তত যেন যত্নের সাথে খাওয়ানো হয়।
কমিশনার বললেন আজ অনেক রাত হয়েছে। আমি সপ্তাহ খানেক পর আপনাদেরকে নিয়ে আবার একবার বসে ফয়সালা করে দেব। সানু যদি চায় তাহলে ওদের বিয়ে আমরা দিয়ে দেব। যাহোক কী করবো সেটা পরে দেখা যাবে। আজ আপনারা যে যার বাসায় চলে যান। কমিশনারের এ কথার শেষ হতেই যে যার মত উঠে পড়লো। কমিশনার তার লোকজনকে নির্দেশ দিলেন খাবারের সরঞ্জামাদি গোছগাছ করতে যেন সাহায্য করে। রাজা আর সমির গোছগাছ শেষ করে সানুর কথা মনে করলো। কই সত্যই অনেক সময় আমরা দুজনই আছি। সানুটা কই গেল? ওর মনের অবস্থা ভালোনা। আমাদের সাথে থাকলে কথা বললে গল্প করলে ও ভাল থাকবে। চল ও কোথায় আছে খুঁজে বের করি।
সমির ঃ- রাজা আমার কিন্তু মনে হয়েছে ও যেকোনো সময়ে ফেইন্ট হয়ে পড়ে যাবে। তুই খেয়াল করেছিস?
রাজাঃ- ও বেশ কয়েকদিন যাবৎ ঠিকমত খায়নি ঘুমায়নি অসুস্থ হওয়া খুব স্বাভাবিক। ওর এ সময় আমাদের পাশে থাকতে হবে। চল ও কি বাসায় গেল না অন্য কোথাও গেল খুঁজে বের করি।
ভুল-১২ঃ কবি শাহিনা খাতুন
রাজা আর সমির হেটে সানুদের বাসায় গিয়ে দেখে সানুর বাবা মা বাসায় এসেছে। ওরা কোন কথা না বলে সানুর রুমে ঢুকে গেল। গিয়ে দেখে সানু মেঝেতে পড়ে আছে। রাজা আর সমির একসাথে ডাকলো কিরে ঘুমিয়ে পড়ছিস? বলেই ওর মুখের দিকে তাকালো। দেখে মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে। পাশে ইঁদুর মারা ঔষধের খালি প্যাকেট পড়ে আছে। দুজন একসাথে চিৎকার করে উঠলো সানু তুই কি বিষ খেয়েছিস? সানু মাথা নেড়ে কাপা হাতে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিল।
ওরা দুজন চিৎকার করে বললো উর্মি তরি আমিন তোরা এদিকে আয় সানু মারা যাচ্ছে। ওদের চিৎকারে সানুর মা ফরিদা দৌড়ে এল তরিকুল আমিনুল উর্মি এবং আশরাফ সাহেব সবাই এলেন। মুহুর্তের মধ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে সবাই বুঝতে পারলো। উর্মি দাদা দাদা বলে জোরে কাঁদতে শুরু করলো। আর বলতে লাগলো আব্বা মা তোমরা আমার দাদাটাকে মেরে ফেললে। এদিকে রাজা আর সমির ওদেরকে বললো তোরা ধরাধরি করে বের কর। আমরা রিক্সা ভ্যান কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখি।
তরিকুল আমিনুল সবাই কাঁদতে শুরু করলো আর বললো দাদার যদি কিছু হয় ঘরে আগুন
জলবে। দাদা আমি যাচ্ছি রেবা আপুকে আনতে। তখন ফরিদা কেঁদে বললো একি করলি বাবা তুই বেঁচে গেলে আমি নিজে গিয়ে রেবাকে নিয়ে আসবো। আমিনুল বললো তুমি চুপ কর। তুমি মা না অন্য কিছু? আমার দাদার কিছু হলে দেখে নিও কী হয়। রাজা আর সমির একটা ভ্যান নিয়ে এসে দ্রুত ক্রিসেন্ট হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিল। হাসপাতালের গেটে কম্পাউন্ডার এনামুলের সাথে দেখা সে বললো ওকে এখানে চিকৎসা করে বাঁচানো যাবেনা। খুলনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যা। আমি এম্বুলেন্সের ড্রাইভার আছে কিনা খোঁজ করি। তোরা যেতে থাক। এম্বুলেন্স পেলে আমি নিয়ে আসবো। ওরা ভ্যান ঘুরিয়ে সদর হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিল। সমির শুধু কানে কানে বললো চাচা রেবাকে আনতে গেছে। তুই এটা কী করলি? তখন সানু ফিসফিস করে সমিরকে বললো
“আমি বাঁচতে চাই”
এনামুল এম্বুলেন্সের ড্রাইভার খুঁজে পেলোনা। ভ্যান যখন জোড়াগেটের কাছে এসে পৌঁছালো সানু বললো “তোরা আমাকে একবার রেবার কাছে নিয়ে চল,আমি আর বাঁচবোনা।”
সমির বার বার ভ্যান ড্রাইভারকে জোরে চালানোর জন্য অনুরোধ করতে থাকে। রাজা আর সমির সানুর হাত ধরে আছে। উর্মিকে কোনোভাবেই নিবৃত করা যায়নি। উর্মি সানুর পা দুটি কোলে করে নিয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর উর্মি চিৎকার দিয়ে বললো সমির দাদা দাদার পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। রাজা সানুর নাকের কাছে হাত নিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস চলছে কিনা বোঝার চেষ্টা করলো। ওর মনে হল শ্বাস চলছেনা। ও কাউকে কিছু বললোনা। এর মিনিট পনের পর ওরা হাসপাতালে পৌঁছাল। ইমার্জেন্সী ডাক্তার বেডে নিয়ে পরীক্ষা করে বললো যে তারও মিনিট বিশেক আগে মারা গেছে। তারপরও রাজা আর সমিরের অনুরোধ এ নাকে অক্সিজেন নল দিয়ে পরীক্ষা করে ওদের বুঝিয়ে দিল যে সাইফুলের শ্বাস প্রশ্বাস আর চলছেনা। ওরা ঐ ভ্যানে লাশ নিয়ে খালিশপুর রওয়ানা দিতে চাইলো কিন্তু পারলোনা। যেহেতু আত্মহত্যা করেছে তাই পরেরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। সাইফুলের বাবা মা ভাইবোন সবাইকে হাসপাতালে যেতে হল। পোস্টমর্টেম হল। পুলিশ এল মামলা করার সিদ্ধান্ত হল। ফরিদা বেগম তরিকুল আমিনুল আর উর্মিকে পারিবারিক কোন কথা হাসপাতালে বসে না বলার জন্য অনুরোধ জানালো। ফরিদা বেগম বললো
“ভাইকে হারিয়েছো তাকেতো আর ফিরিয়ে আনা যাবেনা। এখন যদি তোদের বাবা আর আমি জেলে যাই তোদের জীবন এখানেই শেষ। লেখাপড়া মানুষ হওয়া কিছুই হবেনা।”
একথার অর্থ তিন ভাইবোন বুঝতে পারলো। ডাক্তার পুলিশ সবাইকে ম্যানেজ করে সানুর লাশ নিয়ে আসতে বিকেল হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারন হিসাবে লেখা হল সাইফুল ইসলাম পিতা – আশরাফুল ইসলাম, মাতা-ফরিদা বেগম অসুস্থ ও অপ্রকৃতস্থ ছিল এবং আত্মহত্যা করেছে।
সাইফুলের বাবা আশরাফকে কয়েকটি কাগজপত্রে স্বাক্ষর দিতে হল। মাকেও তাই করতে হল। উর্মি তরি আমিন চুপচাপ সবকিছু দেখছিল। সাইফুলের মৃত্যুর খবর পেয়ে কমিশনার রাজ্জাক হাসপাতালে এলেন। তিনি ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললেন। শুধু বললেন “সানু তোকে আমি মেরে ফেলেছি। “সেদিন সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে আজ এদিন দেখতে হতোনা। বাপ তুই আমাকে ক্ষমা করিস।”
আশরাফ সাহেবকে আস্তে করে বললেন
খুশি হয়েছেনতো?
এখন জেলে যাবেন?
বাকী জেলে থেকে অফিসারগিরি করেন।
আশরাফ সাহেব সাথে সাথে পায়ে পড়ে বলে আমাকে বাঁচাও। আমি বুঝতে পারিনি। আমি জেলে গেলে আরও তিনটা ছেলেমেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। তুমি ওদের মুখের দিকে চেয়ে আমাকে মাফ করে দাও।
অবশেষে বিকেল পাঁচটারর দিকে সাইফুলের লাশ খালিশপুর নিয়ে আসা হলো।
ভুল-১৩ঃ কবি শাহিনা খাতুন
এদিকে রেবা অস্থির হয়ে পায়চারী করছিল। কেন মুরব্বীদের এত দেরী হচ্ছে? কেন কোন সিদ্ধান্ত জানতে পারছেনা বুঝতে পারছিলনা। এক পর্যায়ে জাহাংগির এর কাছে রেবা খবর পেল যে সানুর বাবা মা সে ছোট বেলায় পড়া টোনাটুনির গল্পের মত দাওয়াত দিয়ে পালিয়েছে। তার বাবা রাত করে ফিরে কাউকে কিছু না বলে শুয়ে পড়লেন। জাহাংগির অনেক রাতে মহল্লার সামনে চিৎকার করে বললো সানু ভাই বিষ খেয়ে মারা গেছে। যারা সজাগ ছিল তারা শুনতে পেল। তবে বেশিরভাগ লোক ঘুমিয়ে ছিল। রেবার কানে কথাটা পৌঁছাল। রেবা যখন ঘরের দরজা খুলতে যাবে তখনি রেবার বাবা মা বাধা দিল। না এতরাতে কোথাও যেতে হবেনা। আমরা সকলে কিছুক্ষণ আগে একসাথে ছিলাম। সবাইকে খাওয়া দাওয়া করানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সানু খুব বুদ্ধিমান ছেলে, সে আত্মহত্যা করবেনা। জাহাংগির কি শুনেছে তাই বলছে বাদ দে ওসব বাজে চিন্তা। রেবার ঘুম হলোনা। বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলোনা। ঘরের ভিতর পায়চারী করে রাত পার করে দিল।
আজাহার সাহেব তার স্ত্রী আয়েশা বানুকে ফিসফিস করে বললো শোন রেবার মা জাহাংগিরের কথা যদি সত্য হয় তাহলে রেবাকে নিয়ে ভয় আছে সে একটা দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। খবরদার ওকে এক মুহুর্তের জন্য একা রাখা যাবেনা। প্রয়োজন হলে সবাই না খেয়ে থাকবো কিন্তু তোমার ওকে পাহারা দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। ফজরের আজানের সাথে সাথে অনেকে ঘুম থেকে উঠে মসজিদে নামাজ পড়েন তারা ঘরের বের হয়েই জানতে পারলেন যে সানু সত্যই মারা গেছে। রেবাকে পাহারায় রাখা হলো। আজাহার সাহেব জানতে পারলেন তারা সভাস্থল ত্যাগ করার পর অপমানে কষ্টে সানু ঘরে রাখা ইঁদুরমারা বিষ খেয়েছে। কিন্তু ইঁদুরমারার বিষেতো মানুষ মরার কথা নয়। আসলে সানুর শরীরটা খারাপ ছিল বলে বিষক্রিয়া বেশী হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে সবাই এখানে সেখানে জড়ো হয়ে সানুর গল্প করতে লাগলো। অনেকেই বলছিল এত বড় বোকামী সানুর মত বুদ্ধিমান ছেলে করলো কী করে? ওর বাবার শাস্তি হওয়া উচিৎ বলে সবাই মন্তব্য করছিল। রেবার মা রেবাকে ওয়াশরুমেও একা একা যেতে দিলেননা। রেবা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। বাবা মার পায়ে ধরে অনুরোধ করছিল তাকে একটিবারের জন্য সানুর মুখটা দেখতে দিতে। এ ব্যাপারে আজাহারের কড়া নির্দেশ আয়েশা ও তার অন্যান্য ছেলেমেয়ের প্রতি যে সদর রেবার কিছু হয়ে যায় আমি তোমাদের দায়ী করবো। সে কলোনির গেইটের একটা হোটেল থেকে খাবার কিনে এনে দিল। সকাল হলে রেবাকে একটা ঘরে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে চাবি নিজের কাছে রেখে দিল। রেবা জানালার কাছে এসে চিৎকার করে লোকজনকে অনুরোধ করছিল যেন একটিবার তার রুমের দরজাটা খুলে দেওয়া হয় সে শেষবারের মত সানুর মুখটা দেখবে। অনেকে আজাহারকে অনুরোধ করেছে। এ ব্যপারে আজাহার কারো কথা শুনলোনা। মনে হল তার মত পাষাণ পিতা আর জগত সংসারে আর নাই। রেবা ঐ একটা ঘরে আটক থাকলো।
সানুর লেখা শেষ চিঠিটা সমিরের পকেটে ছিল। সানুর লাশ দেখতে অনেকেই এল। পাড়ার ছেলে বুড়ো সবাই কাঁদলো। কেউ কেউ যাবার সময় ঘরের উপর থু থু ছিটিয়ে চলে যাচ্ছিল। উর্মি শুধু থেকে থেকে দাদা আমার দাদা তুই এটা কেন করলি বলে কাঁদছিল। বাবা মাকে দেখিয়ে বলছিল ওরা বাবা মা না ওরা রাক্ষস দেখ ওদের বড় বড় নখ বড় বড় দাত আছে। আমার দাদাটাকে এনে দাও। এই গগণ বিদারী চিৎকারে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সানুর শরীরটা কাল সবুজ নীল মিলিয়ে একটা রঙ ধারন করেছিল। রাত নয়টার দিকে জানাজা শেষ করে গোয়ালখালী কবরস্থানে সানুকে দাফন সম্পন্ন হলো।
ভুল-১৪ঃ কবি শাহিনা খাতুন
সমির এসে জানালা দিয়ে সানুর লেখা শেষ চিঠিটা রেবাকে দিয়ে গেল। রেবার হাত ধরে সমির অনেক কাঁদলো আর বললো ও শেষ কথা বলেছে
“আমাকে একটু রেবার কাছে নিয়ে চল চেষ্টা
করে লাভ নেই আমি আর বাঁচবোনা।”
তুই আমাকে আর রাজাকে দোষ দিতে পারিস। আমরা ওকে মেরে ফেলেছি। খাওয়ানো দাওয়ানো নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে ওর খোঁজ রাখিনি। আমাদের উচিৎ ছিল ওর খেয়াল রাখা। পারলে আমাদের ক্ষমা করিস রেবা। রেবা কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুললো। চিঠিটা ছিল এরকম।
প্রিয়তমা রেবা
আমি চলে যাচ্ছি। আমার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। সেকথা গুলো তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম। কয়েকদিন ধরে তোমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময় করতে পারিনি। অনেক কথা ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল। তোমার সন্তানের পিতা হওয়া হলোনা। খুব আগে জন্মগ্রহণ করে ফেলেছি। বাবা মাকে সমাজের চোখে হেয় করবোনা বলে আমরা নিজেরা বিয়ে করতে পারিনি এজন্য তুমি আমায় অপরাধী করোনা। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের পাশাপাশি সম্মানের প্রয়োজন হয়। আমি তা হারিয়ে ফেলেছি। তুমি বেঁচে থেক। ভাল থাকার চেষ্টা কর। আমি তোমার মধ্যে বেঁচে থাকবো। তোমার ভাইবোনদের সাথে সাথে পারলে আমার ভাইবোনদেরও দেখে রেখ।
খোদা হাফেজ।
তোমার অভাগা সানু।
রেবা চিঠিটা এতবার পড়লো যে তার চোখের পানিতে অক্ষরগুলো একদিনের মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে গেল। রেবাকে সপ্তাহ খানেক পাহারা দিল তার বাবা মা। জানালার গ্রিলে মাথা ঠোকাত ঠোকাতে কপাল কেটে রক্ত ঝরলো কিন্তু কেউ আজাহার সাহেবের মন গলাতে পারলোনা। শুধু তার ভাইয়ের অনুরোধ এর পর বললো
“তোমরা কি চাও সানু গেছে এখন রেবাও যাক। যদি আমায় গ্যারান্টি দিতে পার আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারবা, তাহলে আমি এক্ষুণি তালা খুলে দিতে পারি।”
রেবা কাঁদে আর ঘুমায়। এক সপ্তাহ পর রেবার রুমের তালা খুলে দেওয়া হলো। রেবা এক দৌড়ে একটা রিক্সা নিয়ে গোয়ালখালী কবরস্থানে চলে গেল। কবরস্থানে গিয়ে সানুর কবরের পাশে বসে চিৎকার দিয়ে কাঁদলো আর বললো –
“তুমি আমায় ভালবাসলে অথচ এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমায় জানালেনা। এটা হতে পারেনা। ”
রেবার পিছনে পিছনে এলাকার অনেক লোক কবরস্থানে এসেছিল। রেবাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ধরে আবার বাসায় নিয়ে আসা হল। সানুর মৃত্যুর সাথে সাথে এলাকা যেন স্তব্দ হয়ে গেল।
সানুর মৃত্যুর মাস খানেক পর একদিন উর্মি এল রেবাদের বাসায়। রেবাকে জড়িয়ে ধরে উর্মি আর রেবা অনেক কাঁদলো।
উর্মি – রেবা আপু আমি যদি মাঝে মাঝে তোমায় দেখতে আসি তুমি কি রাগ করবা?
রেবা- উর্মি এসব কথা বলিসনা। বরং আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছু সময় থাক। আমার মনে হয় তোর গায়ের গন্ধ তোর দাদার মত।
আমায় একটা জিনিষ দিবি?
উর্মি – কী যে বল তুমি? আমার দাদা তোমার জন্য জীবন দিয়ে দিল আর তুমি এমন কী চাইবে আমি দিতে পারবোনা? বল তোমার কী চাই আমার কাছে।
রেবা- তোর দাদার ব্যবহার্য কাপড় জিনিষপত্র যাতে তোর দাদার গায়ের গন্ধ লেগে আছে তার কয়েকটা নাধুয়ে আমাকে দিবি। তোর আব্বা আম্মা যেন জানতে না পারে। আর যদি ডায়েরি খুঁজে পাস তবে আমার জন্য নিয়ে আসিস আপু।
উর্মি – ঠিক আছে। দাদার জিনিষপত্র তোমার। আমি তোমাকেই দিয়ে যাব। কে কী বলবে সে পরওয়া আমি করিনা।
আরও কিছ্বক্ষণ দুজন মিলে গল্প করলো। খনেক কান্না খনেক গল্প। আজাহার সাহেব আর তার স্ত্রী উর্মিকে খাবার খাইয়ে বাড়ী পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।
পরেরদিন তরিকুল একটা বড়সড় স্যুটকেস নিয়ে আজাহার সাহেবের বাসায় হাজির হল। রেবাকে স্যুটকেসটা বুঝিয়ে দিয়ে তরিকুল দ্রুত চলে গেল।
ভুল-১৫ঃ কবি শাহিনা খাতুন
সানুর ব্যবহার্য শার্ট প্যান্ট কিছু বইপত্র সার্টিফিকেট ডায়েরি স্যুটকেস ভর্তি করে তরিকুল দিয়ে গেল। রেবা শার্ট প্যান্টগুলো নিয়ে খানিক কাঁদে খানিক বেহুঁশ হয়ে থাকে। এভাবে কয়েকমাস কেটে গেল। আজহার সাহেব তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা এই ভেবে তৃপ্ত যে রেবাকে বাঁচানো গেছে। আজাহার নিজেকে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় যে ঐ সময় তার দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় তাকে সন্তান হারাতে হয়নি। রেবাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো কিন্তু তাতে কোন ফল হলোনা। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব পরামর্শ দিল ভারত নিয়ে চিকিৎসা করাতে। আজাহার তাই করলেন। কলকাতা নিয়ে ডাক্তার দেখালেন। সেখানে ডিপ্রেশন এর চিকিৎসা চললো অনেকদিন। কলকাতার ডাক্তার সাইকোথেরাপিস্ট দেখাতে বললেন। সাইকোথেরাপিস্ট দেখাতে রেবাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে হলো। প্রায় বছর খানেক চিকিৎসার পর রেবা কিছুটা সুস্থ হলো। রেবা পুনরায় কলেজে যাওয়া শুরু করলো। তবে মাঝে মাঝে গোয়ালখালী কবরস্থানে যেত। কবস্থানের কেয়ারটেকার আব্দুর রহিম রেবাকে সন্তানের চোখে দেখতেন। রেবা গেলেই সানুর কবরের কাছে তিনিও যেতেন। রেবার কাঁদতেন সাথে সাথে তিনিও কাঁদতেন। অনেক বেশী সময় রেবা কবরস্থানে থাকলে তিনি নিজেই রিকশা ডাকতেন এবং বলতেন
“মা তোমার জন্য রিকশা অপেক্ষা করছে। এখন বাসায় যাও। আর একদিন এসো। ”
কেয়ারটেকার আব্দুর রহিম একটা পাতাবাহার আর একটি শিউলি ফুলের গাছ লাগিয়ে দিলেন সানুর কবরের উপর। গাছদুটি তরতর করে বেড়ে উঠতে লাগলো। রেবার অনুরোধে আব্দুর রহিম প্রতিদিন সানুর কবরের জায়গাটা পরিস্কার করতেন। রেবা দুইটি বাসায় প্রাইভেট টিউশনি করত। নিজের হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে সামান্য কিছু হলেও আব্দুর রহিমকে দিত। তিনি নিতে না চাইলেও রেবা জোর করে দিত। দিনে দিনে রেবার সাথে তার একটা অদ্ভুতরকম মায়ার সম্পর্ক তৈরি হলো। একদিন সে রেবাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। তার ছয় ছেলেমেয়ে। পাঁচ ছেলে এক মেয়ে। কেয়ারটেকার আব্দুর রহিমের বাসায় গিয়ে তার মনে হল ঐ পরিবারে সে খুব পরিচিত একজন মানুষ। আব্দুর রহিমের স্ত্রী আলেয়া তাকে মা বলে সম্বোধন করছিল। রেবা সে বাসায় খাওয়া দাওয়া করলো। যে মানুষটিকে সে সানুর মৃত্যুর আগে কোনদিন দেখেনি সে এবং তার পরিবারের সবাই তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিল। রেবা মাঝেমাঝে সে বাসায় যেত এবং কিছু সময় কাটিয়ে আসতো। আজাহার সাহেব রেবাকে কোনকিছু নিয়ে খুব বেশী ঘাটাঘাটি করতেননা। তিনি তার অন্য ছেলেমেয়েদের বলে দিয়েছিলেন তারা যেন কোনক্রমে রেবার সাথে এমন কোন ব্যবহার না করে যাতে সে কষ্ট পায়। আজাহার সাহেবের মত নিম্নবিত্ত সংসারে ভারত নিয়ে চিকিৎসা করানো এটা সবাইকে তিনি বারবার মনে করিয়ে দিতেন। রেবা শিমু আর শশীর পড়ালেখা নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতো। ওদের লেখাপড়া নিয়ে ওর মা বাবার আর চিন্তা করতে হতোনা।

লেখিকাঃ জনাব শাহিনা খাতুন, যুগ্ন সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধারে তিনি একজন লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পি।
তারিখঃ ২৫/০৬/১৯













