ভুল- ৩৫ঃ কবি ও লেখিকা শাহিনা খাতুন।
তরি অনেক রাত করে বাসায় ফিরে দেখে প্রতিদিনের মত উর্মি তার অপেক্ষায় জেগে আছে। তার মা ফরিদা বেগম রাত জাগতে পারেনা। রাত জাগলে সে এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ে যে পরদিন স্বাভাবিকভাবে আর কোন কাজ বাজ করতে পারেনা। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গার ব্যাথাগুলো বেড়ে যায়। বিশেষ করে সারাদিন মাথা ধরে থাকে। তাই ফরিদা কখনো রাত জাগেনা। ডাইনিং টেবিলে খাবার প্লেটে ভাত বেড়ে বলে মেঝোভাই আয় ভাত বেড়ে বসে আছি। তোর সাথে একটু কথা আছে। তরি ওয়াশরুম সেরে টেবিলে এসে বসতেই উর্মি রেবার চিঠিটা হাতে দিয়ে বলে জাহাংগির ভাই এসেছিল। রেবা আপুর চিঠি। তরি চিঠিটা নিয়ে টেবিলে রেখে ভাত খেতে শুরু করে।
উর্মি – চিঠিটা পড়না মেঝোভাই। রেবা আপু কী লিখেছে?
তরি – তুই চিঠি খুলিসনি?
উর্মি – তোর চিঠি তুই খোলার আগে আমি খুলবো তুই আমাকে এতটা অভদ্র মনে করিস?
তরি – না ঠিক তা নয়। কৌতূহল হতে পারে। তুই পড়তেই পারিস।
উর্মি – না না আমি তা করিনি।
তরি চিঠিটা টেবিল থেকে নিয়ে উর্মির হাতে দিয়ে বলে “জোরে জোরে পড় আমি শুনি।” উর্মি চিঠিটা পড়ে।
তরি- ঠিক আছে আমি সময় করে রেবা আপুর সাথে দেখা করে তার কথা শুনে আসবো। তবে তোর সাথে কি শিগ্র দেখা হয়েছে?
উর্মি – না হয়নি। তুই যেদিন যাবি আমাকে নিবি? আমার খুব রেবা আপুকে দেখতে ইচ্ছে করছে।
তরি- ঠিক আছে সময় পেলে তোকে নিয়ে যাবো।
দুভাইবোনের কথোপকথন শেষে দুজনই ঘুমুতে চলে যায়।
তরির শরীরটা দিন দিন আরও খারাপ হতে থাকে। তার মনে সে বোধ হয় আর বেশিদিন বাঁচবেনা। ইদানিং প্রায়শই গায়ে জ্বর জ্বর লাগে। খাওয়ার রুচিও নষ্ট হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বমি বমি লাগে। তবে একটা নৌকায় মাঝির সহকারী হিসাবে কাজ নিয়েছে। মাঝির নাম নেছারুদ্দিন। তাকে সবাই নেছু চাচা বলে ডাকে। বয়স হয়েছে। কাশের রোগ আছে। মাঝে মাঝে শ্বাস কষ্ট হয়। মাঝনদীতে শ্বাসরোগ দেখা দিলে কষ্ট পায় তাই তাকে বলেছে আর কয়দিন ট্রেনিং নিতে হবে। সে বলেছে। নেছু চাচা তুমি ভেবোনা ও আমার বা হাতের খেল দেখো শিখে নেবো। কথা অনুযায়ী মাঝে মাঝে নিজেই নৌকা চালায়। নৌকা চালাতে চালাতে নদীর সাথে কথা বলে। নেছু একদিন প্রশ্ন করেছিল “এই তুই বির বির করিস কেনরে? পাগল নাকি? ” তরি উত্তর দেয় “না চাচা ও কিছুনা। তুমি ইচ্ছে করলে আমায় পরীক্ষা করে দেখতে পার।” তরিকে তার নাম ধাম বাড়ী ঘর নিয়ে জিজ্ঞেস করলে সে শুধু মিথ্যে কথা বলেছে। বলেছে তার মা বাবা সবাই রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছে তার আর কেউ নেই। বিখ্যাত বটগাছের নীচে থাকে ওখানেই ঘুম খাওয়া। ভিখারিরা তার আত্মীয়তে পরিনত হয়েছে সেকথা সে জানিয়েছে। এই মিথ্যাটা বলাতে তার ভিতর অপরাধবোধ হয়েছে, কিন্তু তার করার কিছু ছিলোনা। সত্য কথা বললে সে কাজটা পেতোনা। নেছু চাচা দুঃখ করে বলেছে “আহারে বাছা মন খারাপ করে থাকিস না। যার কেউ নেই এই পুরো দুনিয়াটা তার। মনে করবি আমি তোর নিজের চাচা।” সে তাকে খুব ভালবাসে। মাঝে মাঝে শরীর খারাপ থাকলে গায়ে মাথায় হাত দিয়ে জ্বর হয়েছে কিনা দেখে। আবার খেয়েছে কিনা তারও খোঁজ রাখে। এইসব ভালবাসা দেখে দেখে তার ভালই লাগে আর বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু সে জানে বাসায় না ফিরলে উর্মি চিন্তা করবে, না খেয়ে থাকবে, হয়ত কাঁদবেও। উর্মিটা ঘরে ফিরে যাওয়ার উছিলা হয়ে আছে। আর কোনকিছু বাকি নেই। মা বাবাকে আজকাল আর অনুভব করেনা। নদীটাকে সানুদাদা মনে করে। আর আমিনুলকে মনে করে মাঝে মধ্যে। কলেজ পড়ালেখা তার ভাগ্যে নেই। ওসব নিয়ে এখন আর ভাবেনা। মৌরিকে প্রায়ই মনে পড়ে। ইদানিং মনে হয় মৌরীকে সে ভালবাসতো। সে নিজেই জানতোনা যে সে ভালবাসতো। ভালই হয়েছে সে কথা মৌরী জানতে পারেনি। যদি জানতো তাহলে এখানে মিথ্যে পরিচয় এখানে মাঝিগিরি করা হতোনা। আর প্রেমে পড়া খুব খারাপ তার দাদা জীবন দিয়ে শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে প্রেম খুব ক্ষতিকর বিষয়। কোনোভাবেই প্রেমে পড়া যাবেনা। মৌরীকে যে এড়াতে পেরেছে সেজন্য সে নিজেকে সবসময় ধন্যবাদ দেয়।
তারিখঃ ১১/০৯/২০১৯











