অমরাবতী গ্রামঃ শাহিনা খাতুন এর কবিতা।

অমরাবতী গ্রামঃ শাহিনা খাতুন।

একটু স্বচ্ছলতার স্বপ্নে বাবা
বেচে দিয়েছেন চাষের জমি
বিদেশ যাবেন বেতন পাবেন
দিনার কিংবা রিয়াল নেবেন
আদম ব্যাপারী চাচা আবার
চতুর ছিল ভিষণ ভারি
টাকা নিলেন স্বপ্ন নিলেন
জার্মানিতে চলে গেলেন
আর কখনো ফিরলেননা
বাবা আমার নিঃস্ব হলেন
কী যে হলো কেন হলো
এসব ভাবনায় বিভোর হয়ে
বাবা হলেন শয্যাসায়ী
কর্কট রোগও সুযোগ পেয়ে
ঘর বানালো শরীরে তার
ডাক্তার বৈদ্য হেরে গেল
হলেন তিনি ধরাশায়ী।
লতা পাতা হোমিওপ্যাথি
ইঞ্জেকশন স্যালাইন এলোপ্যাথি
সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে
অবশেষে গেলেন চলে
আমাদেরকে দিয়ে ফাঁকি।
চাচা ফুপু যারা ছিল বাবার প্রাণ
তারা বললেন তোদের কিন্তু কিচ্ছুটি নেই
যাবি কোথায় ভাবতে পারিস।
দাদা দাদীর মৃত্যুর পর
বাবাই ছিলেন আশ্রয় তাদের
তারাই বাবার ভুল খুঁজে পায়
বাবা নাকি ভিষণ বোকা
তাহার নাকি সবকিছু ভুল
এত্তগুলো ছেলেমেয়ে
কেমন করে মানুষ হবে?
কে তাদের ভার বইবে
সবই কিন্তু অসম্ভব ভাই।
আটভাইবোন কোথায় যাবে
চিন্তা এখন করতে হবে
মা তাদের রান্নাবাড়ায় পটু ছিল
আর স্বামীর বাড়ির স্বজনদের
ভালবাসায় ব্যস্ত ছিল
এতদিনে মনে হল স্বামীর বাড়ী অন্যরকম
যতই ভালোবেসেছে তাদের
আপন তারা হয়নি মোটেই
এই যে এত ব্যস্ত থাকা
দেবর ননদ ননদাইদের
আপ্যায়নে দিনগুজরানো
সবছিল ভুল মিছেই সকল।
কী আর করা
ভাইয়ের কাছে পত্র লেখা
ভাইটি আমার ভুল বুঝোনা
আমি কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি করিনি কখনো
স্বামীর বাড়ীই তোমার বাড়ী
বাসবে ভাল ভুল করোনা
এটাই ছিল পিতার আদেশ
যত্নে তাদের ত্রুটি না হয়
এটাই ছিল মায়েরও আদেশ
আমি কিন্তু ভুল করিনি
বিধি আমার বাম হয়েছে
কোথায় যাব কী করবো
তোমরা একবার ভেবে দেখো
বোনের পত্র পেয়ে অগত্যা ভাই ছুটে আসে
কি আর করা কোথায় থাকা
এসব নিয়ে ভাবতে থাকে
অবশেষে সবাই বলে
ঢাকায় যেয়ে থাকতে পার
সেখানে ভাইয়ের বাড়ী আছে
ঘরভাড়াটা বেচে যাবে
সবাই মিলে একটা উপায় বের করে
সংসারটা চালিয়ে নিয়ো।

ঢাকার পথে পা বাড়ানো তখন থেকেই
বাবার বাড়ির ঠিকানাটা হারিয়ে গেল।
মামার গৃহে তখন থেকে
মামা থাকেন লন্ডনেতে
মস্ত বড় ডাক্তার সে
অর্থবিত্ত সবই আছে।
নীতিবান সে তার ছিল দুটি কথা
মানুষ কিন্তু হতেই হবে
তখন বাড়ি ছাড়তে হবে
ভুলে যেন যাইনা সেটা।
মানুষ হওয়া কারে বলে?
দিনাতিপাত খুবই কঠিন
তিনবেলাতো খেতেই হবে
লেখাপড়া করতে হবে
কেমন করে এসব হবে
মা হয়ে যান নির্বাক তখন
টিউশনি চাকরি বাকরী না পেলে ভাই
কেমন করে সংসার চলে?
সংসার বড় নিষ্ঠুর সত্য
চালাতে কিন্তু কড়ি লাগে
সবাই ভিষণ ত্রস্ত ব্যস্ত
মনে মনে মানুষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
তিনটি বোনের চাকরী করা
দু ভাইবোনের টিউশনি
তারপরেও ডালভাত জোটা
দায় হয়ে যায়
মানুষ হবে কেমন করে বলতে পার
তোমরা সবাই?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লাইটপোস্টের
আলোয় পড়েছিলেন
অনেকের মুখে শুনতে পেলাম
দুঃখ ভুলে অভাব ভুলে
পড়ালেখায় মন দিয়ে
মানুষ হওয়া ভিষণ কঠিন
অল্পদিনেই বুঝে নিলাম।
আটভাইবোনই লেখাপড়ায় ভাল ছিল
লোকে তাদের গুণী বলতো
কেউ কেউ তাদের মেধাবী বলতো
অবশেষে কোনরকম শেষ করা
কাজের ফাঁকের লেখাপড়া।
তবে মিথ্যেবাদী কেউ নয় তারা
লোক ঠকানো তাদের কাজ নয়
কিন্তু বিত্ত বৈভব হয়নি তাদের
দরিদ্রই রয়ে গেছে
যদি বল মানুষ হয়নি
বলতে পার।
মানুষ হওয়া কারে বলে
জানিনা আমি জানতে চাইনা
চুরি ডাকাতি দেশের ক্ষতি
দশের ক্ষতি করেও অনেক
মানুষ হওয়ার দাবী আছে।
এমনি করে কয়েক বছর পার হয়ে যায়
সবাই মিলে সভা করে
অনেক বছর কেটে গেছে
ঢের হয়েছে সাহায্যদান
এখন তাদের বাড়ী থেকে নামতে হবে
ছোট ছিল দান করেছি
এখন তারা বড় হয়েছে
অবশ্যই নামতে হবে
ঢাকার বাড়ী অনেক ভাড়া
কতদিন আর থাকবে ফ্রি
চলে তাদের যেতেই হবে।
কী আর করা আর একটিবার পথে নামা।
নিশ্ব মানুষ পথে নামে
ঘর খুঁজে নেয় অল্প দামে
একটি বোন অনেক কষ্টে
পড়ালেখা চালিয়ে যায়
রাস্তাঘাটে বাসে রিক্সায়
পড়ে সেযে কাজের ফাঁকে
সময় আসে চাকরী নেবার
ফর্মটা পুরণ করতে হবে।
নাম পিতার নাম স্থায়ী ঠিকানা
লিখতে গিয়ে কলমটি তার থমকে দাড়ায়
কী লিখবে সে?

কোখায় তার স্থায়ী ঠিকানা?
কে বলবে কেউ বলতে পার?
শেষ কালেতে ফুফুর বাড়ীর
ঠিকানাটা লিখে রাখে
বাবার তখন মরণক্ষণ উপস্থিত ছিল
বাবা বললো তোর ফুফুরে
একবার ডাকতে পারিস?
আমার সময় শেষ হয়েছে
দুটো কথা বলার আছে।
ফুফুর কাছে খবর গেল
ফুফু ভাবলো অভাবগ্রস্থ ভাইটি তার
টাকা পয়সা চাইতে পারে
তার চেয়ে ভাল দুরে থাকা
নিজের কাজে ব্যস্ত থাকা
তাই সে সেদিন দুরেই ছিল
মৃত্যুর খবর পেয়ে অবশ্য
অনেক কান্নাই কেঁদেছিল।
বনেদি এক ঘরে তার বিয়ে হলো
ভাবলো সে এটাই তার নিজের বাড়ী
পুকুরপাড়ের তালগাছগুলো
উঠোনজুড়ে ছবেদা গাছ
লাউয়েরডগা পুইয়ের পাতা
মামু খালা গ্রামবাসী
সবই তার সেও তাদের
কিন্তু দু তিন বছর পার হলেই সে
বুঝতে পারে সব স্বপ্নই মিথ্যে ছিল
স্বামী তার যে অন্য নারীর প্রেমে পাগলt
তাই এত প্রেম ভাংতে হবে
কী করে যায় প্রেম কমানো
একটা কিছু করতে হবে
কোন সে ছুতোয় গ্রামখানিকে কেড়ে নেবে।
শুরু হলো প্রচার করা
স্ত্রী তার অহংকারী
গ্রামের দরিদ্রদের সে ঘেন্না করে
এসব বলে দিনে দিনে মন ভাঙিয়ে
গ্রামখানি সে কেড়েই নিল।
এখন সে মনে মনে গ্রামের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়।
মনে মনে একখানি গ্রাম পেয়েছে সে
গ্রামের নামটি অমরাবতী রেখেছে সে।
অনেক বছর চাকরী শেষে
এখনো তার মনে মনে
একটি গ্রামের স্বপ্ন আছে
অমরাবতী গ্রামের পথে আলতা পায়ে
নুপুর পরে হাটবে সে।
মায়াময় সে গ্রামের পথে
হাস্নাহেনা ফুল ফোটাবে।
গ্রামের পাশে একটি নদী
নদীর নামটি চন্দ্রাবতী
সে নদীতে পা ডুবিয়ে বসতে পার
একখানা গান গাইতে পার।
পত্র দিয়ে দাওয়াত দিলাম
একবার এসে দেখে যেও
আমার সে গ্রাম অমরাবতী।

তারিখঃ ০৭/০৮/১৯