শাহিনা খাতুন এর ধারাবাহিক লেখা ভুল-২৬।

জীবনের  ভুল-২৬ঃ শাহিনা খাতুন।

বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ  তরি পরদিন সকাল ১০ টা পর্যন্ত ঘুমালো। ঘুম থেকে ওঠার পর সাধারনত মাথাটা হালকা লাগে কিন্ত আজ তার মাথাটা হালকা লাগছে না বরং ভারী হয়ে আছে। ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে গেল। মনে মনে উর্মিকে খুঁজছে সে। উর্মি টের পেলনা।
উর্মি ঘরে থাকলে আদা তেজপাতা গরম মশলা দিয়ে এককাপ চা করে দিলে চা খেয়ে বাইরে চলে যায়। কিন্তু উর্মির টের পেল না। বুঝতে পারলো উর্মি স্কুলে চলে গেছে। অবশ্য ক্ষুধাও লেগেছে। নাস্তা খেতে হবে। টেবিলে খেতে বসতে ইচ্ছে করছেনা। আব্বা হয়ত ইতোমধ্যে অফিসে চলে গেছে কিন্ত মাতো বাসায় আছে। মায়ের সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না। মুলত তার বাবা আশরাফ সাহেবের উপর তার যতটা রাগ তার চেয়েও বেশি রাগ তার মায়ের উপর। তার মনে হয় তার বাবা যাই করেছে তার মা যদি সন্তানের প্রতি সামান্য দরদ থাকত তাহলে রেবা আপু তার ভাবী হতো, তার ভাই সানুও মারা যেতনা। সানুর মত ছেলেতো পাওয়া ভার। এরকম ছেলের মা হয়ে যদি ছেলের যত্ন করতে না পারলো তার মা হবার কী দরকার ছিল? মাতো সন্তানকে পেটে ধরে। কোলে পিঠে করে মানুষ করে, সন্তানের মন ভালো খারাপ হওয়া শিশুকাল থেকে দেখতে থাকে। সে যদি সন্তানে চাওয়া – পাওয়া না বোঝে তাহলে কে বুঝবে? রেবা আপুর বাবা মিলের শ্রমিক এর চেয়ে আর কোন নেগেটিভ বিষয়তো আদৌ ছিলো না। রেবা আপু দেখতে খারাপ না, চরিত্র ভাল, ব্যবহার ভাল। তদুপরি তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার পরও সে সানুর চেয়ে যোগ্য ছেলের সংসার করেনি।সানু দাদাকে ভালোবেসে সে এতই অপরাধ করেছে। সে মায়ের কাজের লোক হয়ে থাকতে চেয়েছে। এরপরও তাকে পুত্র বধুর মর্যাদা দিতে পারেনি সে কেমন মা? এমন মায়ের সন্তান সে! ভাবলে তার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। এত অহংকার কিসের?
এতগুলো গণ্যমান্য লোককে বসিয়ে রেখে তাদের বাইরে যাবার কি দরকার ছিল?
এত লোককে অপমান করে কতটুকু সম্মান তারা অর্জন করেছে?
বুঝলাম তার পিতা স্থুল সম্মানের চিন্তায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের মা? সেতো সন্তানকে শিশুর মত ভালবাসবে। যদি সে ঐরকম ভাল তার দাদাকে বাসতো সেতো তার বাবাকে মত করানোর চেষ্টা করতো। যদি একান্তই সে না শুনতে চাইতো প্রতিবাদ করতে পারতো। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়া মমতা এগুলো বড় কথা নয়। স্বামীর বাধ্যগত স্ত্রী হয়ে বেঁচে থাকাই তার মায়ের কাছে মূল্যবান হয়েছিল। এমন মায়ের সন্তান সে একথা তার ভাবতে ইচ্ছে করেনা। বরং তার কেউ নেই। ঐ ভিখারির দলের সাথে জীবন কাটানো অনেক ভাল। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে একসময় সে এ সংসার সারাজীবনের জন্য ত্যাগ করবে। ভিক্ষা করবে অথবা ছোট খাট কোন কাজ করবে। কোনদিন তার পরিবারের পরিচয় কাউকে দেবেনা। পরিবার দাদার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। এখন থেকে তার পরিবার নদী, বটগাছ, আর ঐ ভিক্ষুক কয়জন। ভিক্ষুকরা তাকে খেয়েছে কিনা একথা অন্তত জিজ্ঞেস করেছে। যতদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে বাঁচবে। যদি বাঁচতে ইচ্ছে না করে তাহলে দাদার মত চলে যাবে। ক্ষুধাটা বেশী লেগেছে। খাবার টেবিলে গিয়ে দেখে টেবিলে ভাত গামলায় ঢাকা আছে। পরিস্কার প্লেট উল্টা করে রাখা আছে। বাটিতে তরকারীও ঢাকা অবস্থায় রয়েছে। তরি প্লেট উল্টিয়ে ভাত তরকারী নিয়ে খেতে বসে। কিছুটা খাওয়ার পর তার মা এসে আর একটা চেয়ার টেনে বসে।
মা- তোর কী হয়েছে?
তরি নিরুত্তর থাকে।
মা- বাবা তোর কী হয়েছে? কী ব্যাপার? আমার সাথে কথা বল।
তরি কোন কথা না বলে খাবার শেষ না করেই হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। আজ তার রেবা আপু কেমন আছে জানতে ইচ্ছে করছে। নদীর কথাটা বলতে হবে। হতে পারে রেবা নদীর কাছে গেলে সানু নদী হয়ে রেবার সাথেও কথা বলতে পারে। তার সাথে যে মাঝে মধ্যে কথা হয় সেটাও বলতে ইচ্ছে করছে। তাই বাইরে বের হয়ে রেবাদের বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে হাটতে শুরু করে।

তারিখঃ ২২/০৮/১৯