ভুল- ৩৮: শাহিনা খাতুন।
বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ সেবা আব্দুর রহিমের বাসা থেকে বের হয়ে আসতে আসতে আলেয়া আব্দুর রহিম আর তাদের ছয় ছেলেমেয়ের কথা ভাবতে থাকে। অভাব সবচেয়ে বড় অভিশাপ। শিশুগুলির নিষ্পাপ মুখ ওর চোখের সামনে ভাসতে থাকে। হয়তো বহুদিন ধরে আলুভর্তা কচুঘন্ট দিয়ে ভাত খাচ্ছে। পড়ালেখা বা অন্য কোন ইচ্ছা কোনদিন পুরণ হয়নি। ওদের বাবা মা দুটো ভাত জোগাড় করে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্য কিছু ভাবার সময় সুযোগ কোনটাই নেই। কিন্তু মন সেতো মনের মত করে চলছে। ইচ্ছেরা সবার মনে বাসা বাধে। কেউ হয়ত প্রকাশ করে কেউ করেনা। কী দূর্বিসহ সমাজ ব্যবস্থা! কেউ ধনী কেউ দরিদ্র! কেউ খাবার ফেলে দিচ্ছে কেউ খাবার পাচ্ছেনা! নিজের কাছে নিজে লজ্জিত অনুভব করে। তার দরিদ্র বাবা তার জন্য কত কষ্ট করেছে? তাকে ডিপ্রেশন থেকে বের করে আনতে একজন সামান্য শ্রমিক হয়ে সে এত টাকা কোথায় পেয়েছে? নিশ্চয়ই ঋণ করেছে। কিন্তু কোনদিন তার মায়ের সাথেও সেব্যাপারে কোন আলাপ করেনি। আজাহার সাহেবের মুখখানা মনে পড়ে নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করে বাবা মাকে সহায়তা করবে কোনদিন তাদের চিন্তা বা দুঃখের কারন হবেনা। ছোট ভাইবোনদের দায়িত্ব আর আব্দুর রহিম চাচার ছেলেমেয়েদেরকেও সাধ্যমত সহায়তা করতে হবে। এজন্য দরকার টাকা। টাকা কোথায় পাবে? পড়ালেখা শেষ করে চাকরী বাকরী পেতে আরও কয়েকবছর লেগে যাবে। এ মুহূর্তে যেটা করা যায় টিউশনি করা। আরও দুইটা টিউশনি তাকে বেশী করতে হবে। অথবা একটা কোচিং সেন্টার এর সাথে যুক্ত হলে ঐ সোর্সে টিউশনি হতে পারে। আর একটা কাজ করা যেতে পারে সেটা হলো হুমায়ুন দাদাকে ব্যাপারটা বলে তার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কারন সে পড়ালেখায় ভাল বলে তার কাছে অনেক অভিভাবক আসে কথা বলে। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করে আজই হুমায়ুন দাদাকে তার প্রয়োজনের বিষয়টা খুলে বলে তার কাছে সাহায্য চাইবে। এসব ভাবতে ভাবতে রাস্তার ফুটপাথ ধরে মাথানিচু করে হাটছিল হঠাৎ সামনে কেউ একজন এসে সামনে দাঁড়ালে রেবা থমকে দাড়িয়ে সামনে তাকায়। দেখে তরি তার সামনে দাড়িয়ে আছে। একটু একটু হাসার চেষ্টা করছে।
তরি- কেমন আছো আপু? আমি ভেবেছিলাম দুই একদিনের মধ্যে তোমাদের বাসায় যাবো। ভাগ্য ভালো তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল। তা তুমি এদিকে কোথায় গিয়েছিলে?
রেবা- মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্তরে ভাই। আমি তোর দাদার কবর জিয়ারত করেছি। তারপর কবরস্থানের খাদেম আব্দুর রহিম চাচার বাসায় গিয়েছিলাম। সে আমাকে খুব স্নেহ করে আর তোর দাদার কবরের খুব যত্ন করে। আমাকে খুব ভালবাসে। তার বাসায় আমি যাই মাঝেমধ্যে। অনেকদিন যাওয়া হয়নি বলে তার বাসায় গিয়েছিলাম। তা তুই কোথায় যাচ্ছিলি? তোর সাথে অনেক কথা আছে। চল আমরা কোথাও বসি।
তরি- তুমিতো এখনো আমার দাদাকে নিয়েই আছো। বাবা সেতো তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাকে নিয়ে পড়ে থাকলে তুমি আর সামনে এগুতে পারবেনা। দয়া করে একটু ভুলতে চেষ্টা কর।
রেবা – আরে না তুই ভুল বুঝেছিস। তোর দাদাকে আমি ভুলবো কেমন করে? আর সে আমার কাছে এখন আর মৃত নয়, প্রাণশক্তি হয়ে আমাকে বাঁচতে সাহায্য করছে। আমাকে ওপার থেকে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।
তরি- কী জানি বাবা তুমি কি বলছো আমি মাথামুণ্ড বুঝতে পারছিনা।
রেবা- হ্যা ভাই তোকে বলবো বলেইতো খুঁজছিলাম। বলতো কোথায় বসা যায়?
তরি- চল আমরা কোন একটা পার্ক খুঁজে বের করে সেখানে বসি। হ্যা চল আমরা রিকশা নিয়ে খুলনা হাদিসপার্কে যাই। ওখানে বসে কথা বলবো। তারপর দুজন একসাথে খাবো।
রেবা- নারে অতদুরে যাবোনা। তার চেয়ে কাছেপিঠে কোথাও বসি চল।
আসলে রেবার পার্সে টাকা নেই। কোথাও দুরে গিয়ে খাওয়া রিক্সাভাড়া দেওয়া এগুলো এখন তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তরি- ঠিক আছে চল ঐ সামনে একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে । দোকানের সামনে একটা খালি বেঞ্চ আছে। ওখানে বসে চা খাই আর কথা বলি।
রেবা- ঠিক আছে চল।
রেবা আর তরি একটু হেটে দোকানে গিয়ে বৃদ্ধ দোকানদারকে বলে চাচা আমরা দুইভাইবোন আপনার দোকানের চা বিস্কিট খাবো আর কথা বলবো। আমরা আধঘণ্টা বসবো। বসবো চাচা?
দোকানদার – বস মা তোমরা।
রেবা আর তরি বেঞ্চে বসে কথা বলতে শুরু করে।
তরি- আপু তুমি বল তুমি কেন এখনো সানুদাকে নিয়ে পড়ে আছো বল?
রেবা- আগে তুই আমার কথার উত্তর দিবি তারপর আমি তোর কথার উত্তর দেবো। আগে বল তোর চেহারার এরকম ছিরি করে রেখেছিস কেন? তুই কি অসুস্থ? লক্ষ্মী ভাই আমার, তোর মনের কষ্টের কথা আমাকে বল। আমি তোদের সংসারে যেতে পারিনি কিন্তু আমি বিশ্বাস করি উর্মি আমিনুল আর তোর মনের মধ্যে আমি আছি। তোর দাদার স্থান দখল করতে না পারলেও তার কথা মনে পড়লে আমার কথাও মনে পড়ার কথা। বল ঠিক কিনা?
একথা বলে রেবা তরির মাথায় হাত দেয়। দেখে তরি কাঁদছে। এতই কাঁদছে যে কথা বলতে পারছেনা। ও খানিক সময় কাঁদলো তারপর বললো “রেবা আপু আমি আর বাঁচবোনা আর বাঁচতে চাইওনা। তোমার কাছে আমি কোন অপরাধ করে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। ”
রেবা- ভাই আমি তোর কষ্ট বুঝি কিন্তু এজন্য নিজেকে শেষ করা যাবেনা। এতকিছুর পর আমি কিভাবে বেঁচে আছি?
তরি- আপু তোমার বাবা মায়ের সাথে আমার বাবা মায়ের তুলনা করোনা। আমার ওদের মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা। তুমি বল আমার সানুদাদাকে ওরা পাগল ছিল একথা ঘোষণা দিয়ে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছে। সত্য বলে জেল খাটতো কদিন। তাহলে বুঝতাম সন্তানকে একটু হলেও ভালবাসে। ঐ রকম একটা বিবেকবান অনুভূতি সম্পন্ন ছেলেকে তারা পাগল সাব্যস্ত করলো? কতটা পাষাণ হলে এটা সম্ভব? বল দাদা ওদেরকে নিয়ে বিয়ে করতে চাইছিল এটা কি তার অপরাধ ছিল? এতই আপত্তি ছিল তোমাকে বউ করে ঘরে আনতে সেকথা সেদিন কমিশনারের সামনে সব গণ্যমান্য লোকের সামনে গিয়ে বলতো? কাপুরুষের মত পালালো কেন? এরকম একটা ভালো ছেলের বাবা মা হওয়ার কোন যোগ্যতা ওদের নেই। কেন ওদের সংসারে আমরা জন্ম নিলাম? আল্লারে সামনে পেলে এ প্রশ্ন আমি তাঁকে করতাম। বাঁচতে চাইনা, কার জন্য বাঁচবো? একথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। রেবা কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা। ওর এত জোরে কান্না দেখে আবার লোকজন জড়ো হয় কিনা এ ভাবনায় পড়ে যায় রেবা।
তারিখঃ ২৫/০৯/১৯













