লেখকঃ ড. মো. আব্দুল মুহিত, সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়।
বিডিনিউজ এক্সপ্রেসঃ ‘সবার জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর ওষুধ’- এই প্রতিপাদ্যটি নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। ওষুধের নিরাপদ, যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট যেসব পেশাজীবীকে উন্নত বিশ্বে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়, তার মধ্যে ফার্মাসিস্ট অন্যতম। ফার্মাসিস্টদের মূল কাজ হলো উন্নতমানের ওষুধ উৎপাদন, এদের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, সংরক্ষণ, ওষুধ বিক্রয় ও হাসপাতালে রোগীদের মাঝে বিতরণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান, নিত্যনতুন ওষুধ উদ্ভাবন ইত্যাদি। অর্থাৎ ওষুধ সম্পর্কিত সব বিষয়ে ফার্মাসিস্টরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমাদৃত। ওষুধের ব্যবহার কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাস থেকে জানা যায়, আগেকার দিনে যিনি রোগ নির্ণয় করতেন অর্থাৎ চিকিৎসক, তিনিই বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি করে রোগীকে প্রদান করতেন। অর্থাৎ রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রদান দুটিই একজন করতেন। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই দুটি ক্ষেত্রে ব্যাপক জ্ঞান সন্নিবেশিত হয়। ফলে একজনের পক্ষে রোগ নির্ণয় এবং ওষুধ প্রস্তুতকরণ জ্ঞান আহরণ ও আত্মস্থ করা দুরূহসাধ্য হয়ে পড়ে। ফলে কাজ দুটি সুচারুভাবে নিরূপণের উদ্দেশ্যে চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট পেশার উদ্ভব হয়েছে বিংশ শতাব্দীতে এসে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে পাশ্চাত্যের উন্নত দেশে ফার্মাসিস্টরা হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা ওষুধের দোকানে অবশ্যম্ভাবী একজন। একজন মানুষ অসুস্থ হলে নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রাথমিকভাবে একজন চিকিৎসক বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক উপায়ে রোগীর রোগ নির্ণয় করেন এবং ব্যবস্থাপত্র প্রদান করবেন। ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) অনুযায়ী নার্স সেই রোগীদের সেবা প্রদান করবেন। অন্যদিকে সেই ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) অনুযায়ী একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধ সরবরাহ করবেন।
উন্নত বিশ্বের প্রতিটি শহরে, গ্রামে, পাড়ায় অন্তত একটি করে মডেল মেডিসিন দোকান রয়েছে। যত্রতত্র ওষুধের দোকান দেওয়ার অনুমতি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন থেকে দেওয়া হয় না। সাধারণত জনগণের ঘনত্ব বিবেচনা করে এলাকাভিত্তিক ওষুধের দোকানের অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে। ওষুধের দোকানে একজন দক্ষ ফার্মাসিস্ট ব্যতীত ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ। তবে ওভার দ্য কাউন্টার ড্রাগ নামে অত্যাবশ্যকীয় কিছু ওষুধ সেই দোকান থেকেই বিনা অনুমতি নিয়ে কিনতে পারবেন। সেখানেও একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নিবেদিত হন। ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত যেহেতু ওষুধ দেওয়া হয় না, ফলে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়। বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ, মানসিক রোগের ওষুধ, বিষ জাতীয় ওষুধ কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ। এ ছাড়া ওষুধ সম্পর্কিত সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়ার সহজ সমাধান দেওয়া হয়। ওষুধ প্রস্তুতের নিয়মাবলি, ওষুধ গ্রহণের সময় কিংবা ওষুধ সম্পর্কিত নানা তথ্য রোগীদের কিংবা রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়াতে কোনো পাড়ায় অবস্থিত ওষুধের দোকানে কর্মরত একজন ফার্মাসিস্টকে ওই পাড়ায় আক্রান্ত যে কোনো রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেনে ফার্মাসিস্টদের নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দিয়ে ব্যবস্থাপত্র প্রদানেরও অধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের ডাটাবেজ নিয়মিত হালনাগাদ করার কাজটি করা হয় এখানে। অর্থাৎ একজন রোগীর প্রগ্নোসিস সম্পর্কে তথ্য রয়ে যায়। যার ফলে একটি শহরে রোগের প্রকোপ সম্পর্কে তথ্য জোগান দেওয়া সম্ভব হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেখানে একটি কমিউনিটি রোল মডেল স্থাপন করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে ফার্মাসিস্টদের দায়িত্ব শুধু ওষুধ উৎপাদন কিংবা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্র আজ বহু বিস্তৃত। রোগীদের ভুল মাত্রায় ওষুধ প্রদানের হার কমে যায়, যদি একজন ফার্মাসিস্টের উপস্থিতিতে ওষুধ প্রদান করা হয়। ওষুধে-ওষুধে প্রতিক্রিয়া, ওষুধ-খাদ্যে প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। ফার্মাসিস্টের উপস্থিতির কারণে রোগী কর্তৃক ওষুধের ডোজ নিয়মিত সেবন করা সম্ভব হয়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, যক্ষ্ণা, এইডস, মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সেবন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে একজন ফার্মাসিস্ট ফোন করার মাধ্যমে হোক কিংবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে ওষুধ সেবনে বাধ্য করতে পারেন। ফলে রোগীর কোয়ালিটি অব লাইফ বৃদ্ধি পায়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসা ১২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে মেডিকেশন এরর হয়ে থাকে। যারা পাঁচের অধিক ওষুধ গ্রহণ করে, তাদের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ হয়ে থাকে। মেক্সিকোর মতো দেশে এই হার ৫৮ শতাংশ। ধারণা করা হয়, সারাবিশ্বে ৩ শতাংশ প্রেসক্রিপশনে মেডিকেশন এরর হয়ে থাকে। মেডিকেশন এরর নিয়ে আমাদের দেশে কোনো গবেষণা হয় না। তবে নির্দি্বধায় বলা যায়, এই হার অত্যন্ত বেশি। মেডিকেশন এরর হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, খরচ বেড়ে যায়, রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মেডিকেশন এরর (ভুল চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা) কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের অবদান রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, উন্নত বিশ্বের মতো ক্লিনিক্যাল সাইটে ফার্মাসিস্টের কদর এই দেশ দিতে এখনও অসমর্থ। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলংকা কিংবা একাত্তরে পরাজিত শক্তি পাকিস্তান সরকারও হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্টদের গুরুত্ব বুঝে তাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফার্ম ডি (ছয় বছরমেয়াদি) কোর্স চালু করেছে। সেসব দেশে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল সাইটে ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দেওয়ার ফলে একজন রোগীর ওষুধ সম্পর্কিত সঠিক এবং নিরাপদ সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। ঠিক এ ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আমরা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর কথা দূরে থাক, পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গেও একই তালে এগিয়ে যেতে পারছি না। জনগণকে সঠিক, নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ সেবা প্রদানে ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সব ওষুধের দোকানে এই মুহূর্তে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া সম্ভব না হলেও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই।
সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তারিখঃ ২৫/০৯/১৯











